Logo

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে যে বার্তা দিলো আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১৬:০৮
বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে যে বার্তা দিলো আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক
ছবি: সংগৃহীত

বাড়তি রাজস্ব আয়, জ্বালানি ভর্তুকিতে সতর্কতা, আর্থিক লেনদেনে নিরাপত্তা এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক। বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, উচ্চ সরকারি ঋণ, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে কর্মসংস্থানে সম্ভাব্য পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য এসব বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভায় ১৯১টি সদস্যদেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সম্মেলনে বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন অর্থায়ন, দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তির সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত সভায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং তরুণদের কর্মসংস্থানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্য প্রভাবও আলোচনায় আসে। সম্মেলনের আলোচনার ভিত্তিতে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তিনটি অগ্রাধিকার হলো—রাজস্ব আয় বাড়িয়ে ঋণ পরিশোধ ও উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনা, জ্বালানি ও বৈদেশিক অর্থায়নের চাপ মোকাবিলায় অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়ানো এবং তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করা।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে ঋণপ্রস্তাব ও অনুমোদিত ঋণের মধ্যে পার্থক্য বোঝার ওপরও গুরুত্ব রয়েছে। কোনো অর্থায়ন প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার আগে অর্থের পরিমাণ, সুদের হার, পরিশোধের সময়সীমা, শর্ত এবং অর্থ ছাড়ের পর্যায় যাচাই করা জরুরি। একইভাবে, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি সেই বিনিয়োগ কতটা কর্মসংস্থান তৈরি করছে এবং কোন খাতে যাচ্ছে, তা মূল্যায়ন করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

ঋণ, মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি ভর্তুকিতে সতর্কতা

আইএমএফের আলোচনায় সরকারি ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা এবং ঋণের সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ঋণ পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় হলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে সরকারি বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

জ্বালানি ও খাদ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়াতে পারে। তাই সংকট মোকাবিলায় সরকারি সহায়তা দেওয়ার সময় দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিশেষ করে জ্বালানি ভর্তুকির ক্ষেত্রে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। ভর্তুকি দীর্ঘ সময় ধরে অব্যাহত থাকলে সরকারি অর্থের ওপর চাপ বাড়তে পারে। তবে একই সঙ্গে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে মূল্যবৃদ্ধির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষা দেওয়াও জরুরি। ফলে ভর্তুকি সংস্কারের ক্ষেত্রে আর্থিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জন্য রাজস্ব আহরণ বাড়ানোও বড় চ্যালেঞ্জ। রাজস্ব আয় বাড়াতে পারলে একদিকে সরকারি ঋণের চাপ সামলানো সহজ হবে, অন্যদিকে উন্নয়ন প্রকল্প ও জনসেবায় অর্থায়নের সক্ষমতা বাড়বে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি

বিজ্ঞাপন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিস্তার বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও আর্থিক নিরাপত্তার ঝুঁকিও তৈরি করছে। এআইয়ের মাধ্যমে অনেক কাজ কম সময়ে ও কম খরচে সম্পন্ন করা সম্ভব হলেও প্রচলিত কিছু পেশায় কর্মীর চাহিদা কমে যেতে পারে।

বিশেষ করে তরুণদের প্রবেশপর্যায়ের চাকরি এবং নিয়মিত কাজনির্ভর পেশাগুলো প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রভাবে রূপান্তরিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশের মতো তরুণ শ্রমশক্তিনির্ভর দেশের জন্য এ পরিস্থিতিতে কারিগরি শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা এবং নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ।

প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সাইবার হামলা, ডিজিটাল জালিয়াতি ও আর্থিক প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়ছে। এসব মোকাবিলায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তা জোরদার, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আলোচনায় উঠে এসেছে। ডিজিটাল প্রতারণা মোকাবিলায় ‘ব্যাংকক ব্লুপ্রিন্ট’ও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল।

বিজ্ঞাপন

কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিশ্বব্যাংকের পরিকল্পনা

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা উন্নয়ন অর্থায়নের নতুন পদ্ধতি এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১২০ কোটি তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করবেন। কিন্তু একই সময়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে প্রায় ৪০ কোটি। ফলে সম্ভাব্য কর্মসংস্থান ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ৮০ কোটি।

অজয় বাঙ্গা বলেন, “চাকরি কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি মানুষের মর্যাদা।”

বিজ্ঞাপন

তিনি সরকারি অর্থ, বেসরকারি বিনিয়োগ, দাতব্য সহায়তা ও প্রযুক্তিকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। যেসব খাতে বাজারভিত্তিক বিনিয়োগ এখনো পর্যাপ্ত নয়, সেখানে সরকারি ও স্বল্পসুদে অর্থায়ন কার্যকর হতে পারে। অন্যদিকে, বেসরকারি পুঁজি ব্যবহার করে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগ থাকলে তা কাজে লাগানো প্রয়োজন।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ অর্থবছরে তাদের উদ্যোগে বেসরকারি খাত থেকে উন্নয়ন অর্থায়ন সংগ্রহের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরে তা বেড়ে ১১২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। নিজস্ব অর্থায়নসহ বিশ্বব্যাংক গ্রুপের মোট অর্থায়ন ২৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। তবে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ এখনো কঠিন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

জ্বালানি, কৃষি, স্বাস্থ্য ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় বিনিয়োগ

বিজ্ঞাপন

কর্মসংস্থান বাড়াতে অবকাঠামো, জ্বালানি, কৃষি, স্বাস্থ্য, পর্যটন এবং মূল্য সংযোজনকারী উৎপাদন খাতকে গুরুত্ব দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ২০৩০ সালের মধ্যে আফ্রিকার ৩০ কোটি মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগে ইতিমধ্যে ৫ কোটি ৯০ লাখ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পেয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে এক বিলিয়ন মানুষের পানির নিরাপত্তা উন্নত করা, ৩০ কোটি ক্ষুদ্র কৃষককে উৎপাদন বাড়িয়ে উদ্বৃত্ত তৈরিতে সহায়তা এবং ১৫০ কোটি মানুষের জন্য মানসম্মত ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।

ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল তথ্যের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রম দৃশ্যমান করা, বড় ক্রেতাদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি এবং ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে দুর্বল ও সংঘাতপ্রবণ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ব্যবসা কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের জন্য যে বার্তা

ব্যাংককের বার্ষিক সভার আলোচনায় বাংলাদেশের জন্য মূল বার্তা হলো, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রাজস্ব আয় বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং ঋণের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। পাশাপাশি জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি মোকাবিলা, আর্থিক খাতে নিরাপত্তা জোরদার এবং প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের জন্য দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

সম্মেলনে উন্নয়ন অর্থায়ন ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরা হলেও এসব ঘোষণা থেকে কোনো নির্দিষ্ট দেশের জন্য নতুন ঋণ অনুমোদিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বাস্তব সুফল নির্ভর করবে দেশভিত্তিক নীতি সংস্কার, প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিনিয়োগের কার্যকারিতা এবং প্রতিশ্রুত অর্থায়ন যথাসময়ে পৌঁছানোর ওপর।

সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা দেখালেও ঋণের বোঝা, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির অস্থিরতা ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। বাংলাদেশের জন্য এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আর্থিক শৃঙ্খলা, লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগের সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD