রাঙ্গাবালীতে গৃহবধূর মৃত্যু ঘিরে রহস্য, স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে ফারহানা ইয়াসমিন শিলা (৪৫) নামে এক গৃহবধূর অস্বাভাবিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁকে হত্যার পর মরদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনেরা।
বিজ্ঞাপন
এ ঘটনায় তাঁর স্বামী ও রাঙ্গাবালী উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রাসেল মাহমুদের (৪৮) বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে উপজেলার সদর ইউনিয়নের বাহেরচর বাজার এলাকায় নিজেদের বাসা থেকে শিলার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রাথমিক সুরতহাল সম্পন্ন করে। বেলা ১১টার দিকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পটুয়াখালী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, এ ঘটনায় রাঙ্গাবালী থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করা হয়েছে। প্রাথমিক সুরতহালে আত্মহত্যার বিষয়টি উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
নিহতের পরিবারের দাবি, প্রায় দেড় বছর আগে রাসেল মাহমুদের সঙ্গে দ্বিতীয়বারের মতো বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন শিলা। বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। সামান্য বিষয়েও প্রায়ই কথা-কাটাকাটি হতো। একাধিকবার রাতে শিলাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ স্বজনদের।
পরিবারের সদস্যদের আরও অভিযোগ, শিলার পৈতৃক সম্পত্তি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য তাঁকে চাপ দেওয়া হতো। পৈতৃক জমি বিক্রির অর্থ স্বামীর হাতে তুলে দিতেন শিলা। স্বজনদের দাবি, ওই অর্থ দিয়ে রাসেল তাঁর প্রথম স্ত্রীর সংসারের খরচ চালাতেন। প্রথম স্ত্রীকে কেন্দ্র করেও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া শিলার বাবার একটি দোকান রাসেল দখলে রেখেছেন বলেও দাবি পরিবারের।
তবে পরিবারের এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বিজ্ঞাপন
নিহত শিলার ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে লাবিবা আক্তার জানায়, গত এক বছর ধরে রাসেল তাঁর মাকে নিজের সঙ্গে ঘুমাতে দিতেন না। তাঁর মা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় ঘুমাতেন। রাতে মা-বাবার মধ্যে ঝগড়ার শব্দ শুনলেও ভয়ে নিচে যেত না সে। লাবিবার দাবি, প্রায়ই রাতে তাঁর মাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হতো।
ঘটনার আগের রাতে সে ঘুমিয়ে ছিল বলে জানায় লাবিবা। কী ঘটেছিল, তা সে দেখেনি। সকালে কেয়া খালামনি তাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। পরে সে দেখতে পায়, তার মাকে বিছানায় শুইয়ে রাখা হয়েছে।
প্রতিবেশী কেয়া বেগমের ভাষ্য, শুক্রবার সকালে শিলার স্বামী রাসেল তাঁকে ডেকে নেন। ঘরে গিয়ে তিনি শিলাকে ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় ঝুলতে দেখেন। পরে তিনি জানতে পারেন, আগের রাতে স্বামী-স্ত্রী একই বিছানায় ঘুমিয়েছিলেন। রাসেলই মরদেহটি নামিয়েছেন বলে জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
নিহতের বড় ভাই রাশেদুল ইসলাম সজল বলেন, লোকমুখে বোনের মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি বাড়িতে যান। সেখানে বোনের গলায় ফাঁসের দাগ দেখতে পান বলে দাবি করেন তিনি। পরে তাঁর ছোট ভাই কমল পুলিশকে খবর দেন। বোনের মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা থাকতে পারে বলে অভিযোগ করেন সজল।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ঘটনার পর থেকে রাসেল মাহমুদ আত্মগোপনে রয়েছেন। এ ছাড়া ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে উপজেলা বিএনপি ও যুবদলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের পক্ষ থেকে তদবির চালানোর অভিযোগও উঠেছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এসব অভিযোগেরও স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে রাসেল মাহমুদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “যা বলার, জানাজা নামাজের সময়ে বলবো।
বিজ্ঞাপন
রাঙ্গাবালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি তদন্ত) ইলিয়াস হোসেন মুন্সি বলেন, মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা নেওয়া হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিলার অস্বাভাবিক মৃত্যুকে ঘিরে পরিবারের অভিযোগ, পুলিশের প্রাথমিক সুরতহাল এবং চলমান আইনি প্রক্রিয়া—সব মিলিয়ে ঘটনাটি নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে এটি আত্মহত্যা, নাকি মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও পুলিশের তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসবে—এমন প্রত্যাশায় রয়েছেন নিহতের স্বজনেরা।








