Logo

উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে ভিয়েতনাম, বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২ জুলাই, ২০২৬, ১৭:৩২
উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে ভিয়েতনাম, বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জন করেছে ভিয়েতনাম। রপ্তানিনির্ভর শিল্পায়ন, ধারাবাহিক অর্থনৈতিক সংস্কার, বিপুল বিদেশি বিনিয়োগ এবং উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশটি নতুন এই অবস্থানে পৌঁছেছে। অন্যদিকে স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পার হলেও বাংলাদেশ এখনও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবেই রয়েছে। ফলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ভিয়েতনামের এই অগ্রগতি বাংলাদেশের জন্য নতুন করে ভাবনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বব্যাংকের ১ জুলাই প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভিয়েতনামের মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (জিএনআই) বেড়ে ৪ হাজার ৯৭০ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের জন্য বিশ্বব্যাংক নির্ধারিত ন্যূনতম সীমা ৪ হাজার ৬৩৬ ডলার হওয়ায় দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিম্নমধ্যম আয়ের তালিকা থেকে বেরিয়ে উচ্চমধ্যম আয়ের অর্থনীতির কাতারে স্থান পেয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই অর্জন কেবল ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক সক্ষমতার স্বীকৃতি নয়; এটি বাংলাদেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কারণ একই ধরনের রপ্তানি খাত—বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও উৎপাদনশিল্পে—দুই দেশ দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করে আসছে।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বব্যাংকের এই শ্রেণিবিন্যাস আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশ উচ্চমধ্যম আয়ের পর্যায়ে পৌঁছালে সেখানে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, উৎপাদন সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। এর ফলে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই), শিল্প সম্প্রসারণ এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ আরও বাড়ে।

ভিয়েতনামের এই সাফল্যের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি, দক্ষ মানবসম্পদ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। দেশটি শুধু তৈরি পোশাক নয়, ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর, মোবাইল ফোন, জুতা, কৃষিপণ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন খাতেও শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলেছে।

এই অর্জনের ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন—সবগুলোই এখন উচ্চমধ্যম আয়ের বা তারও বেশি আয়ের দেশের তালিকায় রয়েছে। ফলে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় ভিয়েতনামের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেলেও এখনও তা উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করতে পারেনি। যদিও দেশটি ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে রয়েছে, তবে সেটি বিশ্বব্যাংকের আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসের সঙ্গে এক নয়। অর্থাৎ এলডিসি থেকে উত্তরণ মানেই উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া নয়।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ভিয়েতনামের অগ্রগতি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। তার মতে, ধারাবাহিক অর্থনৈতিক সংস্কার, রপ্তানির বহুমুখীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারলে তুলনামূলক স্বল্প সময়েও একটি দেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করতে পারে।

তিনি বলেন, ভিয়েতনাম শুধু পোশাকশিল্পের ওপর নির্ভর করেনি। বরং ইলেকট্রনিকস, প্রযুক্তিপণ্য ও উচ্চমূল্য সংযোজিত শিল্পে বিনিয়োগ বাড়িয়ে রপ্তানির পরিধি বিস্তৃত করেছে। পাশাপাশি দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করে বিপুল বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে।

বিজ্ঞাপন

তার মতে, বাংলাদেশেরও এখন রপ্তানির বৈচিত্র্য বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ইলেকট্রনিকস, ওষুধ, রাসায়নিক শিল্প, উচ্চমূল্য সংযোজিত পোশাক এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন খাতে নীতিগত সহায়তা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করা এবং নীতি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।

মহিউদ্দিন রুবেল আরও বলেন, বন্দর, রেলপথ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে দ্রুত বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষায় গুরুত্ব বৃদ্ধি, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ বাংলাদেশের অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বিবেচনায় পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্পায়নের দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

বিজ্ঞাপন

অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, গত দুই দশকে উৎপাদনমুখী বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশ, দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্যবসা সহজীকরণ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে শক্ত অবস্থান তৈরির মাধ্যমে ভিয়েতনাম ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য উত্তেজনার পর বহু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কেন্দ্র ভিয়েতনামে স্থানান্তর করায় দেশটির কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জন্যও এখন উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্প, প্রযুক্তিপণ্য, সেমিকন্ডাক্টর, অটোমোটিভ যন্ত্রাংশসহ আধুনিক উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

তাদের অভিমত, আগামী এক দশকে যদি বাংলাদেশ ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে পারে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং রপ্তানির বহুমুখীকরণে সফল হয়, তাহলে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের কাতারে পৌঁছানো সম্ভব। তবে এজন্য সুশাসন, নীতিগত সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগবান্ধব অর্থনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও অগ্রাধিকার।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD