পানিতেই ভাগ্য বদল, ৬ মাসে ১০ কোটি টাকার বাণিজ্য

দক্ষিণাঞ্চলের জলাবদ্ধ এলাকায় পানির ওপর ভাসমান বেড তৈরি করে সবজির চারা উৎপাদন করছেন হাজারো কৃষক। পিরোজপুরের নাজিরপুর ও নেছারাবাদ উপজেলায় কচুরিপানা, শ্যাওলা ও জলজ লতা ব্যবহার করে গড়ে উঠেছে এই কৃষিব্যবস্থা।
বিজ্ঞাপন
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মৌসুমে এ অঞ্চলে প্রায় এক কোটি সবজির চারা উৎপাদিত হয়, যার আনুমানিক বিক্রয়মূল্য ১০ কোটি টাকা। এই খাতের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন প্রায় ছয় হাজার কৃষক।
দক্ষিণাঞ্চলের খাল-বিল ও ছোট নদীবেষ্টিত বিস্তীর্ণ এলাকায় বর্ষাকালে দীর্ঘ সময় জমি পানিতে ডুবে থাকে। পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার দেউলবাড়ি দোবরা এবং নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের অনেক এলাকায় প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত পানি জমে থাকে। ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতে জমিতে সবজির চারা উৎপাদন ও চাষাবাদ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে পানিকে বাধা নয়, বরং চাষাবাদের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। কচুরিপানা, শ্যাওলা, দুলালিলতাসহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ দিয়ে তৈরি করছেন ভাসমান বেড। সেখানেই উৎপাদন করছেন বেগুন, মরিচ, লাউ, করলা, মিষ্টিকুমড়া ও শসাসহ নানা ধরনের সবজির চারা। তুলনামূলক কম খরচে উৎপাদন এবং জলাবদ্ধ এলাকায় আয়ের সুযোগ থাকায় দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে এই পদ্ধতি।
বিজ্ঞাপন
বৈঠাকাটা হাটে নৌকায় নৌকায় বেচাকেনা
ভাসমান কৃষির উপকরণ কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে জমজমাট হয়ে উঠেছে নাজিরপুর উপজেলার বৈঠাকাটা হাট। শনিবার ও মঙ্গলবার বসা এই হাটে ভোর থেকেই নদীতে সারি সারি নৌকায় শুরু হয় বেচাকেনা।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
আশপাশের গ্রাম থেকে বিক্রেতারা নৌকায় করে নিয়ে আসেন শ্যাওলা, কচুরিপানা, দুলালিলতাসহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ। কৃষকেরা এক নৌকা থেকে অন্য নৌকায় ঘুরে দরদাম করে কিনে নেন চাষের উপকরণ। কেউ নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী কেনেন, আবার কেউ নৌকাভর্তি জলজ উদ্ভিদ কিনে নিয়ে যান।
বিজ্ঞাপন
হাটে শ্যাওলা বিক্রি করতে আসা ইব্রাহিম বলেন, মোল্লারহাট থেকে শ্যাওলা নিয়ে আসেন তিনি। কুড়ি হিসেবে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন। তাঁর ভাষ্য, ভালো দিনে আট থেকে নয় হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়, আর বাজার খারাপ থাকলে বিক্রি নেমে আসে প্রায় পাঁচ হাজার টাকায়।
এক ক্রেতা জানান, ভাসমান বেড তৈরি করে সবজির চারা উৎপাদনের জন্যই তিনি শ্যাওলা কিনছেন।

