Logo

সৌরশক্তির সেচে কমেছে কৃষকের ব্যয়, বেড়েছে ফসলের নিবিড়তা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৫৩
সৌরশক্তির সেচে কমেছে কৃষকের ব্যয়, বেড়েছে ফসলের নিবিড়তা
ছবি: সংগৃহীত

সরকারি উদ্যোগে সৌরশক্তিচালিত সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণের ফলে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে। এতে একদিকে কৃষকদের সেচ ব্যয় কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে ফসলের উৎপাদন ও জমির ব্যবহার। গত দুই বছরে রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় ৩২টি সৌর সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, এসব পাম্প ব্যবহারে কৃষকদের সেচ ব্যয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে এবং ফসলের নিবিড়তা বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

‘রাজশাহী বিভাগ কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে বরেন্দ্র অঞ্চলে সৌরশক্তিচালিত সেচ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত হচ্ছে এই কার্যক্রম।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের ৬৭টি উপজেলার প্রায় ৩ হাজার ২০০ কৃষক সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

প্রচলিত ডিজেলচালিত পাম্প ও জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষিতে স্বনির্ভরতা বাড়ানোই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে আধুনিক ও টেকসই কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রান্তিক ও দরিদ্র কৃষকদের আর্থিক চাপ কমাতে তাঁদের বিনা মূল্যে সৌর সেচ প্রযুক্তির সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এ প্রকল্পে তিন ধরনের সৌর সেচব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে।

এর মধ্যে দুই অশ্বশক্তির ফিক্সড সোলার ইরিগেশন ব্যবস্থার আওতায় বিভিন্ন এলাকায় ২৪টি স্থায়ী সেচ ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। এসব ইউনিটের মাধ্যমে নির্ধারিত জমিতে নিয়মিত সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

এ ছাড়া সহজে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়ার সুবিধাসম্পন্ন আটটি পোর্টেবল সোলার ইরিগেশন ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে কৃষকেরা প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন জমি, প্লট ও বাগানে এসব ইউনিট ব্যবহার করতে পারছেন।

বিজ্ঞাপন

ফলবাগানে পানি সাশ্রয়ী সেচ নিশ্চিত করতে স্থাপন করা হয়েছে ১০টি প্রিসিশন সোলার ইরিগেশন ইউনিট। প্রতিটি ইউনিট এক একর আয়তনের নির্দিষ্ট ফলবাগানের জন্য নকশা করা হয়েছে।

এই প্রযুক্তির অন্যতম সুবিধা হলো, সেচের জন্য জাতীয় বিদ্যুৎ সংযোগ বা ডিজেলের প্রয়োজন হয় না। ফলে বিদ্যুৎবিহীন দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকাতেও সৌরশক্তির সাহায্যে সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কিংবা ডিজেলের সরবরাহসংকট নিয়ে কৃষকদের দুশ্চিন্তাও কমছে।

বরেন্দ্র অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে খরা ও পানিসংকটের জন্য পরিচিত। এ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নেমে যাওয়ায় সেচের পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে সৌরচালিত পাম্পের সঙ্গে ‘ড্রিপ ইরিগেশন’ বা ফোঁটা ফোঁটা সেচপ্রযুক্তি যুক্ত করে পানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এই পদ্ধতিতে পাইপের মাধ্যমে সরাসরি গাছের গোড়ায় প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি পৌঁছে দেওয়া হয়। এতে পানির অপচয় কমে এবং মাটির আর্দ্রতা দীর্ঘ সময় বজায় থাকে। পাশাপাশি আগাছার বৃদ্ধি কমানো, গাছের পরিচর্যা সহজ করা এবং ফলের উৎপাদন ও গুণগত মান উন্নত করার সুযোগ তৈরি হয়।

প্রকল্পের সুফল পাচ্ছেন মাঠপর্যায়ের কৃষকেরাও। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার উপকারভোগী কৃষক মো. আলমগীর হোসেন বলেন, আগে ডিজেলচালিত পাম্প দিয়ে জমি ও বাগানে সেচ দিতে গিয়ে অনেক টাকা খরচ হতো। উৎপাদন ব্যয়ের বড় অংশই চলে যেত সেচের পেছনে। সেচ মৌসুমে প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজেল না পাওয়ায় বাড়তি দুশ্চিন্তায় থাকতে হতো।

তিনি বলেন, এখন সরকারি সহায়তায় সৌরশক্তি ব্যবহার করে সহজেই বাগানে সেচ দিতে পারছেন। এতে খরচ ও পানির অপচয় দুটোই কমেছে। পাশাপাশি গাছের পরিচর্যা আগের তুলনায় সহজ হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

রাজশাহীর পবা উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল মান্নান বলেন, মাঠপর্যায়ে এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। তীব্র খরা ও পানিসংকটপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড কিংবা আমদানিনির্ভর ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষকদের সক্ষমতা বাড়াতে সৌর সেচ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

‘রাজশাহী বিভাগ কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প’-এর পরিচালক ও কৃষিবিদ এস এম হাসানুজ্জামান বলেন, গত দুই বছরে রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ৩২টি সৌর সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে কৃষকদের সেচ ব্যয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

তিনি জানান, খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপের কার্যক্ষমতা কমে গিয়েছিল। সৌর সেচ পাম্প চালুর ফলে অনাবাদি ও পতিত জমিতে বছরে তিনটি ধানসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে ফসলের নিবিড়তা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।

বিজ্ঞাপন

সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে এসব পাম্প ২০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

কৃষি বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের মতে, ডিজেলচালিত পাম্পের পরিবর্তে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়লে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর দেশের নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে কৃষিতে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন, পানিসংকট ও কৃষি উপকরণের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর সেচপ্রযুক্তি বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিকে আরও টেকসই ও লাভজনক করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এ সুফল ধরে রাখতে সৌর পাম্পের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

তথ্য সূত্র : বাসস

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD