৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা এনবিআরের

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় পরিসরে পরিকল্পনা নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কর প্রশাসনে বিনিয়োগ, দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার, করদাতা সেবা উন্নয়ন ও কর পরিপালন বাড়ানোর মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এনবিআর চলতি অর্থবছরের রাজস্ব কৌশল সাজিয়েছে ‘থ্রি-আর’ নীতির ওপর—রিকভারি (পুনরুদ্ধার), রেস্টোরেশন (পুনর্বহাল) ও রিকনস্ট্রাকশন (পুনর্গঠন)। এর মধ্যে রিকভারি কৌশলে রাজস্ব আদায়ে গড়ে ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য রয়েছে। রেস্টোরেশনের মাধ্যমে করের আওতা বাড়ানো ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। আর রিকনস্ট্রাকশনের আওতায় স্বচ্ছতা বাড়িয়ে স্বেচ্ছায় কর পরিপালন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এনবিআরের বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসব পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। বৈঠকে সরকারি ব্যয়ের চাহিদা পূরণে এনবিআরের সক্ষমতা, কর-জিডিপি অনুপাতের ব্যবধান কমানো, সাংগঠনিক কাঠামো এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়েও আলোচনা হয়।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে আয়কর অনুবিভাগ থেকে ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা, ভ্যাট অনুবিভাগ থেকে ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা এবং কাস্টমস অনুবিভাগ থেকে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এনবিআরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস প্রশাসনে সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে তারা আশা করছেন।
বিজ্ঞাপন
আয়করে বাড়তি রাজস্বের পরিকল্পনা
আয়কর খাতে নিয়মিত প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কর ফাঁকি দেওয়া অর্থ উদ্ধার, উৎসে করের আওতা বাড়ানো, কর কাঠামোয় পরিবর্তন, বিনিয়োগে কর রেয়াত পুনর্বিন্যাস, মূলধনি মুনাফায় কর আরোপ, কর পরিপালন জোরদার এবং করসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয়কর ও ভ্রমণ কর বাবদ ১ লাখ ৪৫ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা আদায় হয়েছিল। চলতি অর্থবছরে ১০ শতাংশ নিয়মিত প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে অতিরিক্ত ১৪ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা আদায়ের প্রত্যাশা করছে এনবিআর।
বিজ্ঞাপন
কর ফাঁকি দেওয়া অর্থ উদ্ধারে বিভিন্ন গোয়েন্দা ও কর বিভাগের কার্যক্রমের মাধ্যমে আরও ৩ হাজার কোটি টাকা এবং করসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে ১ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে। বিলম্বে রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ দিয়ে স্বেচ্ছায় কর পরিপালন বাড়ানোর মাধ্যমেও অতিরিক্ত ৫০০ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এ ছাড়া ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত প্রগতিশীল করহার চালু, বিনিয়োগজনিত কর রেয়াতের হার ও সীমা পরিবর্তন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য টার্নওভার কর এবং ব্যবসায়ী করদাতাদের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী জমা বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে বাড়তি রাজস্ব আদায়ের প্রক্ষেপণ রয়েছে।
বিজনেস-টু-বিজনেস মডেলে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে উৎসে কর আদায় করে ৭ হাজার কোটি টাকা, আবাসন খাতে আইএফআরএস-১৫ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ৪ হাজার কোটি টাকা এবং জমি, ফ্ল্যাট ও অন্যান্য মূলধনি সম্পদ বিক্রির মুনাফায় নিয়মিত করহার প্রয়োগ করে আরও ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ভ্যাটে বাড়বে নজরদারি
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভ্যাট খাতে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬৯ কোটি টাকা আদায় হয়েছিল। চলতি অর্থবছরে ১০ শতাংশ নিয়মিত প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে আরও ১৫ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা আদায়ের প্রত্যাশা করছে এনবিআর।
উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন বাড়ার ফলে অতিরিক্ত ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং বিড়ি-সিগারেটসহ তামাক খাত থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। অবৈধ সিগারেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে আরও ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
এ ছাড়া নিরীক্ষা, বকেয়া রাজস্ব আদায়, ভ্যাট নিবন্ধনের আওতা বাড়ানো, উচ্চঝুঁকির প্রতিষ্ঠানে নজরদারি এবং কর পরিপালনের ঘাটতি কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বিচারাধীন মামলার ৫০ শতাংশ এবং অর্থবছরের মধ্যে অনিষ্পন্ন মামলার অন্তত ৯৫ শতাংশ নিষ্পত্তির লক্ষ্য রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
কাস্টমসে ১ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য
চলতি অর্থবছরে কাস্টমস অনুবিভাগের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাত থেকে ১ লাখ ১১ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা আদায় হয়েছিল।
নিয়মিত প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে ১১ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা এবং বাজেটের বিভিন্ন পদক্ষেপ থেকে আরও ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আদায়ের প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বকেয়া রাজস্ব আদায়, গোয়েন্দা তৎপরতা, প্রতিরোধমূলক অভিযান, পণ্য খালাস-পরবর্তী নিরীক্ষা, নিলাম, আমদানিপণ্যের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস ও মূল্য নির্ধারণ এবং বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধের মাধ্যমে অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। পণ্য খালাস-পরবর্তী নিরীক্ষা থেকে ৫০০ কোটি, নিলাম থেকে ৫০০ কোটি, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধ করে ১ হাজার ৮০০ কোটি এবং স্থগিত রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে ১৪০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।