এভাবে জলজ উদ্ভিদের সংগ্রহ, পরিবহন ও বিক্রিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। হাট থেকে কেনা উপকরণ দিয়ে কৃষকেরা নিজেদের এলাকায় ভাসমান বেড তৈরি করে শুরু করেন চারা উৎপাদন।
বিজ্ঞাপন
ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনের আগে তৈরি করতে হয় বীজ বপনের উপযোগী একটি কাঠামো, যা স্থানীয়ভাবে ‘ম্যাদা’ নামে পরিচিত। দুলালিলতা দিয়ে এই ম্যাদা তৈরি করেন গ্রামের নারীরা। এরপর সেখানে বেগুন, মরিচ, লাউ, করলা, মিষ্টিকুমড়া ও শসাসহ বিভিন্ন সবজির বীজ বপন করা হয়।
বীজ থেকে চারা গজালে সেগুলোর পরিচর্যা করা হয়। পরে চারা কিছুটা বড় হলে ভাসমান বেডে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে নিয়মিত যত্নের পর চারাগুলো বিক্রির উপযোগী হয়ে ওঠে।
বিজ্ঞাপন
এই প্রাথমিক কাজে যুক্ত রয়েছেন বহু নারী। কেউ লতা সংগ্রহ করেন, কেউ ম্যাদা তৈরি করেন, আবার কেউ বীজ বপন ও অঙ্কুরিত চারার পরিচর্যা করেন। বাড়ির আশপাশে কিংবা জলাভূমির পাশে বসেই তাঁরা এসব কাজ করেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও অনেক নারী শ্রমিকের আয় সীমিত।
নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের গগন গ্রামের নুরজাহান বেগম তাঁদের একজন। কৃষক জাকির হোসেনের স্ত্রী নুরজাহান বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে এসে ২০০৫ সাল থেকে ভাসমান বেডে সবজির চারা উৎপাদনের কাজ করছেন। নিজের কাজের পাশাপাশি গ্রামের অসচ্ছল ও কর্মহীন নারীদেরও এ কাজে যুক্ত করেছেন। বর্তমানে তাঁর উদ্যোগে কাজ করছেন প্রায় ১০ জন নারী।
নুরজাহান বেগম বলেন, “আমি একজন নারী উদ্যোক্তা। ২০০৫ সাল থেকে এই কাজ করছি। অনেক পরিবার দুঃখ-কষ্টে আছে। আমি তাদের সামনে এগিয়ে নিতে চাই, কিন্তু পারছি না। সরকার যদি বিনা সুদে ঋণ দিত, তাহলে সামনে এগোতে পারতাম, আরও নারীদের কাজ করাতে পারতাম। ঘরে বসে থাকা নারীদের নিয়ে কাজ করতে চাই, তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই।”
বিজ্ঞাপন
দিনভর পরিশ্রমেও আয় সীমিত
কাজের ধরন ও পরিমাণ অনুযায়ী নারী শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারিত হয়। স্থানীয়ভাবে প্রতি এক হাজার ম্যাদা তৈরি করে একজন নারী শ্রমিক পান প্রায় ১৫০ টাকা। দিনভর কাজ করেও অনেকের আয় থাকে ২০০ টাকার আশপাশে।
বলদিয়া গ্রামের নারী শ্রমিক রহিমা বেগম বলেন, “সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কাজ করি। সারা দিন এত পরিশ্রম করেও ২০০ টাকা আয় করতে অনেক কষ্ট হয়। নারীদের আর কোনো কাজ নেই, তাই এগুলোই করি। আমাদের ভালো প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে ভালো হতো। এক হাজার ম্যাদা বানিয়ে দেড়শ টাকা পাই। তাতে কি আর সংসার চলে।”
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় নারীদের মতে, আধুনিক পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন, ব্যবসা পরিচালনা ও বাজারজাতকরণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেলে তাঁদের দক্ষতা বাড়বে। সহজ শর্তে ঋণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে অনেক নারী নিজস্ব উদ্যোগও গড়ে তুলতে পারবেন। এতে তাঁদের আয় বাড়ার পাশাপাশি গ্রামে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ঢাকা-খুলনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যাচ্ছে চারা
নারীদের হাতে বীজ বপন ও প্রাথমিক পরিচর্যার কাজ শেষ হলে চারাগুলো ভাসমান বেডে স্থানান্তর করা হয়। কচুরিপানা ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ দিয়ে তৈরি এসব বেডে সারিবদ্ধভাবে চারা বসানো হয়। এরপর কৃষকেরা চারায় প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগ, লতা পরিষ্কার ও নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে সেগুলো বিক্রির উপযোগী করে তোলেন।
বিজ্ঞাপন
ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনকারী কৃষক লুৎফুর রহমান বলেন, তিনি সকাল ৬টা থেকে কাজ শুরু করেন। বেডে চারা রোপণ, ওষুধ প্রয়োগ ও লতা পরিষ্কারসহ নানা কাজ করতে হয় তাঁকে।
লুৎফুর রহমানের ভাষ্য, এখানকার চারা ঢাকা, খুলনা, গোপালগঞ্জ ও বরিশালসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। প্রতিবছর এখানে লাখ লাখ চারা উৎপাদিত হয়। পেঁপে, লাউ, করলা, বেগুন, মরিচ ও মিষ্টিকুমড়াসহ বিভিন্ন সবজির চারা প্রতি পিস তিন থেকে সাত টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।

বেডে উৎপাদিত চারা বৈঠাকাটা ও আশপাশের হাটে নিয়ে আসেন কৃষকেরা। সেখান থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা বিপুল পরিমাণ চারা কিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করেন। পরে খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে এসব চারা পৌঁছে যায় সবজি চাষিদের হাতে।
বিজ্ঞাপন
পিরোজপুর পৌর শহরে সবজির চারা বিক্রি করেন রফিক শেখ। তিনি বলেন, নাজিরপুরের ভাসমান বেড থেকে প্রতি পিস পাঁচ থেকে সাত টাকা দরে চারা কিনে এনে ১০ থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি করেন। জাত, আকার, চাহিদা ও বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে চারার দাম কমবেশি হয়।
আরও পড়ুন
এই সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে চারা উৎপাদনকারী কৃষক, পাইকারি ব্যবসায়ী, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও খুচরা বিক্রেতাদের নিয়ে গড়ে উঠেছে বিস্তৃত অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক।
ছয় হাজার কৃষকের জীবিকার উৎস
নাজিরপুর ও নেছারাবাদ উপজেলার ভাসমান বেডে উৎপাদিত সবজির চারা এখন স্থানীয় বাজারের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ হচ্ছে।
পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, নাজিরপুর ও নেছারাবাদে ভাসমান বেডে উৎপাদিত চারা খুলনা, যশোর, ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যাচ্ছে। এ পেশার সঙ্গে প্রায় ছয় হাজার কৃষক জড়িত। কৃষি অফিস থেকে তাঁদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মৌসুমে এ অঞ্চলে প্রায় এক কোটি বিভিন্ন প্রজাতির সবজির চারা উৎপাদিত হয়। এসব চারার আনুমানিক বিক্রয়মূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা।
দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য জলজ উদ্ভিদ এবং পানিকে কাজে লাগানোর কৌশল—এই তিনের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে দক্ষিণাঞ্চলের ভাসমান কৃষি। জলাবদ্ধতার কারণে যে জমি প্রচলিত চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ে, সেই পানিকেই কাজে লাগিয়ে কৃষকেরা তৈরি করেছেন আয়ের বিকল্প পথ।
তবে এই খাতের সম্ভাবনা আরও বাড়াতে আধুনিক চাষপদ্ধতি, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ এবং বাজারজাতকরণে সহায়তা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ভাসমান কৃষির প্রাথমিক ধাপে কাজ করা নারীদের প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে তাঁদের শ্রমের মূল্য বাড়ার পাশাপাশি উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার সুযোগও তৈরি হতে পারে।








