ফাঁসির রায়ের পরও উচ্চ আদালতে থমকে আছে রামিসা হত্যা মামলার বিচার

দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচারিক আদালতের কার্যক্রম দ্রুত শেষ হলেও উচ্চ আদালতে এসে থমকে আছে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া। এখনো শুরু হয়নি মামলাটির ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি।
বিজ্ঞাপন
দ্রুত বিচার ও ন্যায়বিচারের দাবিতে দেশজুড়ে প্রতিবাদের পর সরকারপ্রধান এক মাসের মধ্যে বিচার শেষ করার আশ্বাস দিয়েছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় মাত্র কয়েক কার্যদিবসের বিচার শেষে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল মূল আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
বিচারিক আদালতের রায়ের মাত্র দুই দিন পর মামলার নথি উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়। প্রধান বিচারপতির নির্দেশনায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত পেপারবুকও প্রস্তুত করা হয়। রামিসা হত্যা মামলাসহ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মৃত্যুদণ্ডের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য জুন মাসে হাইকোর্টে একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা হয়। ওই বেঞ্চ ইতোমধ্যে ২৪টি মামলার আপিল ও ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তি করেছে।
তবে বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে অবকাশকালীন ছুটি চলায় রামিসা হত্যা মামলার শুনানি শুরু হয়নি।
বিজ্ঞাপন
রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল আশা প্রকাশ করে বলেন, আগামী ২৫ অক্টোবর ছুটি শেষে হাইকোর্ট খুললে চলতি বছরের মধ্যেই মামলাটির আপিল ও ডেথ রেফারেন্স শুনানি শেষ হতে পারে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্রুততম সময়ে কোনো মামলার তদন্ত শেষ করে নিম্ন আদালতে বিচার সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে রামিসা হত্যা মামলাটি সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এই হত্যাকাণ্ডের পরেই তার বাড়িতে সরকারপ্রধান গিয়েছিলেন, পরিবারটিকে আশ্বস্ত করেছিলেন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তদন্ত শেষে বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন, যার বাস্তবায়ন হয়েছে।’
তিনি জানান, ‘বিচারিক আদালতে দ্রুততম সময়ে বিচার সম্পন্ন হওয়ার পর রায়টি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে আসে। সেখানেও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়। এরই মধ্যে দণ্ডপ্রাপ্ত সোহেল ও তার স্ত্রী স্বপ্নার দুটি জেল আপিলও মঞ্জুর হয়েছে। এমনকি মামলাটি শুনানির তালিকায় যুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল।’
বিজ্ঞাপন
উচ্চ আদালতে শুনানির ক্ষেত্রে বিরতির কারণ ব্যাখ্যা করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আইনগতভাবে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের রায়ের বিরুদ্ধে ৬০ দিনের মধ্যে আপিল করার যে অধিকার রয়েছে, সেই সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার জন্যই আমরা অপেক্ষা করেছি। কারণ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ২৮ ধারা অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের যেকোনো রায়ের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ পক্ষ পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে আপিল করতে পারেন। এই সময়ের মধ্যে আপিল দায়েরের যে বিধান, সেই বিধানটা যেন দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা গ্রহণ করতে পারেন, এই আইনি অধিকার নিশ্চিত করতেই এই দুই মাস পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রামিসা হত্যাকাণ্ডের পর প্রধান বিচারপতি হাইকোর্টে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে মৃত্যুদণ্ডের মামলাগুলো শুনানির জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠন করেছেন। সেই বেঞ্চ গঠন হওয়ার পর হাইকোর্ট পর্যায়ে আমরা জুন মাস থেকে অন্তত ২৪টি মামলা নিষ্পত্তি করেছি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মাগুরার আছিয়া হত্যা মামলা এবং ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত হত্যা মামলা। রামিসার মামলাটিও ওই কোর্টে শুনানির তালিকাভুক্ত আছে। আশা করছি, ২৫ অক্টোবর আদালত খোলার পর ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত যে সময়কালে আদালতের কার্যকাল চালু থাকবে, সেই সময়ের মধ্যে এই মামলাটি সিরিয়ালে শুনানির জন্য আসতে পারে। সেখানে যদি শুনানি সম্পন্ন হয়, তাহলে ২০২৬ সালের মধ্যেই আপিলের এই প্রক্রিয়াটা নিষ্পন্ন করতে পারব।’
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ভুক্তভোগী শিশু রামিসা আক্তার (৮) পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। চলতি বছরের ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাড়ি থেকে বের হলে আসামি স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে নিজের ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে নিয়ে যান। পরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু করেন স্বজনরা। একপর্যায়ে আসামির কক্ষের সামনে তার জুতা দেখতে পান তারা।
বিজ্ঞাপন
ডাকাডাকি করে কোনো সাড়া না পেয়ে রামিসার বাবা-মা ও ফ্ল্যাটের অন্য বাসিন্দারা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং কক্ষের ভেতরে একটি বড় বালতির মধ্যে তার মাথা দেখতে পান তারা।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
মামলার অভিযোগে বলা হয়, স্বপ্না আক্তারকে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি জানান, তার স্বামী মো. সোহেল রানা (৩০) রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করেছেন।
ওই ঘটনায় ১৯ মে রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা দুজনকে আসামি করে পল্লবী থানায় মামলা করেন। পরে স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়। সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন ২০ মে সোহেল রানা আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।
বিজ্ঞাপন
২৪ মে সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান। পরে অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে বিচারের জন্য মামলাটি ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।
১ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন। পরদিন বাবা, মা, বোন, প্রত্যক্ষদর্শী, সুরতহাল প্রতিবেদনের সাক্ষী, চিকিৎসক, ম্যাজিস্ট্রেট ও তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়।
৩ জুন আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়। এ সময় সোহেল রানা আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তবে তার স্ত্রী স্বপ্না নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।
বিজ্ঞাপন
৪ জুন রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানি হয়। রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের মৃত্যুদণ্ড এবং আসামিপক্ষ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আবেদন করে। এরপর ৭ জুন বিচারিক কার্যক্রম শেষ করে রায় ঘোষণা করা হয়।
রায়ে সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি সোহেলকে ৫ লাখ টাকা এবং স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এই অর্থ ভুক্তভোগী রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারীদের দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। অর্থদণ্ড পরিশোধ না করলে আসামিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে তা আদায়ের নির্দেশও দেন আদালত।
গত ৯ জুন মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়সহ ৭২ পৃষ্ঠার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। এর মধ্যে ৬৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় এবং মৃত্যুদণ্ডের ডেথ রেফারেন্সের তিন পৃষ্ঠা ছিল।
বিজ্ঞাপন
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত জানান, হত্যার আগে রামিসাকে ধর্ষণ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সোহেল রানা স্বীকারোক্তি দেওয়ার পর তা প্রত্যাহারের কোনো আবেদন করেননি। এ কারণে আদালত মনে করেন, তিনি স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকার করেছেন। একই সঙ্গে স্বপ্না তার স্বামীকে পালাতে সহযোগিতা করেছেন এবং অপরাধ প্রতিরোধে কোনো ভূমিকা নেননি বলেও আদালতের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়।








