দানের পরও সম্পত্তিতে আজীবন ভোগদখল, আসছে নতুন আইন

সম্পত্তি দান করার পরও দাতা যাতে জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগদখল করতে পারেন, সেই অধিকার নিশ্চিত করতে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’।
বিজ্ঞাপন
বিলটি পাস হলে নির্দিষ্ট রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয় এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে দাতার আজীবন ভোগদখলের অধিকার আইনগত স্বীকৃতি পাবে। ফলে বাবা-মা বা অন্য কোনো নিকটজন সম্পত্তি দান করে দেওয়ার পরও জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত সেটি ব্যবহার ও ভোগ করতে পারবেন।
বর্তমানে সম্পত্তি দানের বিভিন্ন আইনি ব্যবস্থা থাকলেও দাতা জীবদ্দশায় সম্পত্তির ভোগদখলের অধিকার নিজের কাছে রেখে দান করতে পারবেন—এ বিষয়ে ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে নির্দিষ্ট বিধান নেই। নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনে বিলটি উত্থাপন করেন। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বিলটি সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল কমিটিকে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেন।
বিজ্ঞাপন
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে নতুন ১২২ক ও ১২২খ ধারা যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে ‘আজীবন ভোগদখলের অধিকার’ সংরক্ষণ করে সম্পত্তি দানকে হস্তান্তরের একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী, বাবা-মা তাদের সন্তান বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দান করতে পারবেন। একইভাবে নাতি-নাতনিরাও তাদের বাবা-মা, দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানিকে এ ধরনের সম্পত্তি দিতে পারবেন। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও এই পদ্ধতিতে সম্পত্তি হস্তান্তরের সুযোগ থাকবে।
স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে অবশ্যই নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে এ ধরনের দান সম্পন্ন করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
প্রস্তাবিত আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সম্পত্তির মালিকানা অন্যের কাছে হস্তান্তর হলেও দাতার আজীবন ভোগদখলের অধিকার বহাল থাকবে। অর্থাৎ কোনো বাবা তার বাড়ি সন্তানের নামে দান করে দিলেও দলিলে যদি আজীবন ভোগদখলের অধিকার সংরক্ষিত থাকে, তাহলে জীবিত থাকা পর্যন্ত তিনি ওই বাড়িতে বসবাস এবং সম্পত্তি ব্যবহার করতে পারবেন।
এমনকি দাতার জীবদ্দশায় গ্রহীতার মৃত্যু হলেও দাতার ভোগদখলের অধিকার শেষ হবে না। বিলে বলা হয়েছে, গ্রহীতার মৃত্যু হলে আইন অনুযায়ী সম্পত্তি তার উত্তরাধিকারীদের কাছে হস্তান্তরিত হতে পারে; তবে দাতার ভোগদখলের অধিকার সম্পত্তির সঙ্গে বহাল থাকবে।
এর ফলে সম্পত্তির উত্তরাধিকার পরিবর্তিত হলেও দাতা তার জীবদ্দশার ব্যবহার ও ভোগের অধিকার হারাবেন না।
বিজ্ঞাপন
বিশেষ প্রয়োজনের ক্ষেত্রে এই অধিকার পরিবর্তন বা প্রত্যাহারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক কিংবা অন্য কোনো প্রকৃত প্রয়োজন দেখা দিলে দাতা ও গ্রহীতার পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে ভোগদখলের অধিকার পরিবর্তন, প্রত্যাহার বা অন্যভাবে ব্যবস্থাপনা করা যাবে।
কোনো পক্ষ অপ্রাপ্তবয়স্ক, নিখোঁজ, মানসিকভাবে অসুস্থ কিংবা আইনগতভাবে অক্ষম হলে জেলা জজের অনুমোদনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নোটিশ দেওয়া, প্রয়োজনীয় তদন্ত এবং আবেদনটি সৎ বিশ্বাসে করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনা করা হবে।
সরকারের প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থা চালু হলেও প্রচলিত দান বা হেবা পদ্ধতি বাতিল কিংবা সীমিত হবে না। সাধারণ দান, মুসলিম আইনের হেবা এবং আইনস্বীকৃত অন্যান্য সম্পত্তি হস্তান্তরের পদ্ধতিগুলো আগের মতোই কার্যকর থাকবে।
বিজ্ঞাপন
নতুন বিধানটি সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি পৃথক পদ্ধতি হিসেবে যুক্ত হবে এবং সব ধর্মাবলম্বীর জন্য সমভাবে প্রযোজ্য হবে।
বিলটি বর্তমানে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। আইনটি পাস হলে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে উত্তরসূরির কাছে মালিকানা হস্তান্তরের পাশাপাশি দাতার জীবদ্দশার নিরাপত্তাও আইনি সুরক্ষা পাবে। ফলে সন্তান বা নিকটজনকে সম্পত্তি দেওয়ার পর নিজের বসতবাড়ি কিংবা ভোগদখলের অধিকার হারানোর আশঙ্কা অনেকটাই কমবে।








