হাইব্রিডের দাপটে হারিয়ে গেছে কৃষকের বীজ, কোম্পানিই এখন ভরসা

কৃষির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ বীজের বাজারে নানা সংকট দেখা দিয়েছে। ভেজাল ও নিম্নমানের বীজ, আমদানিনির্ভরতা, বাজার তদারকির সীমাবদ্ধতা এবং নীতিগত দুর্বলতার কারণে ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষক। একসময় কৃষকের নিজের ঘরেই ধান, শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসলের বীজ সংরক্ষিত থাকলেও হাইব্রিড ও উচ্চফলনশীল জাতের বিস্তারের সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে।
বিজ্ঞাপন
যশোরের কৃষি কর্মকর্তা, বীজ আমদানিকারক, ব্যবসায়ী, ক্রেতা-বিক্রেতা ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে বীজ খাতের এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষিখাতে ধারাবাহিক অগ্রগতি হলেও বীজ উৎপাদনে এখনো স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। অথচ ভালো ফলন ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য মানসম্মত বীজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নীতিগত দুর্বলতা, আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণে এ খাতে নানা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে ভেজাল ও নিম্নমানের বীজ বিক্রি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। গ্রাম পর্যন্ত অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের কার্যক্রম থাকায় যথাযথ তদারকির অভাবে অনেক কৃষক মানহীন বীজ কিনে ক্ষতির শিকার হচ্ছেন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
যশোর সদর উপজেলার ভাতুড়িয়া গ্রামের কৃষক শামীম হোসেন বলেন, ‘একসময় কৃষক নিজেই বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতেন। ধানসহ শাক-সবজির বীজের উৎসও ছিল কৃষক। কিন্তু হাইব্রিড প্রযুক্তির কারণে বীজ এখন আর কৃষকের হাতে নেই। সব বীজই এখন বাজার থেকে কিনতে হয়। আর এই সুযোগে গ্রামের সহজ সরল কৃষক অনেক সময় প্রতারিত হন। দাম কম খুঁজতে গিয়ে হাইব্রিডের জায়গায় দেশি বা কম ফলনের কিংবা কম জার্মিনেশনের (চারা গজানো) বীজ কিনে প্রতারিত হন। কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ের এই প্রতারণার চিত্র মাঠেই চাপা পড়ে যায়।’
বিজ্ঞাপন
যশোরের ঢাকা রোড এলাকার বীজ আমদানিকারক ও বিক্রেতা রাহেলা এগ্রো ইন্টারন্যাশনালের বিক্রয়কর্মী ইসমাইল শিকদার রুম্মান বলেন, তারা মানসম্মত ও ভালো কোম্পানির বীজ বিক্রি করেন। তবে গ্রামাঞ্চল থেকে আসা অনেক বীজ ব্যবসায়ী কম দামের বীজের সন্ধান করেন। এ ধরনের বীজ কিনে পরে তা কৃষকদের কাছে বিক্রি করতে গিয়ে তারাও অনেক সময় সমস্যায় পড়েন এবং কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কৃষি গবেষণা ও প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে উচ্চফলনশীল এবং হাইব্রিড জাতের বীজের ব্যবহার বেড়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের বীজে আমদানিনির্ভরতা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বাজারে হাইব্রিড সবজি বীজের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং তৈলবীজের প্রায় ৮০ শতাংশ আমদানিনির্ভর বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তাদের মতে, বীজের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
যশোরে বিভিন্ন খাদ্যপ্রযুক্তি নিয়ে গবেষণাকারী কৃষিবিদ ইবাদ আলী বলেন, ‘একসময় কৃষকই বীজের মূল উৎস ছিলেন। কিন্তু এখন আর সেই পরিস্থিতি নেই। কৃষকের ঘরে এখন আর বীজ নেই। উচ্চফলনশীল জাত বা হাইব্রিড খুঁজতে দিয়ে বীজের মালিকানা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোতে দিয়ে দিয়েছি। যা খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।’
বিজ্ঞাপন
বীজ আমদানিকারকরাও আমদানি প্রক্রিয়ায় নানা সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স (এআইটি), শুল্ক নির্ধারণে জটিলতা, আমদানি ও পরিবহন ব্যয় এবং ব্যবসার ঝুঁকির কারণে বীজ আমদানি কঠিন হয়ে পড়ছে।
যশোরের মোল্যা সীড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘বীজ আমদানির ক্ষেত্রে দুই শতাংশ এআইটি দিতে হয়। বীজ তো কৃষকই ব্যবহার করে। যে কৃষকের জন্য সরকার সার, বীজ, সেচে ভর্তুকি, প্রণোদনা দিচ্ছে; তাদের বীজে এআইটি নির্ধারণ করা দ্বৈতনীতি।’
এআইটি নির্ধারণে কাস্টমসের জটিলতার কথাও জানান তিনি। তরিকুল ইসলামের ভাষ্য, একই সবজি বা ফসলের বীজের বিভিন্ন জাত ও ধরন রয়েছে। কোনো জাতের বীজের দাম পাঁচ ডলার, আবার কোনো জাতের দাম ৫০ ডলার হতে পারে। কিন্তু আমদানির সময় অনেক ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দামের ভিত্তিতে এআইটি নির্ধারণ করা হয়। এতে ৫০০ টাকার বীজের ক্ষেত্রেও কখনো ৩০ হাজার টাকা মূল্যের বীজ ধরে এআইটি দিতে হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
বিজ্ঞাপন
যশোরে ১১১ বছরের পুরোনো বীজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সিটি বীজ ভান্ডারের পরিচালক শেখ রাকিব হোসেন বলেন, ‘বীজ আমদানির ক্ষেত্রে আগে কোনো ট্যাক্স ছিল না। কয়েক বছর হলো, বীজের ক্ষেত্রে এই এআইটি নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এআইটি নির্ধারণে জটিলতা রয়েছে। দামের ভিন্নতা থাকলেও সর্বোচ্চ দামের বিপরীতে এবং মসলাজাতীয় পণ্যের বীজের ক্ষেত্রে বীজের পরিবর্তে মসলা পণ্যের অ্যাসেসমেন্ট করা হচ্ছে। এজন্য আমরা এই অ্যাসেসমেন্টের ক্ষেত্রে কৃষি বিভাগ ও বাংলাদেশ সিড অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএ) প্রতিনিধি রাখার দাবি জানিয়েছি।’
বীজের বাজারদাম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাজারে বহু রকমের বীজ রয়েছে। একই ফসল-সবজির বহু জাত ও বহু কোম্পানির বীজ রয়েছে। ফলে জাত ও কোম্পানি ভেদে দামের ভিন্নতা রয়েছে। তবে দাম খুব একটা ওঠানামা করে না। মাঝে মধ্যে সামান্য বাড়লেও সেটি নির্ভর করে ডলারের দাম, আমদানি-পরিবহন ব্যয়ের ওপরে।’
শেখ রাকিব হোসেন জানান, বীজের বিক্রি মৌসুম ও প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এক মৌসুমের বীজ পরবর্তী মৌসুমে রেখে দেওয়ার সুযোগ সীমিত। দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করলে অঙ্কুরোদ্গমের সক্ষমতা কমে যেতে পারে। তাই নির্দিষ্ট মৌসুমের বীজ ওই মৌসুমেই বিক্রি করতে হয়। এতে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদেরও আর্থিক ঝুঁকি থাকে। তার মতে, কৃষকের জন্য শস্যবীমার পাশাপাশি বীজ ব্যবসায়ীদের জন্য বীমার ব্যবস্থা করা গেলে এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও জানান, সাধারণত কৃষকের মোট চাষাবাদ ব্যয়ের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ বীজ কিনতে ব্যয় হয়। কম দামের বীজের সন্ধান করতে গিয়ে অনেক কৃষক প্রতারণার শিকার হন। এ কারণে বীজ বিক্রেতাদের লাইসেন্স নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজার তদারকি জোরদারের প্রয়োজন রয়েছে। বিক্রেতাদের বীজের জাত ও মৌসুম সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান থাকা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে জাতীয় বীজনীতিকে সময়োপযোগী ও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
যশোর জেলা বীজ প্রত্যয়ন অফিসের বহিরাঙ্গন কর্মকর্তা রহুল আমিন বলেন, বীজ প্রত্যয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি তারা নিয়মিত বাজার মনিটরিং করেন। বীজ নিয়ে কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বা ম্যাজিস্ট্রেটের সহযোগিতায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। তবে জনবল সংকটসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলেও তিনি জানান।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) জাহিদুল ইসলাম বিশ্বাস বলেন, বীজের বিষয়টি বীজ প্রত্যয়ন অফিস দেখভাল করে, আর উৎপাদন ও চাষাবাদের বিষয়গুলো কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তদারক করে। ভেজাল বা নিম্নমানের বীজের কারণে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলে মামলা ও অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে প্রান্তিক কৃষকদের অনেকেই মামলা করতে চান না কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র উপস্থাপন করতে পারেন না। তারপরও কৃষকের স্বার্থে অভিযানসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বীজ খাতের সংকট কমাতে ভেজাল ও নিম্নমানের বীজের বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি, আমদানি ব্যবস্থার জটিলতা দূর করা এবং কৃষকের নিজস্ব বীজ সংরক্ষণ ও উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি জাতীয় বীজনীতিকে আধুনিক ও কার্যকর করার মাধ্যমে খাতটির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।








