মৌলভীবাজারে সেচ সংকট, বোরো আবাদ ব্যাহত, দুশ্চিন্তায় ৬০ হাজার কৃষক

বোরো মৌসুমের ভরা সময়ে তীব্র সেচ সংকটে বিপাকে পড়েছেন মৌলভীবাজারের কৃষকেরা। পানির অভাবে প্রায় ৩০ হাজার হেক্টর জমি চাষের বাইরে রয়ে গেছে।
বিজ্ঞাপন
আর যারা আবাদ করেছেন, এমন অন্তত ৬০ হাজার কৃষক পর্যাপ্ত সেচ না পেয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। অনেকেই সেচের জন্য টাকা দিয়েও পানি পাচ্ছেন না। কোথাও চারা রোপণের পর জমি ফেটে চৌচির, আবার কোথাও পানির অভাবে রোপণই শুরু করা যায়নি।
জেলার সাতটি উপজেলার হাওর ও নন-হাওর এলাকা ঘুরে একই ধরনের সংকটের চিত্র পাওয়া গেছে। হাকালুকি হাওর, কাউয়াদিঘী হাওর ও কেওলার হাওর এলাকায় সেচ নিয়ে হাহাকার চলছে। পাশাপাশি কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, রাজনগর, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলাতেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। অনেক জমিতে চারা লাগানোর পর তা শুকিয়ে যাচ্ছে। একরপ্রতি ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা ব্যয় করেও পানির অভাবে ফসল নষ্ট হওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন কৃষকেরা।
বিজ্ঞাপন
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে জেলায় ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৭ হাজার ৩৪৫ হেক্টর হাওর এলাকায় এবং ৩৫ হাজার ৫৫ হেক্টর নন-হাওর এলাকায়। তবে সেচব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যাপ্ত সেচ নিশ্চিত করা গেলে অন্তত আরও ৩০ হাজার হেক্টর জমি চাষের আওতায় আনা সম্ভব হতো।
কৃষকেরা বলছেন, দীর্ঘদিন নালা-ছড়া খনন না করায় অনেক সেচনালা ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও ক্রসবাঁধ ও স্লুইসগেট দিয়ে পানি আটকে রাখায় উজানের জমিতে পানি পৌঁছাচ্ছে না। কাউয়াদিঘী হাওরে প্রায় ১০৫ কিলোমিটার সেচনালার বড় অংশ এখন অকার্যকর। কুদালী ছড়ায় দুই থেকে আড়াই হাজার হেক্টর জমি সেচ সংকটে পড়েছে। রাজনগর ও সদর উপজেলায় প্রায় ১০ হাজার কৃষক পানির অভাবে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
লাঘাটা নদীতে উজান থেকে পানি কম আসায় কয়েকটি ইউনিয়নে সেচে টান পড়েছে। কুলাউড়ার হাজীপুর, শরীফপুর ও পৃথিমপাশা এলাকাতেও একই অবস্থা। হাকালুকি হাওরের উঁচু জমিতে পাইপে পানি তুলতে হচ্ছে, ফলে খরচ ও ঝুঁকি—দুটোই বাড়ছে। জুড়ী ও বড়লেখাতেও বোরো আবাদ ব্যাহত হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
কৃষক সালমান মিয়া বলেন, “মৌসুমের শুরুতে কিছু পানি পাওয়া গেলেও মাঝামাঝি সময়ে একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। এত খরচ করে শেষে লোকসান গুনতে হয়।”
কমলগঞ্জের কৃষক মর্তুজ আলী জানান, “ফসল বাঁচাতে দূর থেকে পানি টানতে হয়। কিন্তু মাঝপথে পানি কমে গেলে সব পরিশ্রম বৃথা যায়।”
জেলায় সরকারি উদ্যোগে ১৪টি সৌরচালিত সেচব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড-এর মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ বলেন, যেখানে সেচনালা সচল আছে সেখানে কৃষকেরা কমবেশি পানি পাচ্ছেন। কোনো নালায় সমস্যা হলে তা সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর-এর উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দীন জানান, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পানির সংকট রয়েছে। অনেক নালা ও ছড়া দিয়ে পর্যাপ্ত পানি প্রবাহিত হচ্ছে না। নলকূপের সমস্যাও রয়েছে। পর্যাপ্ত সেচব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে অন্তত আরও ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ সম্ভব হবে। যেসব নালা দিয়ে পানি আসছে না, সেগুলো পুনঃখননের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সেচ সংকট দ্রুত সমাধান না হলে চলতি মৌসুমে বোরো উৎপাদনে বড় ধাক্কা লাগতে পারে—এমন আশঙ্কাই করছেন কৃষক ও সংশ্লিষ্টরা।








