‘বাপ-দাদার জমি গিলছে সন্ধ্যা’, ভাঙন ঠেকাতে নদীর পাড়ে প্রার্থনা

চোখের সামনে নদীতে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও গাছপালা। যে মাটিতে বাবা-ভাই ও পূর্বপুরুষদের স্মৃতি জড়িয়ে আছে, সেই জমিই এখন সন্ধ্যা নদীর গর্ভে। জিও ব্যাগ ফেলেও ভাঙন পুরোপুরি ঠেকানো যাচ্ছে না। সব হারানোর আশঙ্কায় কেউ ছুটছেন জনপ্রতিনিধিদের কাছে, আবার কেউ আশ্রয় নিচ্ছেন প্রার্থনায়।
বিজ্ঞাপন
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার দেহেরগতি ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের নদীপাড়ে শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে দেখা যায় এমনই চিত্র।
নদীর তীরে বসে দুই হাত তুলে প্রার্থনা করছিলেন অসুস্থ হোসেন প্যাদার স্ত্রী নাজমা বেগম। তাঁর পাশে ছিল পান-সুপারি, মিষ্টি ও ফল। নদীভাঙন থেকে রক্ষা পেতে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত একটি বিশ্বাসের কথা শুনে তিনি এভাবে প্রার্থনা করতে এসেছেন বলে জানান।
নাজমা বেগম বলেন, আল্লাহ ছাড়া এই ভাঙন কেউ ফিরাতে পারবে না। আমি স্বপ্নে দেখেছি নদীর তীরে প্রার্থনা করে আল্লাহর কাছে মাফ চাইলে নদী ভাঙন ফিরবে।
বিজ্ঞাপন
তাঁর এই বিশ্বাস নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও নদীভাঙন বন্ধে স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগ ও আকুতি স্পষ্ট। গত এক সপ্তাহ ধরে দেহেরগতি ইউনিয়নের ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সন্ধ্যা নদীর তীরে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে গাছপালা, ফসলি জমিসহ কয়েক একর জায়গা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে ইদিলকাঠী-বাহেরচর সংযোগ সড়কও। স্থানীয়দের আশঙ্কা, সড়কটি নদীতে বিলীন হলে শত শত পরিবার যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার সমস্যায় পড়বে। ভাঙন ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
নদীপাড়ের বাসিন্দারা জানান, প্রতিদিনই নতুন নতুন জায়গা নদীতে ভেঙে পড়ছে। কখন কার ঘর, জমি কিংবা বসতভিটা নদীগর্ভে চলে যায়—এমন আতঙ্ক নিয়েই দিন কাটছে তাঁদের।
বিজ্ঞাপন
নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সুলতান মোল্লার কণ্ঠেও হতাশা। তিনি বলেন, চোখে এখন আর জল আসে না। চোখের সামনেই সব নদীগর্ভে চলে গেছে। এখন বাপ-দাদার বসতবাড়ি ও কবরস্থানও যাচ্ছে। নিজের কবর দেওয়ার জায়গাটুকুও অবশিষ্ট থাকবে না।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধ করা না গেলে শুধু জমি ও বসতভিটা নয়, গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থাও নদীগর্ভে চলে যেতে পারে।
এ অবস্থায় শনিবার দুপুরে ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা নদীভাঙন প্রতিরোধে জরুরি সরকারি পদক্ষেপের দাবিতে মানববন্ধন করেন। এতে নদীপাড়ের শত শত মানুষ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
বিজ্ঞাপন
মানববন্ধনে দেহেরগতি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হেমায়েত উদ্দিন বলেন, আমরা নদীভাঙন প্রতিরোধ চাই। এই ইউনিয়নটি নদীবেষ্টিত। আমরা বরিশাল-৩ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন স্যারের কাছে ভাঙনের অবস্থা জানাব। অবশ্যই তিনি একটি ব্যবস্থা করবেন।
স্থানীয়রা সন্ধ্যা নদীর ভাঙন স্থায়ীভাবে ঠেকাতে জিও ব্যাগ ও ব্লক স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ইদিলকাঠী-বাহেরচর সংযোগ সড়কসহ বসতবাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হুমকির মুখে পড়বে।
বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মুশফিকুর রহমান শুভ বলেন, সন্ধ্যা নদীর ভাঙন তীব্র হওয়ার বিষয়টি তাঁরা জানতে পেরেছেন। ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও জানান, সন্ধ্যা, সুগন্ধা ও আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনকবলিত এলাকাগুলো চিহ্নিত করে প্রকল্প প্রণয়ন এবং তা ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।








