বিপুল মূলধন জোগানের পরও বন্ধের মুখে জনতা ব্যাংকের ইউএই শাখা

সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) জনতা ব্যাংকের কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক। শাখাটির মূলধন ঘাটতি পূরণে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি পাঠানো এবং আরও ২ বিলিয়ন দিরহাম সমপরিমাণ মূলধন বাড়ানোর সরকারি প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এরই মধ্যে ব্যাংকটির ইউএই কার্যক্রম পরিচালনায় ‘ক্রোয়ে ইউএই’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (সিবিইউএই)।
বিজ্ঞাপন
এ পরিস্থিতিতে জনতা ব্যাংকের ইউএই শাখা বন্ধের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং সংকট সমাধানে জরুরি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত সোমবার ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মুহাম্মদ ফজলুর রহমান অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে চিঠি দিয়ে এ বৈঠকের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানিয়েছেন। বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং ইউএইতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
মূলধন বাড়িয়েও মিলছে না সমাধান
কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার নির্দেশনার বিষয়ে জানার পর জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অনুমোদন অনুযায়ী মূলধন ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে গত ৮ সেপ্টেম্বর ৩০ কোটি দিরহাম পাঠানো হয়। মার্কিন ডলারে এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৮ কোটি ১৬ লাখ ৮০ হাজার ডলার। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ১ হাজার কোটি টাকার বেশি।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া ইউএই শাখার মূলধন আরও বাড়াতে সরকারের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত অর্থ জোগানের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সচিব বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে সিবিইউএইর গভর্নরকে একটি দৃঢ় প্রতিশ্রুতিপত্র পাঠান। এতে জনতা ব্যাংকের ইউএই কার্যক্রমের মূলধন ২ বিলিয়ন দিরহাম বা সমপরিমাণ অর্থ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তবে এসব উদ্যোগের পরও শাখাটির কার্যক্রম বন্ধের প্রক্রিয়া থামেনি। গত ১ অক্টোবর সিবিইউএইর একটি চিঠির মাধ্যমে ‘ক্রোয়ে ইউএই’কে জনতা ব্যাংকের ইউএই কার্যক্রমের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ নিয়োগসংক্রান্ত চিঠির স্মারক নম্বর সিবিইউএই/বিআইএস/২০২৬/৫১৬৬।
প্রশাসক নিয়োগের খরচও জনতা ব্যাংককে বহন করতে হবে। বিষয়টি ইউএই কার্যক্রমের প্রধান নির্বাহীকে জানানো হলে তিনি ৭ অক্টোবর ঢাকায় পাঠানো চিঠিতে জানান, ক্রোয়ে ইউএই ৮ অক্টোবর থেকে কাজ শুরু করেছে।
৫২ বছরের কার্যক্রম রক্ষায় উদ্যোগ
বিজ্ঞাপন
জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ ফজলুর রহমান জানান, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী ব্যাংক হিসেবে জনতা ব্যাংক ১৯৭৪ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে কার্যক্রম শুরু করে। দীর্ঘ ৫২ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি সেখানে ব্যাংকিং সেবা দিয়ে আসছে।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইউএই কার্যক্রমের আওতায় প্রায় ১০ হাজার সক্রিয় আমানত হিসাবধারী, ৩ হাজার ৮০০ ঋণ ও অগ্রিম সুবিধাভোগী এবং প্রায় ১০ লাখ রেমিট্যান্স-সংশ্লিষ্ট স্বার্থ জড়িত।
চেয়ারম্যানের মতে, শাখাটির কার্যক্রম অব্যাহত রাখা শুধু ব্যাংকের স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ নয়; এর সঙ্গে গ্রাহক, প্রবাসী আয় প্রেরণকারী এবং বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্পর্কও জড়িত।
বিজ্ঞাপন
এ কারণে সংকট থেকে উত্তরণের উপায় নির্ধারণ, সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় এবং ব্যাংকিং সেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে জরুরি বৈঠকের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন তিনি। প্রস্তাবিত বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং জনতা ব্যাংকের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইউএইতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকেও বৈঠকে যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
শাখা বন্ধ না হওয়ার আশা সরকারের
এ বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিদেশি ব্যাংকের জন্য ন্যূনতম মূলধনের শর্ত বাড়ানোর পর জনতা ব্যাংকের শাখাটিতে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সরকার সেই ঘাটতি পূরণে অর্থ জোগানের উদ্যোগ নিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ওই কর্মকর্তা আশা প্রকাশ করেছেন, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের মাধ্যমে শাখাটির কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হবে এবং এটি বন্ধ করতে হবে না।
কেন সংকটে জনতা ব্যাংকের ইউএই কার্যক্রম?
২০২১ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশটিতে কার্যরত বিদেশি ব্যাংকের ন্যূনতম মূলধনের শর্ত ৪ কোটি দিরহাম থেকে বাড়িয়ে ৪০ কোটি দিরহাম করে। কিন্তু জনতা ব্যাংকের ইউএই শাখার পরিশোধিত মূলধন ছিল ১০ কোটি দিরহাম, যা সে সময় প্রায় ২ কোটি ৭২ লাখ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ।
বিজ্ঞাপন
লোকসানের কারণে প্রয়োজনীয় মূলধনের শর্ত পূরণ করতে পারেনি শাখাটি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৬ সালের ৮ জুলাই থেকে সিবিইউএই ব্যাংকটির রিজার্ভ হিসাব থেকে ডেবিট লেনদেনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এর এক সপ্তাহ পর, ১৫ জুলাই, প্রশাসক নিয়োগ এবং তিন বছরের মধ্যে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করলে রিজার্ভ হিসাব স্থায়ীভাবে জব্দ করা এবং কর্তৃপক্ষের নিজস্ব উদ্যোগে প্রশাসক নিয়োগের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে মূলধন জোগান ও সরকারি প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও প্রশাসক নিয়োগের কারণে সংকটের অবসান হয়নি।
প্রশাসকের দায়িত্বে ক্রোয়ে ইউএই
বিজ্ঞাপন
ক্রোয়ে ইউএই আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ক্রোয়ে গ্লোবালের সদস্য প্রতিষ্ঠান। ১৯৮১ সালে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিরীক্ষা, কর, পরামর্শ ও উপদেষ্টাসেবা দিয়ে থাকে।
আর্থিক সেবা, স্বাস্থ্যসেবা ও আবাসনসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের। দুবাই ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্সিয়াল সেন্টারের (ডিআইএফসি) নিয়ন্ত্রক কাঠামো সম্পর্কেও প্রতিষ্ঠানটির অভিজ্ঞতা রয়েছে। জালিয়াতির ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও পটভূমি যাচাই তাদের সেবার অন্তর্ভুক্ত।
সব মিলিয়ে, মূলধন ঘাটতি পূরণে বড় অঙ্কের অর্থ পাঠানো এবং সরকারের অতিরিক্ত অর্থ জোগানের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও জনতা ব্যাংকের ইউএই কার্যক্রম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। এখন জরুরি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শাখাটির কার্যক্রম রক্ষা করা সম্ভব হয় কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।








