Logo

আরডিএ’র উদ্যোগে বগুড়ায় গড়ে উঠছে ‘মেকানাইজেশন ভিলেজ’

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
শেরপুর, বগুড়া
১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১৬:৪৫
আরডিএ’র উদ্যোগে বগুড়ায় গড়ে উঠছে ‘মেকানাইজেশন ভিলেজ’
ছবি : এআই দিয়ে তৈরি

কৃষিযন্ত্র কেনার সামর্থ্য নেই অনেক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের। মৌসুমে শ্রমিকসংকট ও বাড়তি মজুরির কারণে তাঁদের চাষাবাদেও বাড়তি ব্যয় হয়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমবায়ের মাধ্যমে কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ), বগুড়া। ১২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের একটি প্রকল্পের আওতায় জেলার চারটি গ্রামে গড়ে তোলা হচ্ছে ‘মেকানাইজেশন ভিলেজ’।

বিজ্ঞাপন

বগুড়া সদর, শেরপুর, শাজাহানপুর ও নন্দীগ্রাম উপজেলার একটি করে গ্রাম এ প্রকল্পের আওতায় রয়েছে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। এর লক্ষ্য কৃষিকাজে শ্রম ও সময় কমানোর পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, কৃষকের আয় বাড়ানো এবং গ্রামীণ যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।

পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের অধীন আরডিএ, বগুড়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের সংগঠিত করে সমবায়ের মাধ্যমে কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে একজন কৃষককে আলাদাভাবে ব্যয়বহুল যন্ত্র কিনতে হবে না। সমবায়ের কাছ থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী যন্ত্র ভাড়া নিয়ে চাষাবাদ করতে পারবেন তাঁরা।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১০০ একর জমিতে সেচ দেওয়ার সক্ষমতাসম্পন্ন একটি গভীর নলকূপ, ভূগর্ভস্থ বা বাড়ির পাইপ নেটওয়ার্ক, একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ট্রাক্টর ও একটি কম্বাইন হারভেস্টারসহ বিভিন্ন কৃষিযন্ত্রের ব্যবস্থা রাখা হবে। ৪টি গ্রামে কৃষিযন্ত্র ও উৎপাদিত ফসল সংরক্ষণের জন্য ছোট আকারের শেড নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় ১৩টি বিষয়ে ১ হাজার ৬৯০ জন সুবিধাভোগীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্রঋণ ও আবর্তক ঋণের মাধ্যমে কৃষক ও গ্রামীণ যুবকদের আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষিযন্ত্র চালানো ও মেরামতের দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে গ্রামীণ তরুণদের কাজের সুযোগ তৈরির বিষয়টিও প্রকল্পে গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়লে জমি প্রস্তুত, ফসল কাটা ও মাড়াইয়ের কাজে সময় ও শ্রম কম লাগবে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে কৃষি শ্রমিকের সংকটের সময় যন্ত্রের ব্যবহার কৃষকদের জন্য সহায়ক হতে পারে।

প্রকল্পের আরেকটি লক্ষ্য হলো কৃষিযন্ত্রকে সমবায়ের আয়বর্ধক সম্পদে পরিণত করা। যন্ত্র ভাড়া দিয়ে পাওয়া অর্থ থেকে পরিচালন ব্যয়, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ মেটানো এবং ভবিষ্যতে যন্ত্র প্রতিস্থাপনের জন্য তহবিল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের সরকারি সহায়তা শেষ হওয়ার পরও সমবায়গুলো যেন নিজেদের আয়ে কার্যক্রম চালাতে পারে, সে জন্য এ ব্যবস্থা।

প্রকল্প এলাকার উপকারভোগী কৃষক নূর মোহাম্মদ বলেন, আগে জমি চাষ, ধান রোপণ ও ফসল কাটার সময় শ্রমিক পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হতো। ব্যস্ত মৌসুমে শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যেত, আবার সময়মতো কাজ শেষ করাও কঠিন হতো। সমবায়ের মাধ্যমে কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হলে কম খরচে দ্রুত কাজ করা যাবে বলে তিনি আশা করছেন।

বিজ্ঞাপন

আরেক উপকারভোগী কৃষক মহানন্দ বলেন, ছোট কৃষকদের পক্ষে নিজস্ব কম্বাইন হারভেস্টারসহ আধুনিক কৃষিযন্ত্র কেনা সম্ভব নয়। সমবায়ের মাধ্যমে এসব যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ পেলে তাঁর মতো কৃষকেরা আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা পাবেন। পাশাপাশি গ্রামের তরুণেরা যন্ত্র চালানো ও মেরামতের প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ করতে পারবেন। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সমবায়গুলো নিজেদের আয় দিয়ে যন্ত্রপাতি সচল রাখবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন।

প্রকল্পের পরিচালক ও আরডিএ, বগুড়ার যুগ্ম পরিচালক মোছা. রেবেকা সুলতানা বলেন, এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য শুধু কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানো নয়, সমবায়ের মাধ্যমে কৃষিযন্ত্র ব্যবস্থাপনাকে লাভজনক ও টেকসই ব্যবসায়িক মডেলে রূপ দেওয়া। সমবায়ের মাধ্যমে যন্ত্র ব্যবহার করলে কৃষকের ব্যয় কমবে এবং সময়মতো কৃষিকাজ সম্পন্ন করা সহজ হবে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, কৃষক ও গ্রামীণ যুবকদের প্রশিক্ষণ, দক্ষ যন্ত্রচালক তৈরি, আধুনিক কৃষিপদ্ধতির প্রসার এবং সমবায়ের সাংগঠনিক ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মেকানাইজেশন ভিলেজগুলো কার্যকর মডেল হিসেবে গড়ে উঠলে কৃষকেরা সাশ্রয়ী মূল্যে কৃষিসেবা পাবেন। সমবায়ের আয় থেকে যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ ও ভবিষ্যৎ প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থাও করা সম্ভব হবে। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে মডেলটি দেশের অন্যান্য সম্ভাবনাময় কৃষি এলাকায় সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

আরডিএ, বগুড়ার মহাপরিচালক ড. মো. আব্দুল মজিদ প্রামানিক বলেন, কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, শ্রমিকসংকট মোকাবিলা এবং কৃষকের আর্থসামাজিক উন্নয়নে আধুনিক কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রয়োজন। তবে যন্ত্র সংগ্রহের পাশাপাশি সেগুলোর সঠিক ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং আর্থিকভাবে টেকসই পরিচালন ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, এ প্রকল্পের মাধ্যমে সমবায়ভিত্তিক কৃষিযন্ত্র ব্যবস্থাপনার একটি বাস্তবভিত্তিক মডেল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি সহায়তায় প্রাথমিক সক্ষমতা তৈরি হবে। পরে সমবায়ের নিজস্ব আয়, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ও প্রতিস্থাপন তহবিলের মাধ্যমে কার্যক্রম চালু রাখার সুযোগ সৃষ্টি হবে। প্রকল্পের অভিজ্ঞতা ও ফলাফল মূল্যায়ন করে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই মডেল তৈরি করা গেলে তা দেশের অন্যান্য কৃষিপ্রধান অঞ্চলেও কৃষি যান্ত্রিকীকরণ সম্প্রসারণে কাজে লাগানো সম্ভব হবে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষে প্রতিষ্ঠিত মেকানাইজেশন ভিলেজগুলো দেশের অন্যান্য এলাকায় সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD