Logo

নিজস্ব সৌরবিদ্যুতে চলবে প্রাণ-আরএফএলের সব কারখানা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১৩:২৪
নিজস্ব সৌরবিদ্যুতে চলবে প্রাণ-আরএফএলের সব কারখানা
ছবি: সংগৃহীত

দেশের শিল্প খাতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুতে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। আগামী দুই বছরের মধ্যে নিজস্ব কারখানাগুলোতে ২৫০ মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তুলে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে মোট ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা, জীবাশ্ম জ্বালানির সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের গুরুত্ব বাড়তে থাকায় বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে শিল্পগোষ্ঠীটি। সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে জাতীয় গ্রিড ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি কারখানায় উৎপাদন সচল রাখার পরিকল্পনা করছে তারা।

১,৮০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ পরিকল্পনা

দেশজুড়ে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ৪৭টির বেশি শিল্পপার্ক ও কারখানায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২৫০ মেগাওয়াট। বর্তমানে জাতীয় গ্রিড এবং নিজস্ব ক্যাপটিভ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে এই চাহিদার বড় অংশ পূরণ করা হয়।

বিজ্ঞাপন

বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে প্রতিষ্ঠানটি ৮০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে কারখানার ছাদ ও অব্যবহৃত জায়গায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি মৌলভীবাজারে ১০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি স্বতন্ত্র সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, নিজস্ব চাহিদার সমপরিমাণ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করা। এতে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলেও কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখা সহজ হবে।

৩৫ লাখ বর্গফুট ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা

বিজ্ঞাপন

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যে ২৫টির বেশি কারখানার ১১০টিরও বেশি ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থার আওতায় ৩৫ লাখ বর্গফুটের বেশি ছাদ ব্যবহার করে বর্তমানে প্রায় ৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১৮ শতাংশের বেশি বর্তমানে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে আসছে। পাশাপাশি শিল্পপার্কের অব্যবহৃত জমি ও খালি জায়গায় সৌর প্যানেল বসিয়ে আরও ১৫০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

জাতীয় গ্রিডেও সরবরাহ হচ্ছে বিদ্যুৎ

বিজ্ঞাপন

নিজস্ব চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় অবদান রাখছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। নাটোর, রাজশাহী ও নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি কারখানায় উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার (অপারেশন)-সোলার তৌহিদুল আহাদ বলেন, ‘বর্তমানে নাটোর, রাজশাহী ও নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি কারখানা থেকে নেট মিটারিং ব্যবস্থায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সব কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করবে। তখন নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ আরও বাড়বে।’

তিনি জানান, মৌলভীবাজারের গোবিন্দপুরে ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য জমি কেনা ও অর্থায়নসহ বিভিন্ন কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। শিগগির সেখানে সৌর প্যানেল স্থাপনের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। আরও সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য সরকারের কাছ থেকে জমি লিজ নেওয়ার বিষয়েও কাজ চলছে।

বিজ্ঞাপন

বছরে ৬০ হাজার টন কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য

সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ফলে পরিবেশ সুরক্ষায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে চালু থাকা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মাধ্যমে বছরে প্রায় ৬০ হাজার টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ এড়ানো সম্ভব হচ্ছে।

পরিকল্পিত প্রকল্পগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে কার্বন নিঃসরণ আরও কমবে বলে আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থার চাহিদা পূরণ এবং রপ্তানিতে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে।

বিজ্ঞাপন

বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে পরিবেশগত মানদণ্ড ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ কারণে সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগকে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবেও দেখছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ।

বাসাবাড়ির জন্যও আসছে ‘হোম সোলার’ উদ্যোগ

শিল্পকারখানার পাশাপাশি সাধারণ গ্রাহকদের জন্যও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। ‘হোম সোলার’ কর্মসূচির আওতায় সাশ্রয়ী মূল্যে বিভিন্ন প্যাকেজ চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাসাবাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে ইন্ডাকশন কুকার, রাইস কুকারসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালানোর সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এতে রান্না ও দৈনন্দিন কাজে গ্যাস এবং জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে।

তৌহিদুল আহাদ বলেন, ‘কম খরচে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে ইন্ডাকশন কুকার, রাইস কুকারসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক হোম অ্যাপ্লায়েন্স ব্যবহারে সুযোগ নিয়ে আমরা কাজ করছি। সাশ্রয়ী মূল্যে বিভিন্ন প্যাকেজের আওতায় বাসাবাড়িতে যাতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা যায় সে বিষয়ে আমরা কাজ করছি।’

সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে নীতিগত সহায়তার দাবি

বিজ্ঞাপন

শিল্প খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে শুল্ক সুবিধা, সহজ নেট মিটারিং প্রক্রিয়া, দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা এবং জমি লিজের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরূল ইমাম বলেন, ‘সৌর বিদ্যুৎ সম্প্রসারণে যে ধরনের প্রতিবন্ধকতা আছে সেগুলো খুলে দেওয়া উচিত। এই কার্যক্রমগুলো সহজ করার জন্য সরকারের তরফ থেকে যা যা করা দরকার সেগুলো করা উচিত। সৌরবিদ্যুৎকে প্রমোট করা দরকার।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত নিশ্চয়তা দেওয়া গেলে শিল্প খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ ত্বরান্বিত হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘সৌরবিদ্যুতে আমাদের এই বিনিয়োগ শুধু একটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়, এটি আমাদের পরিবেশগত দায়িত্বের অংশ। সম্প্রতি বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় কারখানা সচল রাখতে বেগ পেতে হয়েছে। যা আমাদের বিকল্প ভাবতে বাধ্য করেছে। আমরা আগামী দুই বছরের মধ্যে ২৫০ মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে একটি টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ৮০০ কোটি টাকার বেশি রুফটপ সোলার স্থাপনে ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছি। কারখানাগুলো সোলারের আওতায় আনতে পারলে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন সম্ভব হবে। এতে একদিকে প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে, অন্যদিকে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে পরিবেশ সুরক্ষায় বড় ধরনের অবদান রাখা সম্ভব হবে।’

কামরুজ্জামান কামালের মতে, শিল্প উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লে কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে প্রতিষ্ঠানের পরিবেশবান্ধব ভাবমূর্তি শক্তিশালী হবে।

সব মিলিয়ে সৌরবিদ্যুতে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের এই বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শিল্পকারখানার জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধি, জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং পরিবেশগত প্রভাব কমানোর ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লক্ষ্য অর্জন জমি প্রাপ্তি, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তার ওপর নির্ভর করবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD