রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারের নানামুখী উদ্যোগ

রাজধানীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানে দখল হওয়া খাল পুনরুদ্ধার, পরিকল্পিত নর্দমা নির্মাণ এবং নর্দমা ও বক্স কালভার্ট থেকে পলিথিন ও ময়লা-আবর্জনা অপসারণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বৃষ্টির পানি দ্রুত অপসারণের লক্ষ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় আরও দুটি নতুন পানি নিষ্কাশন মুখ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রস্তাব ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে ধাপে ধাপে বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ভারী বর্ষণের সময় জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় বহনযোগ্য পাম্প এবং বিদ্যমান পাম্প স্টেশনের মাধ্যমে দ্রুত পানি সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা থাকবে।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, ডিএসসিসির জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কাজ চলছে। নগরীতে জমে থাকা বৃষ্টির পানি দ্রুত আশপাশের নদীতে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আশা করি, শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান হবে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, খাল থেকে ভাসমান বর্জ্য ও স্লাস অপসারণের কাজ অব্যাহত রয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে ডিএনসিসির আওতাধীন ২৯টি খাল দখলমুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নেও কাজ চলছে। বৃষ্টির পানি দ্রুত অপসারণে হটস্পটগুলোতে সাড়ে তিনশর বেশি কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন।
ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে কমলাপুর টিটিপাড়া, ধোলাইখাল ও হাতিরঝিলে তিনটি আউটলেট রয়েছে। এসব আউটলেট দিয়ে ১০৯.২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকার পানি নিষ্কাশন হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এ কারণে আরও দুটি নতুন আউটলেট নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন

এছাড়াও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে মেট্রো ঢাকা রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের আওতায় গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত নতুন একটি বৃহৎ নর্দমা (আউটলেট) নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া শ্যামপুর খালের পানি বুড়িগঙ্গা নদীতে নিষ্কাশনের জন্য খাল প্রকল্পের আওতায় বক্স কালভার্ট ও আট ফুট ব্যাসের বৃহৎ নর্দমা নির্মাণের কাজ চলছে বলে জানায় ডিএসসিসি।
ডিএসসিসি জানায়, নিউমার্কেট, নাইম রোড, গ্রিন রোড, শান্তিনগর, মুগদা মেডিকেল, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড, মাজেদ সরদার রোড, পশ্চিম মালিবাগসহ প্রায় ৩৩টি জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং ২২টি খালের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে খাল পরিষ্কার ও পুনঃখননের কাজ চলছে। চারটি বক্স কালভার্ট পরিষ্কার এবং ওয়ার্ডভিত্তিক নর্দমা পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্রুত পানি অপসারণে ছয়টি পোর্টেবল পাম্পও স্থাপন করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ‘খাল পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি’ প্রকল্পের আওতায় কালুনগর, শ্যামপুর, জিরানী ও মান্ডা এলাকায় চারটি বৃহৎ খাল খননসহ টেকসই উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে।
ডিএসসিসি আরও জানায়, ড্রেনেজ লাইনের মধ্যে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ইন্টারনেট ও টেলিফোনের লাইন থাকায় অনেক ক্ষেত্রে পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের (আইডব্লিউএফএম) অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. সাইফুল ইসলাম বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়নই ঢাকার জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ। এ ছাড়া খাল ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যে ড্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত বের হতে পারে না।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী খনন, বর্ষার আগে ড্রেন পরিষ্কার, আবর্জনা ডাম্পিং (অপসারণ), সময়মতো পাম্প চালু এবং সিটি করপোরেশনগুলোর সমন্বিত ও কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।
ডিএনসিসি জানায়, খাল পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি প্রকল্পের আওতায় খালের পানি নিকটবর্তী বুড়িগঙ্গা নদীতে নিষ্কাশনের জন্য আউটলেট নির্মাণ এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে নর্দমা নির্মাণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি খোলা ও সবুজ এলাকা বৃদ্ধি, পাম্প স্টেশনের সক্ষমতা বাড়ানো, নতুন পাম্প স্টেশন স্থাপন এবং খাল ও নর্দমায় বর্জ্য ফেলা রোধে জনসচেতনতা ও আইন প্রয়োগের কার্যক্রমও চলছে।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান ও বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে দখল হওয়া খাল উদ্ধার, পরিকল্পিত ড্রেন নির্মাণ এবং নর্দমা ও বক্স কালভার্ট থেকে পলি ও বর্জ্য অপসারণে দুই সিটি করপোরেশনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল দখল এবং পলিথিন ও আবর্জনায় নর্দমা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত আশপাশের নদীতে যেতে পারে না। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এ সমস্যা সমাধানে খাল দখলমুক্ত করা, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বক্স কালভার্ট সচল রাখতে দুই সিটি করপোরেশনকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
রাজধানীর জলাবদ্ধতার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে ধানমন্ডি-২৭, গ্রিন রোড, নিউমার্কেট, ধানমন্ডি হকার্স মার্কেট, ইস্কাটন গার্ডেন রোড, পলাশী, এস এম হল এলাকা, সাকুরা মার্কেট, পশ্চিম মালিবাগ, খিলগাঁও উড়ালসড়ক থেকে মালিবাগ কমিউনিটি সেন্টার, আনন্দ বেকারি, মানিকনগর টিটিপাড়া পাম্প এলাকা, টিটিপাড়া ট্রাক স্টেশন, মুগদা মেডিকেল, গোপীবাগ বড় মসজিদ, কমলাপুর রেলস্টেশন, শাপলা চত্বর, নটরডেম কলেজ, চানমারি মোড়, সবুজ কানন, শান্তিবাগ, পল্টন, দৈনিক বাংলা, ফকিরাপুল, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, বুয়েট কোয়ার্টার, আগা সাদেক রোড, মাজেদ সরদার রোড, অভয়দাস লেন, আলমবাগ, পশ্চিম জুরাইন, মুদ্দিবাড়ী পাইপ রোড, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের দক্ষিণ পাশের সড়ক, জিয়া সরণি, মিরপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মোহাম্মদপুর, আগারগাঁও, কারওয়ান বাজার ও ফার্মগেট।
বিজ্ঞাপন
সূত্র: বাসস








