বাজেটে ফিরল কালো টাকা সাদা করার সুযোগ

প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটে আবারও অপ্রদর্শিত আয় বা কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত অর্থবিলে বলা হয়েছে, নির্ধারিত কর পরিশোধের মাধ্যমে এ সুবিধা গ্রহণ করলে সংশ্লিষ্ট অর্থের উৎস নিয়ে কোনো কর্তৃপক্ষ প্রশ্ন তুলতে বা তদন্ত করতে পারবে না।
বিজ্ঞাপন
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেটের সঙ্গে উপস্থাপিত অর্থবিলে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার এই বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
যদিও বিভিন্ন মহল থেকে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ না রাখার আহ্বান জানানো হয়েছিল, তবুও প্রস্তাবিত অর্থবিলে এ সংক্রান্ত বিধান রাখা হয়েছে। আগামী ৩০ জুন বাজেট পাস হওয়ার পর বিধানটি অপরিবর্তিত থাকলে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত জমি, ভবন ও অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে এ সুযোগ কার্যকর হবে।
বিজ্ঞাপন
অর্থবিল অনুযায়ী, নির্ধারিত কর পরিশোধের মাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করা গেলে সেই অর্থের উৎস বা পরিশোধিত কর নিয়ে কোনো ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন কিংবা অনুসন্ধানমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না।
বিলে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের প্রচলিত অন্য কোনো আইনে ভিন্ন কিছু থাকলেও স্বপ্রণোদিতভাবে প্রদর্শিত বিনিয়োগ, ক্রয় বা প্রাপ্তির উৎস এবং এর বিপরীতে পরিশোধিত কর সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন বা কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না।
বিজ্ঞাপন
নতুন বিধান অনুসারে, কেউ যদি জমি, ভবন বা অ্যাপার্টমেন্টের প্রকৃত ক্রয়মূল্য দলিলমূল্যের চেয়ে বেশি দেখাতে চান, তাহলে অতিরিক্ত অংশকে অপ্রদর্শিত আয় হিসেবে ঘোষণা করে প্রচলিত ব্যক্তিগত আয়কর হারে কর পরিশোধ করতে হবে। এর মাধ্যমে ওই অর্থ বৈধ করা যাবে।
একই সুযোগ রাখা হয়েছে বিক্রেতাদের ক্ষেত্রেও। জমি বা ভবন বিক্রির সময় দলিলমূল্যের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করা হলে সেই অপ্রদর্শিত অংশের ওপর মূলধনী মুনাফার জন্য নির্ধারিত হারে কর দিয়ে অর্থ বৈধ করা যাবে। বর্তমানে মূলধনী মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ কর প্রযোজ্য।
তবে এ সুবিধা পেতে কিছু শর্তও মানতে হবে। আয়কর আইনের আওতায় কোনো অডিট বা তদন্ত কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগে স্বেচ্ছায় অপ্রদর্শিত আয় ঘোষণা করলে নিয়মিত করহারেই সুবিধা পাওয়া যাবে। কিন্তু কার্যক্রম শুরুর পর আয় বৈধ করতে চাইলে নির্ধারিত করের পাশাপাশি অতিরিক্ত ২০ শতাংশ কর দিতে হবে।
বিজ্ঞাপন
অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করতে আগ্রহীদের আয়কর রিটার্নে জীবনযাপন-সংক্রান্ত ব্যয়ের বিবরণ এবং উৎসে কর্তিত বা সংগৃহীত করের তথ্যও উল্লেখ করতে হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে কর কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনা করবে।
আরও পড়ুন: দেশের বাজারে স্বর্ণের দামে ফের বড় পতন
তবে যেসব ব্যক্তি অপ্রদর্শিত আয় ঘোষণার আগে কোনো বিচারাধীন মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন বা কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, তারা এ সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন না।
বিজ্ঞাপন
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটেও অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার একটি বিধান রাখা হয়েছিল। পরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে তা প্রত্যাহার করা হয়। অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও বিভিন্ন পর্যায়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল এবং সেসব ক্ষেত্রেও অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন না তোলার বিধান ছিল।
এদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে এমন সুযোগ রাখার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, কোনো কর্তৃপক্ষের প্রশ্ন তোলার সুযোগ না রেখে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার উদ্যোগ দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার শামিল।
আরও পড়ুন: আজকের মুদ্রার দর : ১১ জুন ২০২৬
বিজ্ঞাপন
এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, আবাসন খাতের গতি ফেরানো, বিনিয়োগ বাড়ানো বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার যুক্তিতে এ ধরনের সুযোগ দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। একই সঙ্গে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ স্থায়ীভাবে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে তারা।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে সম্ভাব্য সাধারণ ক্ষমা বা অ্যামনেস্টি দেওয়ার আলোচনার ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ এবং কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।








