বাজেটে আইটি ও ফ্রিল্যান্সিং খাতে আসছে বড় সুখবর

দেশের তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ এবং ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে একাধিক কর-সুবিধা ও প্রণোদনা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট হিসেবে বিবেচিত এই বাজেটে তরুণ উদ্যোক্তা, কনটেন্ট নির্মাতা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রযুক্তি উৎপাদন খাতের জন্য বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকার আভাস পাওয়া গেছে।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ফ্রিল্যান্সিং আয়কে করমুক্ত রাখার পাশাপাশি কনটেন্ট ক্রিয়েশন থেকে অর্জিত আয়েও কর অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে স্টার্টআপ ও প্রযুক্তিনির্ভর নতুন উদ্যোগগুলোর জন্য টার্নওভার কর শূন্য শতাংশ নির্ধারণের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
আগামী অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের মাধ্যমে এসব প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।
দেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে ফ্রিল্যান্সিং দিন দিন শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করছে। এই খাতের আয়কে আরও উৎসাহিত করতে সরকার কর অব্যাহতির পরিধি সম্প্রসারণের চিন্তা করছে বলে জানা গেছে।
বিজ্ঞাপন
বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ফ্রিল্যান্সিং সেবার ওপর কর ছাড় থাকলেও নতুন প্রস্তাবে অন্যান্য ধরনের ফ্রিল্যান্সিং কার্যক্রমকেও একই সুবিধার আওতায় আনা হতে পারে। এর ফলে ফ্রিল্যান্সাররা আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে আয় দেশে আনতে আরও উৎসাহিত হবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর-সুবিধা অব্যাহত থাকলে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং বাজারে আরও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবে এবং রপ্তানি আয়ও বাড়বে।
বিজ্ঞাপন
ডিজিটাল যুগে কনটেন্ট ক্রিয়েশন একটি বড় অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে। ইউটিউব, ফেসবুক, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম, পডকাস্ট, ব্লগিং এবং অন্যান্য ডিজিটাল কনটেন্ট থেকে আয় করা তরুণদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কনটেন্ট নির্মাতাদের আয় করমুক্ত করার প্রস্তাবও বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এটি কার্যকর হলে দেশের ক্রিয়েটর ইকোনমি আরও শক্তিশালী হবে এবং নতুন প্রজন্মের জন্য আয় ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগকে উৎসাহ দিতে স্টার্টআপ খাতের জন্যও বিশেষ কর-সুবিধার প্রস্তাব রয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ব্যবসা, উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠান এবং স্টার্টআপ কোম্পানির টার্নওভার কর শূন্য শতাংশ নির্ধারণ করা হতে পারে। উদ্যোক্তারা বলছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ নতুন ব্যবসা গড়ে তুলতে আগ্রহীদের জন্য বড় সহায়তা হিসেবে কাজ করবে।
বিজ্ঞাপন
তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই সুবিধা নতুন স্টার্টআপের জন্য নাকি ক্ষতিগ্রস্ত পুরোনো স্টার্টআপগুলোর জন্যও প্রযোজ্য হবে, সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রসারে কম্পিউটার ও ডিজিটাল যন্ত্রপাতির ওপর করের চাপ কমানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। প্রস্তাব অনুযায়ী কম্পিউটার প্রিন্টার, মনিটর, ফ্ল্যাশ মেমোরি, পোর্টেবল কম্পিউটিং ডিভাইসসহ কয়েকটি প্রযুক্তিপণ্যের আমদানিতে বিদ্যমান অগ্রিম করের হার কমানো হতে পারে।
এতে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ ব্যবহারকারীরা তুলনামূলক কম দামে প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহারের সুযোগ পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। সরকার স্থানীয়ভাবে প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে চায়। সে কারণে কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল ও উপকরণ আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান কর ও শুল্ক সুবিধার মেয়াদ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এ ধরনের উদ্যোগ দেশীয় শিল্পায়ন, প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা।
দেশে উৎপাদিত মোবাইল ফোন শিল্পকে আরও শক্তিশালী করতে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে কর হ্রাসের প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন সংযোজন ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কাঁচামালের ওপর অগ্রিম করের হার কমানো হতে পারে। এতে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে শিল্পখাত আরও স্থিতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যে এই ধরনের নীতিগত সহায়তা স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে।
বিজ্ঞাপন
মোবাইল অপারেটর ও টেলিযোগাযোগ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও একাধিক সুবিধা বিবেচনায় রয়েছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবার ওপর উৎসে করের হার কমানোর প্রস্তাব থাকায় অপারেটরগুলোর নগদ প্রবাহ উন্নত হতে পারে। পাশাপাশি নতুন সিম কার্ডের ওপর বিদ্যমান কর কাঠামোয় পরিবর্তন এলে গ্রাহকদের জন্যও সাশ্রয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ছাড়া টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন ফি ও রাজস্ব ভাগাভাগি সংক্রান্ত কর কাঠামোতেও কিছু পরিবর্তন আসতে পারে বলে জানা গেছে। যদিও মোবাইল ও টেলিকম খাতে বেশ কিছু সুবিধার আলোচনা রয়েছে, তবে ফিক্সড ব্রডব্যান্ড খাতে বড় ধরনের কোনো নতুন প্রণোদনার খবর পাওয়া যাচ্ছে না।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে মানসম্মত ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রসার ঘটাতে ব্রডব্যান্ড অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ কর-সুবিধা প্রয়োজন ছিল। তবে প্রস্তাবিত বাজেটে সে ধরনের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ না থাকলে এই খাত প্রত্যাশিত গতি নাও পেতে পারে।
বিজ্ঞাপন
মোবাইল ফোন ছাড়াও রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজার, এয়ার কন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিন, এটিএম, সিসিটিভি এবং অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে কর-সুবিধার মেয়াদ বাড়ানোর চিন্তা করা হচ্ছে।
সরকারের লক্ষ্য হলো এসব পণ্যের উৎপাদন ব্যয় কমানো, স্থানীয় শিল্পকে শক্তিশালী করা এবং রপ্তানির সম্ভাবনা বাড়ানো। দেশীয় ই-বাইক শিল্পের বিকাশে বিদ্যমান কর ও শুল্ক অব্যাহতি সুবিধা আরও সম্প্রসারণের প্রস্তাব রয়েছে। শুধু উৎপাদনকারী নয়, যন্ত্রাংশ ও পার্টস সরবরাহকারী স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকেও রেয়াতি সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
প্রস্তাবিত বাজেটে ১৫০ সিসির বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। তবে এ কারণে মোটরসাইকেল মালিকদের অতিরিক্ত কর দিতে হবে না। মূলত কর ব্যবস্থাকে আরও সুশৃঙ্খল করার উদ্দেশ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কর প্রদানে উৎসাহ বাড়াতে ‘সেরা করদাতা পুরস্কার নীতিমালা ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই নীতিমালার আওতায় বিভিন্ন খাতের মোট ৬৭ জন করদাতাকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজস্ব কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবারের বাজেট প্রণয়নে সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করের চাপ সৃষ্টি না করে ব্যবসা সহজীকরণ, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং ডিজিটাল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যেই বিভিন্ন কর-সুবিধা ও প্রণোদনার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।








