‘লক্কর-ঝক্কর’ বিআরটিসি বাসে বেরোবি শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) সাতটি বাস ভাড়া নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এসব বাসের পেছনে মাসে গড়ে প্রায় ১৬ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। সে হিসাবে বছরে ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৯২ লাখ টাকা। তবে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও ভাড়া করা বাসগুলোর ফিটনেস, পরিচ্ছন্নতা ও সেবার মান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
বিজ্ঞাপন
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন সংকট কমাতে গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর বিআরটিসির সঙ্গে এক বছরের জন্য চুক্তি করে কর্তৃপক্ষ। চুক্তির আওতায় সাতটি বাস ভাড়া নেওয়া হয়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আটটি বাসের পাশাপাশি বিআরটিসির ভাড়া করা সাতটি বাসও বিভিন্ন রুটে শিক্ষার্থীদের পরিবহন করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলের তথ্য অনুযায়ী, সাতটি বিআরটিসি বাসের জন্য প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১৬ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। সেই হিসাবে এক বছরে সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ১ কোটি ৯২ লাখ টাকা। তবে চুক্তির পুরো মেয়াদে ঠিক কত টাকা পরিশোধ করা হয়েছে, সে বিষয়ে ১১ মাসের বিল ও পরিশোধসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।
চুক্তির মেয়াদ এবং মোট ব্যয়ের হিসাব জানতে চাইলে পরিবহন পুলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এ-সংক্রান্ত তথ্য পেতে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করতে হবে। আবেদন অনুমোদিত হলে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা হবে।
বিজ্ঞাপন
তবে ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাসে বিআরটিসিকে দেওয়া অর্থের হিসাব পাওয়া গেছে। এপ্রিল মাসে ১৭ লাখ, মে মাসে ১৩ লাখ এবং জুন মাসে ১৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। তিন মাসে মোট ব্যয় হয়েছে ৪৪ লাখ টাকা। এই তিন মাসের ব্যয়কে গড় হিসেবে ধরলে প্রতি মাসে খরচ হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ ৬৭ হাজার টাকা।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে বাজেট-সংক্রান্ত নথিতে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভাড়া করা বাসের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইউজিসির কাছে মোট তিন কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ কোটি ৪১ লাখ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়।
বিজ্ঞাপন
চুক্তি অনুযায়ী, ভাড়া করা বাসগুলো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে রংপুরের বিভিন্ন উপজেলা ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চলাচল করার কথা। এতে দূরবর্তী এলাকার শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সহজ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে বাসগুলোর সেবার মান নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে বাসে চলাচলকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৃষ্টির সময় বাসের ছাদ ও বিভিন্ন অংশের ফুটো দিয়ে ভেতরে পানি পড়ে। অনেক সময় চলন্ত অবস্থায় বাস বিকল হয়ে মাঝপথে আটকে পড়ারও অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি বাসে বহিরাগত যাত্রী ওঠানো, নির্ধারিত স্থানে শিক্ষার্থীদের জন্য বাস না থামানো এবং বাসের ভেতরে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিয়েও অভিযোগ করেছেন তারা। কোনো কোনো শিক্ষার্থী বাসের সিট থেকে তেলাপোকা বের হওয়ার কথাও জানিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী লিমন হোসেন বলেন, ‘টিউশনের জন্য নিয়মিত শহরের দিকে যেতে হয়। তাই প্রায়ই বাসে চলাচল করতে হয়। বাসে উঠলেই দুর্গন্ধ পাওয়া যায়। সিটগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। গাড়িগুলোর ফিটনেস নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। আমার মনে হয়, এভাবে বাস ভাড়া করার পরিবর্তে এই অর্থ দিয়ে নতুন বাস কেনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।’
বিজ্ঞাপন
ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী সুমাইয়া ইসলাম বলেন, বিআরটিসির বাসগুলোতে স্বাভাবিকভাবে চলাচলের মতো পরিবেশ নেই। অনেক সিট ভাঙা। বাসের নিচের লোহার পাত কেঁপে ওঠে। একজন নারী শিক্ষার্থী হিসেবে এসব বাসে ওঠাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়। বসার জায়গাও পর্যাপ্ত নয়। গাড়িগুলোর অবস্থা দেখে ফিটনেস নিয়েও প্রশ্ন জাগে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পরিবহন সংকট কমানোর উদ্দেশ্যে বিপুল অর্থ ব্যয়ে বাস ভাড়া নেওয়া হলেও প্রত্যাশিত মানের সেবা মিলছে না। প্রায় দুই কোটি টাকা বার্ষিক ব্যয়ের বিপরীতে বাসগুলোর ফিটনেস, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবার মান নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে ভাড়া করা সাতটি বাসের ফিটনেসসংক্রান্ত কোনো তথ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলে নেই বলে জানা গেছে। ফলে বাসগুলোর সর্বশেষ ফিটনেস পরীক্ষা কবে হয়েছে কিংবা বর্তমানে সেগুলোর ফিটনেসের মেয়াদ রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বিজ্ঞাপন
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলের পরিচালক মাসুদ রানা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল থেকে নতুন বাস কেনা কিংবা বাস পরিচালনার জন্য সরাসরি চালক ও হেলপার নিয়োগের অনুমতি নেই। এ-সংক্রান্ত অনুমোদন ইউজিসির আওতাধীন। শিক্ষার্থীর সংখ্যার তুলনায় বাসের ঘাটতি থাকায় আমরা ইউজিসির কাছে নতুন বাস কেনার আবেদন করেছিলাম। তবে ইউজিসি নতুন বাস কেনার অনুমোদন না দিয়ে বিকল্প হিসেবে চুক্তির ভিত্তিতে বাস ভাড়া নেওয়ার পরামর্শ দেয়। সে অনুযায়ী বিআরটিসির সঙ্গে চুক্তি করা হয়।
তিনি আরও বলেন, চুক্তির মেয়াদ ইতিমধ্যে এক বছর পূর্ণ হয়েছে। বিআরটিসির সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হবে কি না, সে বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মতামত ও পরামর্শ নেওয়ার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।








