Logo

৩৮৭ কোটি টাকার প্রকল্পে সিলেটে খুলছে কৃষিপণ্য রপ্তানির দুয়ার

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১৬:৪৩
৩৮৭ কোটি টাকার প্রকল্পে সিলেটে খুলছে কৃষিপণ্য রপ্তানির দুয়ার
ছবি : এআই দিয়ে তৈরি

সিলেটের কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রায় ৩৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক প্যাকিং হাউজ ও কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে বড়শলা এলাকায় প্রায় পাঁচ একর জমিতে এ অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও প্যাকেজিংয়ের পাশাপাশি সরাসরি বিদেশে রপ্তানির সুযোগ বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

সিলেটে উৎপাদিত গোয়ালগাদ্দা শিম, জারা লেবু, নাগা মরিচ, সাতকড়া, কচুর লতি ও বিভিন্ন ধরনের সবজির বিদেশে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে এসব কৃষিপণ্য রপ্তানির সম্ভাবনা থাকলেও পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ও প্যাকেজিং সুবিধার অভাবে তা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। একইভাবে সিলেটের হাওরের দেশি মাছও দেশের বাইরের বাজারে পৌঁছাচ্ছে, তবে রপ্তানির পরিধি আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

এ পরিস্থিতি বিবেচনায় কৃষি বিপণন অধিদপ্তর প্রকল্পটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরি করে কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পে এক হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার কোল্ডস্টোরেজ, আধুনিক প্যাকিং ও গ্রেডিং ব্যবস্থা, মান যাচাইয়ের জন্য ১০টি পরীক্ষাগার, প্রশিক্ষণকেন্দ্র, সম্মেলনকক্ষ এবং বিদেশি ক্রেতাদের জন্য অতিথি ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি পণ্য পরিবহন, লোডিং-আনলোডিং, মান নিয়ন্ত্রণ ও সনদ প্রদানের সুবিধাও রাখা হবে।

প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তুতি হিসেবে গত ১ অক্টোবর ঢাকা ও সিলেটের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা প্রস্তাবিত স্থান পরিদর্শন করে কৃষক, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। তাঁদের মতামতের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্যাকিং হাউজ নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সিলেটের কৃষিপণ্য বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো আধুনিক সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মান নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোর অভাব। ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সরাসরি আন্তর্জাতিক কার্গো ফ্লাইট চালু হলেও কৃষিপণ্য সংরক্ষণের উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় এ অঞ্চলের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি রপ্তানির সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক কার্গো ফ্লাইট চলাচল আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। ঢাকার বাইরে দেশের প্রথম বিমানবন্দর হিসেবে এ কার্যক্রম চালু হলেও প্রয়োজনীয় কোল্ডস্টোরেজ ও প্যাকিং হাউজ না থাকায় সিলেটের কৃষিপণ্য রপ্তানিতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। বর্তমানে এসব কার্গো ফ্লাইটে ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তৈরি পোশাক বিদেশে পাঠানো হচ্ছে।

এ অবস্থায় সিলেটে আধুনিক প্যাকিং হাউজ ও কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। তাঁদের মতে, নারায়ণগঞ্জের শ্যামপুরে থাকা প্যাকিং হাউজের আদলে সিলেটে আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে গোয়ালগাদ্দা শিম, নাগা মরিচ, ফরাস, শিমের বিচি, কচুমুখী, কচুর লতি, জারা লেবু ও সাতকড়াসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে আরও সহজে রপ্তানি করা সম্ভব হবে।

সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, এ ধরনের প্রতিষ্ঠান নির্মাণের জন্য জমি বরাদ্দ দিতে কোনো সমস্যা নেই। আপাতত ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে বড়শলা এলাকায় খাসজমিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে আরও জমি বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক ড. ফজলে এলাহী মোহাম্মদ ফয়সাল মনে করেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কৃষকদের সঙ্গে রপ্তানিকারক ও আমদানিকারক ব্যবসায়ীদের সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হবে। এতে চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ সম্প্রসারণের পাশাপাশি কৃষকদের জন্য উৎপাদিত ফসল বিক্রির স্থায়ী বাজার গড়ে উঠবে।

তিনি বলেন, ‘রপ্তানিকারক ও আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা সরাসরি কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন করাবেন। এতে কৃষকদের জন্য ফসল উৎপাদন ও বিক্রয়ের স্থায়ী বাজার সৃষ্টি হবে।’

গবেষক ফজলে এলাহী মোহাম্মদ ফয়সালের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শাকসবজি ও ফলমূলের উৎপাদন বাড়বে। বিশেষ করে ড্রাগন ফল, সাতকড়া, তেজপাতা ও নাগা মরিচের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিদেশে রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, সিলেটের হাওরের মাছ সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে মান যাচাই এবং উন্নত প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা গড়ে উঠলে ভবিষ্যতে সিলেটে ডেইরি ও পোল্ট্রি খামার সম্প্রসারণের পথও সুগম হবে। মাছ, মাংস ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি রপ্তানিও বহুগুণে বৃদ্ধি করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পরিকল্পনা প্রণয়ন বিভাগের অধীনে গঠিত প্রকল্প কমিটির আহ্বায়ক ও অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগের উপপরিচালক জুলিয়া যেসমিন মিলি জানান, সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়ার পর প্রকল্পের খসড়া ডিপিপি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বিমানবন্দরসংলগ্ন বড়শলা এলাকায় সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ করে প্রায় পাঁচ একর জমিতে আধুনিক কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি জানান, প্রস্তাবিত কমপ্লেক্সে ১০টি পরীক্ষাগার, অফিস ভবন, গ্রেডিং রুম, কোল্ডস্টোরেজ চেম্বার, প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও বিদেশি ক্রেতাদের জন্য অতিথিশালার নকশা তৈরির কাজ চলছে। এ ছাড়া হাওরের মাছ রপ্তানির জন্য সনদ প্রদানের সুবিধা এবং একটি বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাবও রয়েছে।

জুলিয়া যেসমিন মিলি বলেন, ঢাকার শ্যামপুর প্যাকিং হাউজের সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটিগুলো পর্যালোচনা করে সিলেটের অবকাঠামো আরও আধুনিক ও উন্নত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য রপ্তানির উপযোগিতা নিশ্চিত করতে কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আমদানি বিধিবিধান অনুসরণ করে কৃষিপণ্য উৎপাদন, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিংয়ের বিষয়ে কৃষকদের দক্ষ করে তোলা হবে।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর সিলেটে এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, শ্যামপুরের প্যাকিং হাউজ ও কোল্ডস্টোরেজের আদলে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা সম্পন্ন করে দ্রুত প্রকল্পের কাজ শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে চাহিদা অনুযায়ী প্রকল্পের পরিধি আরও বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রস্তাবিত প্রকল্পটি দ্রুত অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করা গেলে সিলেট দেশের অন্যতম প্রধান কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক অঞ্চলে পরিণত হতে পারে। এতে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, কৃষিপণ্যের অপচয় কমানো, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে সিলেটের কৃষিপণ্যের পরিচিতি ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা আরও জোরদার হবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD