Logo

কাগজে পর্যাপ্ত থাকলেও মাঠে মিলছে না চাহিদামতো সার

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
জামালপুর
১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১৪:৫৯
কাগজে পর্যাপ্ত থাকলেও মাঠে মিলছে না চাহিদামতো সার
ছবি: সংগৃহীত

আমন ধানের আবাদ চলার পাশাপাশি জামালপুরের চরাঞ্চলে শুরু হয়েছে শীতকালীন আগাম সবজি চাষের প্রস্তুতি। টমেটো, বেগুন, লাউ, ফুলকপিসহ বিভিন্ন সবজি উৎপাদনে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। মৌসুমের শুরুতে ভালো দাম পাওয়ার আশায় জমি প্রস্তুত, বীজ বপন ও চারা রোপণে বাড়তি শ্রম দিচ্ছেন তাঁরা। তবে এই ব্যস্ততার মধ্যেই প্রয়োজন অনুযায়ী সার না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, কৃষি বিভাগের দাবি, জেলায় সারের পর্যাপ্ত বরাদ্দ রয়েছে। ফলে সরকারি বরাদ্দের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের সরবরাহের বাস্তব চিত্র নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

জামালপুর সদর, দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, বকশীগঞ্জ, মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী উপজেলার চরাঞ্চলে আগাম শীতকালীন সবজি চাষের কার্যক্রম চলছে। অনুকূল আবহাওয়া, সময়মতো কৃষি উপকরণ সরবরাহ এবং ভালো বাজারদরের প্রত্যাশায় বিনিয়োগ করছেন কৃষকেরা। কিন্তু চাষের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহে সমস্যার মুখে পড়লে উৎপাদন ও লাভের হিসাব নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

আগাম সবজি চাষে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়

আগাম সবজি উৎপাদনে জমি তৈরি, বীজ বপন, চারা রোপণ, সার প্রয়োগ, সেচ এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণসহ প্রতিটি পর্যায়ে নিয়মিত পরিচর্যা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি, বীজ, কীটনাশক ও অন্যান্য উপকরণের ব্যয়ও বহন করতে হয়। মৌসুমের শুরুতে বাজারে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার আশায় এসব খরচের ঝুঁকি নিচ্ছেন কৃষকেরা।

বিজ্ঞাপন

তবে প্রয়োজনমতো সার না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে জমিতে সার প্রয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে তাঁদের অভিযোগ। সবজির স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী সার ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে জমির পরিচর্যা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়েও দুশ্চিন্তা বাড়ে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিশেষ করে চরাঞ্চলের অনেক কৃষক নিজেদের সঞ্চয় কিংবা ধারদেনার টাকা দিয়ে আগাম সবজি চাষ করেন। তাঁদের বিনিয়োগের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে ফলন ও বাজারদরের ওপর। ফলে চাষের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রয়োজনীয় সার না পেলে আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়।

আমন ও সবজি চাষে সারের চাহিদা-বরাদ্দের হিসাব

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জামালপুরে ১২ হাজার ৬১০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। শীতকালীন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ হাজার ৯৫০ হেক্টর। এরই মধ্যে ১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ সম্পন্ন হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অক্টোবর মাসের সারের চাহিদা ও বরাদ্দের হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইউরিয়া সারের বরাদ্দ চাহিদার চেয়ে বেশি হলেও টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে।

কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলায় অক্টোবরে ইউরিয়া সারের চাহিদা ৯৬০ টন। এর বিপরীতে বরাদ্দ রয়েছে ১ হাজার ২৬ টন, যা চাহিদার চেয়ে ৬৬ টন বেশি।

অন্যদিকে, টিএসপি সারের চাহিদা ২৫০ টন হলেও বরাদ্দ ২১৯ টন। অর্থাৎ ঘাটতি ৩১ টন। ডিএপি সারের চাহিদা ৪১৩ টনের বিপরীতে বরাদ্দ ৩৫২ টন, ঘাটতি ৬১ টন। আর এমওপি সারের চাহিদা ২২৭ টন হলেও বরাদ্দ ১৯৫ টন, যা চাহিদার তুলনায় ৩২ টন কম।

বিজ্ঞাপন

এই হিসাব অনুযায়ী, তিন ধরনের সারে মোট ১২৪ টন ঘাটতি রয়েছে। ফলে জেলায় সার সরবরাহের পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু মোট বরাদ্দ নয়, কোন ধরনের সার কতটা পাওয়া যাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এ অঞ্চলে ইউরিয়া সারের ব্যবহার তুলনামূলক বেশি। তবে আমন ধান ও শীতকালীন সবজি উৎপাদনে বিভিন্ন ধরনের সারের প্রয়োজন হয়। তাই বরাদ্দের পাশাপাশি ডিলার পর্যায়ে মজুত এবং কৃষক পর্যায়ে প্রকৃত সরবরাহের পরিমাণ যাচাই করা জরুরি।

সার মজুত ও বিক্রিতে অনিয়মের অভিযোগ

বিজ্ঞাপন

কৃষকদের সারসংকটের অভিযোগের পাশাপাশি জামালপুরের বিভিন্ন উপজেলায় অবৈধভাবে সার মজুত, অতিরিক্ত দামে বিক্রি এবং নির্ধারিত কৃষকদের কাছে সার বিক্রি না করার অভিযোগে প্রশাসনিক অভিযানের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনা সার বিতরণব্যবস্থার তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

গত ২৭ আগস্ট রাতে বকশীগঞ্জ উপজেলার বগারচর ইউনিয়নের একটি দোকান ও গুদামে অভিযান চালিয়ে ৭২ বস্তা সার জব্দ করে উপজেলা প্রশাসন। লাইসেন্স ছাড়া সার মজুতের দায়ে দুলাল মিয়া নামে এক ব্যবসায়ীকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এরপর ৩০ আগস্ট ইসলামপুর উপজেলার চরপুটিমারী ইউনিয়নের বেনুয়ারচর বাজারে কৃষকদের জন্য বরাদ্দ করা সার অতিরিক্ত দামে বিক্রি ও বিক্রয়ব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগে দুই সার ডিলারকে মোট ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

সর্বশেষ ১২ অক্টোবর মেলান্দহে নির্ধারিত ইউনিয়নের কৃষকদের কাছে সার বিক্রি না করে খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগে এক ডিলারের প্রতিনিধিকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

বিজ্ঞাপন

তবে এসব অনিয়মের ঘটনার সঙ্গে বর্তমানে কৃষকদের সার না পাওয়ার অভিযোগের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তারপরও ঘটনাগুলো সার মজুত, বিক্রি ও বিতরণ কার্যক্রমে নিয়মিত তদারকির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।

উৎপাদন ও বাজারদর নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষকেরা

আগাম সবজি চাষের অন্যতম লক্ষ্য হলো মৌসুমের শুরুতেই বাজারে ফসল তুলে ভালো দাম পাওয়া। কিন্তু উৎপাদনের শুরুতে সারসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহে সমস্যা দেখা দিলে কৃষকদের ব্যয় ও ঝুঁকি বেড়ে যায়। এর সঙ্গে আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা, রোগবালাই এবং বাজারদরের ওঠানামাও তাঁদের দুশ্চিন্তার কারণ।

বিজ্ঞাপন

ইসলামপুরের কৃষক রহিম এক বিঘা জমিতে সবজি চাষ করেছেন। বর্তমানে জমির আগাছা পরিষ্কার এবং গাছের গোড়ায় সার দেওয়ার কাজে ব্যস্ত তিনি। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন এই কৃষক।

রহিম বলেন, সবজি চাষে জমির নিয়মিত পরিচর্যা করতে হয়। জমি তৈরি থেকে শুরু করে চারা লাগানো, সার দেওয়া ও সেচ—সব কাজই সময়মতো করতে হয়। এখন জমিতে আগাছা পরিষ্কার করছি, গাছের গোড়ায় সার দিচ্ছি। কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাচ্ছি না। যতটুকু সার দরকার, ততটুকু না পেলে গাছের ঠিকমতো পরিচর্যা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, আগাম সবজি চাষে এমনিতেই পরিশ্রম বেশি। তার ওপর সার নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকলে উৎপাদন ভালো হবে কি না, তা নিয়েও চিন্তা করতে হয়। তবে এবার আশা করছি ফলন ভালো হবে এবং দামও ভালো পাবো।

বিজ্ঞাপন

আরেক কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, আগাম সবজি করতে হলে জমিতে বেশি সময় দিতে হয়। সার, সেচ ও শ্রমিকের খরচও বেশি পড়ে। তবে শীতের শুরুতে বাজারে সবজির দাম ভালো পাওয়া যায়। তাই একটু বেশি পরিশ্রম হলেও আগাম সবজি চাষ করছি।

তিনি আরও বলেন, এখন প্রতিদিনই জমিতে আসতে হচ্ছে। কোনো দিন সার দিতে হয়, কোনো দিন আগাছা পরিষ্কার করতে হয়। আবার গাছে রোগবালাই দেখা দিয়েছে কি না, সেটিও দেখতে হয়। আবহাওয়া ভালো থাকলে ফলন ভালো হবে বলে আশা করছি।

বরাদ্দ পর্যাপ্ত হলে কৃষকেরা সার পাচ্ছেন না কেন?

কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত বরাদ্দের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ নিশ্চিত হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। এ জন্য ডিলারদের বরাদ্দ, মজুত, বিক্রির রসিদ এবং কৃষক পর্যায়ে বিতরণের তথ্য পর্যালোচনা করা জরুরি।

কোন এলাকায় কতটুকু সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, ডিলাররা কত পরিমাণ সার পেয়েছেন এবং কৃষকদের কাছে কতটা বিক্রি করেছেন—এসব তথ্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি মিলিয়ে দেখলে সরবরাহের ঘাটতি কোথায় তৈরি হচ্ছে, তা শনাক্ত করা সম্ভব।

একই সঙ্গে সরকার নির্ধারিত দামে কৃষকেরা সার কিনতে পারছেন কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। বরাদ্দ পর্যাপ্ত থাকলেও বিতরণব্যবস্থার কোনো পর্যায়ে সমস্যা দেখা দিলে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহে বাধা তৈরি হতে পারে। আবার নির্দিষ্ট সময়ে চাহিদা বেড়ে গেলে কোনো কোনো এলাকায় সাময়িক সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

মানবাধিকার কর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, সারের বরাদ্দ থাকলেই হবে না, কৃষকেরা সঠিক সময়ে এবং সরকার নির্ধারিত দামে সার পাচ্ছেন কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। বরাদ্দের সার কোথায় যাচ্ছে, কী পরিমাণ মজুত রয়েছে এবং কৃষকদের কাছে কতটা বিতরণ হচ্ছে, তা তদারকি করা জরুরি। কোনো অনিয়ম থাকলে তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

আরও পড়ুন

এ ক্ষেত্রে ডিলারদের বরাদ্দ ও মজুতের হিসাব, বিক্রির রসিদ, কৃষকদের কাছে বিতরণের তথ্য এবং প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এসব তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে সার বিতরণব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব।

জামালপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আলম শরীফ বলেন, জামালপুর জেলায় ১৬ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে শাকসবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে ১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হয়েছে। কৃষকেরা মাঠে সবজি আবাদ ও বীজতলায় চারা পরিচর্যায় ব্যস্ত রয়েছেন। কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা তাঁদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, কৃষকদের হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমাদের পর্যাপ্ত সার বরাদ্দ আছে এবং রবি মৌসুমের জন্যও পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আমরা সেই পরিমাণ সার পাব এবং কৃষকদের মধ্যে সুন্দরভাবে বিতরণ করব। কৃষকেরা নিজ নিজ এলাকার সার ডিলারের পয়েন্টে গিয়ে সংশ্লিষ্ট উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে সার সংগ্রহ করতে পারবেন। আমরা কৃষকদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক আছি।

কৃষি বিভাগের এই আশ্বাসের বিপরীতে মাঠপর্যায়ের কৃষকদের অভিযোগের বিষয়টি যাচাই করা এখন গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের বরাদ্দে ঘাটতি থাকায় চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডিলার পর্যায়ে মজুত ও বিক্রির তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হলে অনিয়ম শনাক্ত করা সহজ হবে। এতে কৃষকেরা সময়মতো প্রয়োজনীয় সার পেতে পারেন এবং আগাম সবজি উৎপাদনে তাঁদের বিনিয়োগ ও সম্ভাব্য ফলন সুরক্ষিত রাখার সুযোগ বাড়বে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD