Logo

‎শিশুদের গানের টানে তিস্তাপাড়ে নরওয়ের রাষ্ট্রদূত

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
লালমনিরহাট
২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৫৯
‎শিশুদের গানের টানে তিস্তাপাড়ে নরওয়ের রাষ্ট্রদূত
ছবি: সংগৃহীত

তিস্তাপাড়ের প্রত্যন্ত গ্রাম। বাড়ির উঠানে শিশুদের কণ্ঠে ভেসে আসছে ভাওয়াইয়া, লালন, বাউল, মুর্শিদী ও মারফতি গানের সুর। কারও হাতে একতারা, কারও হাতে দোতারা। লোকগানের এমন আয়োজন দেখতে ও শিশুদের সাংস্কৃতিক চর্চা সম্পর্কে জানতে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার দেওডোবা গ্রামে যান বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হাকন আরাল্ড গুলব্রান্ডসেন।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে তিনি দেওডোবা গ্রামের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন ‘মায়ের তরী’ পরিদর্শন করেন। এ সময় শিশুদের লোকসংগীত চর্চা, লোকবাদ্যযন্ত্রের প্রশিক্ষণ এবং সংগঠনটির বিভিন্ন কার্যক্রম ঘুরে দেখেন তিনি। শিশুদের কণ্ঠের গান এবং একতারা, দোতারা, সারিন্দা, বেহালা ও বাঁশির সুরে মুগ্ধ হন নরওয়ের রাষ্ট্রদূত।

হাকন আরাল্ড গুলব্রান্ডসেন বলেন, বাংলাদেশের সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে এ ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। দীর্ঘ এক দশক ধরে ‘মায়ের তরী’ যে কাজ করে আসছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। লোকসংগীত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মানুষের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলারও শক্তিশালী মাধ্যম।

‘মায়ের তরী’র নির্বাহী পরিচালক সুজন কুমার বেদ জানান, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলায় সংগঠনটির উদ্যোগে বর্তমানে নয়টি ‘গুরুগৃহ’ পরিচালিত হচ্ছে। এসব কেন্দ্রে পাঁচ শতাধিক শিশু বাংলা লোকগান শিখছে। পাশাপাশি দুটি লোকবাদ্যযন্ত্র প্রশিক্ষণকেন্দ্রে প্রায় ১২৫ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

দেওডোবা গ্রামের গুরু লিপি দেবনাথ বলেন, অর্থের সংকট ও পর্যাপ্ত সংরক্ষণ-সুবিধার অভাব এ কার্যক্রমের অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা। আধুনিক একটি স্টুডিও তৈরি করা গেলে প্রবীণ লোকশিল্পী ও শিশু শিল্পীদের গান ও বাদ্যযন্ত্রের পরিবেশনা রেকর্ড করে ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে লিখিতভাবে সংরক্ষিত নয়—এমন বহু লোকগান ও সুর হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা যাবে।

‘মায়ের তরী’র সংগঠক ইউসুফ আলমগীর বলেন, লোকসংগীত চর্চার মাধ্যমে শিশুদের আত্মশুদ্ধি ও জীবনবোধের বিকাশ ঘটানো—এই চিন্তাকে ধারণ করেই সংগঠনটি কাজ করছে। সীমিত সামর্থ্য, স্বেচ্ছাশ্রম ও ভালোবাসাকে পুঁজি করে গত এক দশক ধরে গ্রামে গ্রামে লোকসংস্কৃতির চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

‘মায়ের তরী’র কার্যক্রমের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে নরওয়ের নাগরিক লেখক, লোকগবেষক, আলোকচিত্রী ও কবি মিস উয়েরা সেথেরের নাম। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশে এসে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চলে নারীদের কণ্ঠে মারফতি ও মুর্শিদী গান শুনে মুগ্ধ হন তিনি। পরবর্তী সময়ে বাংলার লোকগানের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে স্থানীয় শিল্পী ও সংগঠকদের নিয়ে ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মায়ের তরী’। তিনি লালনের ৫৩টি গান নরওয়েজিয়ান ভাষায় অনুবাদ করে একটি বইও প্রকাশ করেন।

বিজ্ঞাপন

শিশুদের হাতে একতারা, দোতারা কিংবা বাঁশি তুলে দেওয়ার এই উদ্যোগ কেবল গান ও বাদ্যযন্ত্র শেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে হারিয়ে যেতে বসা বাংলার সুর, শব্দ ও লোকঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তিস্তাপাড়ের প্রত্যন্ত গ্রামে ‘মায়ের তরী’র এই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নরওয়ে ও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগেরও একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

নরওয়ের রাষ্ট্রদূতের সফরসঙ্গী ছিলেন ডেপুটি হেড অব মিশন আলেতজান্ডা ফাল্ক বাইডেন, প্রোগ্রাম অফিসার শাহপার সেলিম, স্ট্রমি ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ডাইরেক্টর মিজানুর রহমান এবং প্রোগ্রাম ম্যানেজার চন্দন কুমার সরকার।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD