রাজস্ব কমায় ভ্যাট নীতিতে পরিবর্তন, উদ্বিগ্ন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত গতি না আসায় ভ্যাট ও কর ব্যবস্থাপনায় একাধিক সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪৭ শতাংশ বাড়িয়ে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও শুরুতেই বিভিন্ন খাতে আদায় নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
কর ফাঁকি রোধ, বকেয়া কর আদায় এবং করের আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভ্যাট ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনতে উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর। তবে বাজেটে ব্যবসায়ীদের জন্য প্রতি মাসের পরিবর্তে তিন মাস পরপর ভ্যাট রিটার্ন জমা ও পরিশোধের যে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, তা পুনর্বিবেচনার উদ্যোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ের রাজস্ব আদায়ের পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। সংস্থাটির এক কর্মকর্তা জানান, আয়কর আইন ও ভ্যাট রিটার্ন জমার নিয়মে পরিবর্তনের কারণে তথ্য সমন্বয়ে কিছুটা সময় লাগছে।
এদিকে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও দেশে জ্বালানি সংকটের প্রভাব ব্যবসা-বাণিজ্যে পড়ায় ব্যক্তি আয় ও রাজস্ব আদায়েও এর প্রভাব পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিজ্ঞাপন
ভ্যাট আদায় কমায় মাসিক রিটার্ন ফেরানোর উদ্যোগ
ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে চলতি বাজেটে তিন মাস পরপর ভ্যাট রিটার্ন জমা ও ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নতুন ব্যবস্থা চালুর পর প্রথম দুই মাসে ভ্যাট আদায় কমে যাওয়ায় আগের মাসিক রিটার্ন ব্যবস্থায় ফেরার বিষয়টি বিবেচনা করছে এনবিআর।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এ বিষয়ে সম্প্রতি এনবিআরের ভ্যাট নীতি শাখা অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করার কথা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, প্রতি মাসে অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য কঠিন। তিন মাস পরপর রিটার্ন দেওয়ার সুযোগ থাকলে তাদের ওপর প্রশাসনিক ও আর্থিক চাপ তুলনামূলক কম থাকে।
গুলিস্তানের পোশাক ব্যবসায়ী তুহিন ফিরোজীও বলেন, ছোট ব্যবসায়ীদের নিয়মিত রিটার্ন দিতে কাজের সময় থেকে আলাদা সময় বের করে ভ্যাট অফিসে যেতে হয়। তিন মাস পরপর রিটার্ন দেওয়ার ব্যবস্থা তাদের জন্য তুলনামূলক সুবিধাজনক।
এনবিআর সূত্র বলছে, দেশে ভ্যাট নিবন্ধিত বা বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বরধারী (বিআইএন) প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮ লাখের বেশি। চলতি অর্থবছরের জুলাই ও আগস্টে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ভ্যাট আদায় প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে।
বিজ্ঞাপন
জুলাইয়ে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৯ হাজার ৩০১ কোটি টাকা। আগের বছরের একই মাসে আদায় হয়েছিল ১১ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। আগস্টে সাময়িক হিসাবে আদায় হয়েছে ৮ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছরের আগস্টে ছিল ১১ হাজার ৮১ কোটি টাকা।
ক্ষুদ্র ব্যবসায় প্যাকেজ ভ্যাটের পরিকল্পনা
এদিকে প্রান্তিক পর্যায়ের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতায় আনতে প্যাকেজ ভ্যাট চালুর পরিকল্পনাও করছে এনবিআর। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউনিয়ন পর্যায়ের দোকান ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য মাসে ৫০০ টাকা, উপজেলা পর্যায়ে ১ হাজার টাকা এবং জেলা সদর ও জেলা পৌর এলাকায় ২ হাজার টাকা নির্ধারিত ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও এ অর্থ পরিশোধের সুযোগ রাখার কথা ভাবা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
ইতোমধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তারা। তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে কোন প্রতিষ্ঠান এই ব্যবস্থার আওতায় আসবে, তা নির্ধারণ করা হবে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
হেলাল উদ্দিন বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দার সময়ে একের পর এক নতুন সিদ্ধান্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ বাড়াতে পারে। আয়কর, ভ্যাটসহ অন্যান্য ব্যয় বহনের পাশাপাশি নতুন প্যাকেজ ভ্যাটের পরিকল্পনা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
করবিদ স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ভ্যাটের আওতায় আনার উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে। তবে এ বিষয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে যথাযথ সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে তারা আতঙ্কিত না হন।
বিজ্ঞাপন
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, নতুন কর বা ভ্যাট ব্যবস্থার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ছে কি না, সেটিও নজরদারিতে রাখতে হবে। প্যাকেজ ভ্যাটের অজুহাতে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন কি না, তা পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।
এদিকে আয়কর রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রেও চলতি সময়ে গতি কমেছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ছয় লাখের কিছু কম রিটার্ন জমা পড়েছে। গত করবর্ষে রিটার্ন দাখিল করেছিলেন ৪৯ লাখ ৫৮ হাজার করদাতা। বর্তমানে দেশে টিআইএনধারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩১ লাখ।








