Logo

সেন্টমার্টিনে সাড়ে চার মাস পর্যটকদের রাত্রিযাপনের অনুমতি

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
কক্সবাজার
৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ২১:০০
সেন্টমার্টিনে সাড়ে চার মাস পর্যটকদের রাত্রিযাপনের অনুমতি
ছবি : এআই দিয়ে তৈরি

সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটকদের ভ্রমণ ও রাত্রিযাপনের সময়সীমা বাড়িয়েছে সরকার। সংশোধিত নির্দেশনা অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত টানা সাড়ে চার মাস পর্যটকরা দ্বীপে যাতায়াতের পাশাপাশি রাতেও অবস্থান করতে পারবেন।

বিজ্ঞাপন

তবে ভ্রমণের অনুমতি মিললেও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ছাড়পত্র না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে শুরু হয়নি জাহাজ চলাচল। এতে পর্যটন মৌসুমের শুরুতেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে পর্যটকদের আগমন ঘিরে দ্বীপবাসী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ২৫ অক্টোবর জারি করা প্রজ্ঞাপনে নভেম্বর এবং ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে রাত্রিযাপনের সুযোগ নিয়ে অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছিল। পরে ২৭ অক্টোবর সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারি করে বিষয়টি পরিষ্কার করা হয়।

মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব সাবরীনা রহমান সাংবাদিকদের জানান, নভেম্বর এবং ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে সেন্টমার্টিনে রাতযাপন নিয়ে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল, তা সংশোধন করা হয়েছে। ফলে নির্ধারিত পুরো সময়েই পর্যটকরা দ্বীপে রাত কাটাতে পারবেন।

বিজ্ঞাপন

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। পাশাপাশি দ্বীপে যেতে আগের মতোই ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোডযুক্ত টিকিট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটক ভ্রমণের সুযোগ পাবেন।

কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত সেন্টমার্টিন। প্রায় তিন বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই প্রবাল দ্বীপের চারপাশে রয়েছে স্বচ্ছ নীল জলরাশি ও বৈচিত্র্যময় সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য। নারিকেলগাছের সারির জন্য দ্বীপটি ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’ নামেও পরিচিত। মূল দ্বীপের দক্ষিণে রয়েছে প্রবালসমৃদ্ধ ছেঁড়াদ্বীপ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি পরিবেশগত গুরুত্বের কারণেও দ্বীপটি বিশেষভাবে পরিচিত।

সরকারি সিদ্ধান্তে ১ নভেম্বর থেকে পর্যটক পরিবহনের কথা থাকলেও প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পন্ন না হওয়ায় এখনো সেন্টমার্টিন নৌরুটে জাহাজ চলাচল শুরু হয়নি। এ রুটে চলাচলের জন্য এমভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেস, এমভি বার আউলিয়া ও এমভি টেকনাফ প্রস্তুত রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পাওয়া গেলেও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), নৌপরিবহন অধিদপ্তর এবং কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের প্রয়োজনীয় অনুমোদন প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি।

সেন্টমার্টিনগামী জাহাজ মালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর জানান, পর্যটক পরিবহনের জন্য তিনটি জাহাজ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এগুলোর সম্মিলিত ধারণক্ষমতা প্রায় ২ হাজার ৩০০ জন।

তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পাওয়া গেছে। তবে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের ভয়েজ লাইসেন্স এখনো পাওয়া যায়নি। বিআইডব্লিউটিএর রুট পারমিট ও চলাচলের সময়সূচিও ঘোষণা করা হয়নি। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের স্থানীয় অনুমোদনও বাকি রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তাঁর ভাষ্য, পর্যটকদের মধ্যে টিকিট বুকিংয়ের আগ্রহ থাকলেও বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের ট্রাভেল পাস-সংক্রান্ত সফটওয়্যার এখনো চালু হয়নি। এসব জটিলতা দ্রুত সমাধান হলে আগামী ৫ অথবা ৬ নভেম্বরের মধ্যে জাহাজ চলাচল শুরু করা সম্ভব হতে পারে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাহমুদুর রহমান সায়েম বলেন, পর্যাপ্ত কাগজপত্র জমা দিতে না পারায় এখনো কোনো জাহাজকে সেন্টমার্টিনে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়নি। ট্যুরিজম বোর্ডের প্রস্তুতিও পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি বলে তিনি জানতে পেরেছেন। সব বিষয় পর্যালোচনায় জেলা প্রশাসক দ্বীপে গিয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করবেন এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবেন।

সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াত ও অবস্থান নিয়ে গত ১২ অক্টোবর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে আন্তমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ২৫ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ের পরিবেশ-২ শাখা থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছিল। সেখানে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর জারি করা প্রজ্ঞাপনের শর্তগুলো বহাল রাখা হয়।

বিজ্ঞাপন

এর ফলে নভেম্বর মাসে পর্যটকদের শুধু দিনের বেলায় দ্বীপে গিয়ে একই দিনে ফিরে আসতে হবে বলে ধারণা তৈরি হয়েছিল। অন্যদিকে ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রাতযাপনের সুযোগ রাখার বিষয়টি উল্লেখ থাকায় পর্যটক, হোটেল-রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী এবং জাহাজ মালিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দেয়।

পরে ২৭ অক্টোবর সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে সেই অস্পষ্টতা দূর করা হয়। নতুন নির্দেশনায় ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত পুরো সময় পর্যটকদের রাত্রিযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে।

আগের মতো কক্সবাজার শহরের উত্তর নুনিয়াছড়ায় বিআইডব্লিউটিএর ঘাট থেকে পর্যটকবাহী জাহাজ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার কথা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুক জানান, গতবারের মতো এবারও পর্যটকদের ট্রাভেল পাস নিয়ে দ্বীপে যেতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ট্যুরিজম বোর্ডের মাধ্যমে ট্রাভেল পাস এবং কিউআর কোডযুক্ত টিকিট সংগ্রহ করতে হবে।

পর্যটকদের জন্য নতুন করে রাত্রিযাপনের অনুমতি দেওয়া হলেও দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আগের বিধিনিষেধগুলো বহাল রাখা হয়েছে।

নির্দেশনা অনুযায়ী, রাতে সমুদ্রসৈকত ও আশপাশের এলাকায় আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি এবং বারবিকিউ পার্টির আয়োজন করা যাবে না। কেয়াবনে প্রবেশ কিংবা কেয়া ফল সংগ্রহ, ক্রয়-বিক্রয়ও নিষিদ্ধ থাকবে।

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, তারামাছ, রাজকাঁকড়া, সামুদ্রিক ঘাস ও শৈবালসহ দ্বীপের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা যাবে না। সমুদ্রসৈকতে মোটরসাইকেল ও সি-বাইকের মতো যানবাহন চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

পর্যটন মৌসুম শুরুর প্রস্তুতির মধ্যেই সেন্টমার্টিনের আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১১ পর্যটকের প্রাণহানির পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সেন্টমার্টিনেও সম্প্রতি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

টেকনাফ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন কমান্ডার কামরুজ্জামান সুমন বলেন, তিনি সম্প্রতি টেকনাফে যোগ দিয়েছেন। সেন্টমার্টিনে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন এবং প্রশিক্ষিত কর্মী রাখার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ জন্য তাঁরা দ্বীপটি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

বিজ্ঞাপন

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়জুল ইসলাম জানান, দ্বীপের একটি রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। হোটেল ও রিসোর্টগুলোতে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে আপাতত দ্বীপে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের সম্ভাবনা দেখছেন না তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, শুধু অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখার নির্দেশনা যথেষ্ট নয়। এসব যন্ত্র সচল ও কার্যকর আছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজে নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ, রান্নাঘরের নিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন পথ এবং প্রশিক্ষিত কর্মী নিশ্চিত করা জরুরি।

দ্বীপবাসীরা জানান, কোনো হোটেল, রিসোর্ট কিংবা রেস্তোরাঁয় আগুন লাগলে অনেক সময় বাড়ির পানির পাইপ ব্যবহার করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন। কিন্তু আগুন বড় আকার ধারণ করলে সীমিত সরঞ্জাম দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুক জানিয়েছেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় পর্যটন নীতিমালার আলোকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোডযুক্ত টিকিটের মাধ্যমে পর্যটকদের নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রাতে আলো, শব্দ ও বারবিকিউ পার্টির ওপর নিষেধাজ্ঞা রাখা হয়েছে।

দীর্ঘ বিরতির পর পর্যটকদের যাতায়াত ও রাত্রিযাপনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা এবং পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। একসময় দ্বীপের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা নির্ভর করত মাছ ধরা ও কৃষিকাজের ওপর। তবে গত দুই দশকে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই পর্যটন খাতের বিভিন্ন ব্যবসা ও সেবামূলক পেশায় যুক্ত হন।

পর্যটকদের চলাচলে বিধিনিষেধ থাকায় গত এক বছরে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহনসহ পর্যটননির্ভর বিভিন্ন ব্যবসায় স্থবিরতা দেখা দেয়। নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে এসব ব্যবসা আবারও সচল হবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।

বিজ্ঞাপন

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়জুল ইসলাম বলেন, পর্যটকদের আগমন সামনে রেখে দ্বীপের বিভিন্ন পেশার মানুষ কর্মব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সংস্কার ও পর্যটকদের স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি চলছে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, সেন্টমার্টিন পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় একটি গন্তব্য। ১ নভেম্বর থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটক যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাঁদের নিরাপত্তায় কোস্টগার্ড, বিজিবি, নৌবাহিনী ও পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে।

পর্যটকদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং আবাসনকেন্দ্রগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এই তিনটি বিষয় কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে নতুন পর্যটন মৌসুম দ্বীপবাসীর জীবিকা ও পর্যটন খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD