টমেটোর চারায় কোটি টাকার বাণিজ্য, বদলাচ্ছে কমলগঞ্জের কৃষি

টমেটোর চারা উৎপাদনকে কেন্দ্র করে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে গড়ে উঠেছে সম্ভাবনাময় একটি কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। উপজেলার বিভিন্ন এলাকার নার্সারিতে আধুনিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত গ্রাফটিং টমেটোর চারা স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। এ খাত ঘিরে মৌসুমে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে মৌসুমি কর্মসংস্থানও।
বিজ্ঞাপন
কমলগঞ্জের আদমপুর, জালালপুর, বনগাঁও, কান্দিগাঁও ও মধ্যগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় এখন গ্রাফটিং টমেটোর চারার নার্সারিতে ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। চারা উৎপাদন, গ্রাফটিং, পরিচর্যা, বাছাই ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপেই যুক্ত রয়েছেন উদ্যোক্তা ও শ্রমিকরা।
নার্সারি সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্রাফটিং পদ্ধতিতে টমেটোর চারার সঙ্গে তিতবেগুনের চারার মূল অংশ যুক্ত করা হয়। এজন্য প্রথমে আলাদাভাবে তিতবেগুন ও টমেটোর চারা তৈরি করা হয়। নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছানোর পর ভালো মানের চারা বাছাই করে তিতবেগুনের মূল অংশের সঙ্গে টমেটোর ওপরের অংশ জোড়া দেওয়া হয়। পরে বিশেষ ব্যবস্থায় কয়েক দিন পরিচর্যার মাধ্যমে চারাগুলোকে সুস্থ ও বিক্রির উপযোগী করে তোলা হয়।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, সাধারণ টমেটো গাছের তুলনায় গ্রাফটিং করা গাছের শিকড় ও কাণ্ড শক্তিশালী হওয়ায় প্রতিকূল পরিবেশে এগুলোর টিকে থাকার সক্ষমতা বেশি। রোগবালাই ও জলাবদ্ধতার প্রভাবও তুলনামূলক কম পড়তে পারে। এ কারণে ভালো ফলনের আশায় দিন দিন গ্রাফটিং চারার প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
কৃষকদের ভাষ্য, পরিচর্যা ও পরিবেশের ওপর নির্ভর করে সাধারণ একটি টমেটোগাছ থেকে প্রায় ৫ থেকে ১০ কেজি ফলন পাওয়া যায়। বিপরীতে গ্রাফটিং করা গাছ থেকে ২০ থেকে ২৫ কেজি পর্যন্ত ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে অতিবৃষ্টি কিংবা মাটিতে অতিরিক্ত আর্দ্রতার সময় গ্রাফটিং করা গাছ তুলনামূলক ভালো অবস্থায় থাকে বলে তারা জানান।
চাহিদা বাড়ায় কমলগঞ্জের নার্সারিগুলো থেকে মৌলভীবাজারের বাইরে আরও ৮ থেকে ১০টি জেলায় গ্রাফটিং টমেটোর চারা সরবরাহ করা হচ্ছে। অনেক কৃষক মৌসুম শুরুর আগেই নার্সারি মালিকদের কাছে প্রয়োজনীয় চারার অর্ডার দিয়ে রাখেন। ফলে আগাম চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন ও সরবরাহ করতে ব্যস্ত থাকতে হয় উদ্যোক্তাদের।
বিজ্ঞাপন
বর্তমানে প্রতি গ্রাফটিং টমেটোর চারা ১২ থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এ কাজের সঙ্গে স্থানীয় শ্রমিকদেরও সম্পৃক্ততা বেড়েছে। একজন দক্ষ শ্রমিক দিনে প্রায় এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০টি পর্যন্ত চারা গ্রাফটিং করতে পারেন। ফলে মৌসুমি শ্রমিকদের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এ ব্যবসায় নতুন উদ্যোক্তারাও যুক্ত হচ্ছেন।
কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. রাকিবুল ইসলাম জানান, উপজেলায় প্রতি মৌসুমে আনুমানিক ৬৫ থেকে ৭০ লাখ গ্রাফটিং টমেটোর চারা উৎপাদন হয়। এসব চারা মৌলভীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। চারা উৎপাদন ও বিক্রিকে কেন্দ্র করে এক মৌসুমে প্রায় ৫ থেকে ৬ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, চলতি মৌসুমে কমলগঞ্জে প্রায় ৬০ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন টমেটোর আবাদ হয়েছে। এতে যুক্ত রয়েছেন প্রায় ৪৮০ জন কৃষক। ফলে গ্রাফটিং চারা উৎপাদনের পাশাপাশি টমেটো চাষও উপজেলার কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিজ্ঞাপন
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, মানসম্মত বীজ, আধুনিক নার্সারি ব্যবস্থাপনা ও গ্রাফটিং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে এ খাতের পরিধি আরও বিস্তৃত হতে পারে। এতে টমেটোর উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি নার্সারি ব্যবসা, কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরি ও স্থানীয় কর্মসংস্থানেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সন্ধীপ তালুকদার বলেন, টমেটো চাষের পাশাপাশি গ্রাফটিং চারা উৎপাদনও কমলগঞ্জের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এখানকার উৎপাদিত চারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে এ খাতকে এগিয়ে নেওয়া গেলে কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে এর অবদান আরও বাড়ানো সম্ভব।








