Logo

নতুন বেতনকাঠামোয় জটিলতা, ১ নভেম্বর বাড়তি বেতন পাবেন না অনেকে

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১৫:৩৫
নতুন বেতনকাঠামোয় জটিলতা, ১ নভেম্বর বাড়তি বেতন পাবেন না অনেকে
ছবি: সংগৃহীত

নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে নানা জটিলতা দেখা দেওয়ায় আগামী ১ নভেম্বর অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বর্ধিত বেতন ও তিন মাসের বকেয়া অর্থ পাচ্ছেন না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বেতন পুনর্নির্ধারণের কাজ শেষ না হওয়ায় তাদের আপাতত পুরোনো কাঠামো অনুযায়ী বেতন দেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে বর্ধিত বেতন ও বকেয়া পরিশোধের কথা থাকলেও সমস্যাগুলোর সমাধান কবে হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

বিজ্ঞাপন

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী, ৮ লাখ পেনশনভোগী এবং ৬ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষকের বেতন নির্ধারণের কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। নতুন কাঠামো কার্যকর করতে গিয়ে গ্রেডের ক্রম, উচ্চতর গ্রেড, বাড়িভাড়া ভাতা এবং পদোন্নতির পর আর্থিক সুবিধা নির্ধারণে বিভিন্ন অসংগতি দেখা দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারের সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আইবাস++-এর কারিগরি ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা।

এসব সমস্যা সমাধানের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের কাছে আবেদন করেছেন। তবে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) পর্যন্ত এসব আবেদনের নিষ্পত্তি হয়নি।

অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি দপ্তরের সমস্যা ১ নভেম্বরের আগে সমাধান করা কঠিন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

অর্থ বিভাগের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নতুন বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন তৈরি ও বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা ও জানাশোনার ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। অসংগতিগুলো দূর করতে কাজ চলছে এবং এ বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, যারা তিন মাসের বকেয়াসহ বর্ধিত বেতন পাবেন, তাদের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধার অর্থ সমন্বয় করা হবে। ফলে বিশেষ সুবিধা হিসেবে আগে যে অর্থ পাওয়া যেত, তা সমন্বয়ের কারণে বকেয়া থেকে বাদ যেতে পারে। এতে অনেকের প্রত্যাশার তুলনায় বকেয়ার পরিমাণ কম হতে পারে।

বেতন নির্ধারণে গ্রেডের স্বাভাবিক ক্রম নিয়ে প্রশ্ন

বিজ্ঞাপন

জাতীয় বেতনকাঠামো ২০২৬ অনুযায়ী, ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২৫ হাজার টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ২৪ হাজার ৩০০ টাকা। অর্থাৎ শুরুতে ১১তম গ্রেডের কর্মচারীরা ১২তম গ্রেডের কর্মচারীদের তুলনায় ৭০০ টাকা বেশি মূল বেতন পাওয়ার কথা। কিন্তু নতুন কাঠামোয় বেতন পুনর্নির্ধারণের পর উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন কর্মচারীরা।

তাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালের বেতনকাঠামোয় ১১তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা। গত ৩০ জুন তার মূল বেতন বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৬৬০ টাকা। অর্থাৎ আগের কাঠামোয় মূল বেতন বৃদ্ধি পেয়েছিল ১১ হাজার ১৬০ টাকা। নতুন কাঠামোর প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে এই বৃদ্ধির পরিমাণ যোগ করলে দাঁড়ায় ৩৬ হাজার ১৬০ টাকা। কিন্তু নতুন কাঠামোয় ওই অঙ্কের বেতনধাপ না থাকায় পরবর্তী ধাপে তার মূল বেতন নির্ধারণ হচ্ছে ৩৭ হাজার টাকা।

অন্যদিকে, ১২তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর ২০১৫ সালের প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ১১ হাজার ৩০০ টাকা। গত ৩০ জুন তার মূল বেতন দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৫৮০ টাকা। আগের কাঠামোয় তার বেতন বেড়েছিল ১২ হাজার ২৮০ টাকা। নতুন কাঠামোর ২৪ হাজার ৩০০ টাকার সঙ্গে এই বৃদ্ধি যোগ করলে হয় ৩৬ হাজার ৫৮০ টাকা। পরবর্তী বেতনধাপ অনুযায়ী তার মূল বেতন নির্ধারণ হচ্ছে ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা।

বিজ্ঞাপন

ফলে ১১তম গ্রেডের কর্মচারীর মূল বেতন ৩৭ হাজার টাকা হলেও ১২তম গ্রেডের কর্মচারী পাচ্ছেন ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা। এতে তুলনামূলকভাবে উচ্চ গ্রেডে থাকা কর্মচারী ৭০০ টাকা কম মূল বেতন পাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

কর্মচারীদের হিসাব অনুযায়ী, পর্যায়ক্রমে নতুন কাঠামোর সুবিধা কার্যকর হলেও এই বৈষম্য পুরোপুরি দূর হচ্ছে না। তাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৫০ শতাংশ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন দাঁড়াবে ৩১ হাজার ২৩০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৩১ হাজার ৫৯০ টাকা। তখন ব্যবধান হবে ৩৬০ টাকা।

একইভাবে, ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ৭৫ শতাংশ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন হবে ৩৫ হাজার ১৫ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৩৫ হাজার ৫৯৫ টাকা। এতে ব্যবধান দাঁড়াবে ৫৮০ টাকা। আর ১ জুলাই ২০২৭ থেকে শতভাগ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের বেতন হবে ৪০ হাজার ৮০০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৪১ হাজার ৬০০ টাকা। তখন ব্যবধান বেড়ে দাঁড়াবে ৮০০ টাকা।

বিজ্ঞাপন

নতুন প্রজ্ঞাপনের ৫ ও ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে বেতন নির্ধারণ করে নতুন নির্ধারিত বেতন ও বর্তমান বেতনের পার্থক্যের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে ৫০, ৭৫ ও ১০০ শতাংশ সুবিধা কার্যকরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কর্মচারীদের অভিযোগ, এই পদ্ধতিতে গ্রেড অনুযায়ী বেতনের স্বাভাবিক ব্যবধান বজায় থাকছে না।

পদোন্নতির পরও কমতে পারে মোট আয়

নতুন বেতনকাঠামোয় বাড়িভাড়া ভাতার হার নিয়েও অসংগতির অভিযোগ উঠেছে। কর্মচারীদের দেওয়া একটি হিসাব অনুযায়ী, দশম গ্রেডের একজন কর্মকর্তা ১০ বছর চাকরি পূর্ণ করার পর নবম গ্রেডে পদোন্নতি বা প্রথম উচ্চতর গ্রেড পেলে তার মূল বেতন ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫১ হাজার টাকা হতে পারে। অর্থাৎ মূল বেতন বাড়বে ১ হাজার ৩০০ টাকা।

বিজ্ঞাপন

তবে গ্রেড পরিবর্তনের সঙ্গে বাড়িভাড়া ভাতার হার কমে গেলে মোট আয় কমার আশঙ্কা রয়েছে। দশম গ্রেডে ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা মূল বেতনের ওপর ৫০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা হয় ২৪ হাজার ৮৫০ টাকা। নবম গ্রেডে ৫১ হাজার টাকা মূল বেতনের ওপর ৪৫ শতাংশ হারে এই ভাতা দাঁড়ায় ২২ হাজার ৯৫০ টাকা।

ফলে মূল বেতন ১ হাজার ৩০০ টাকা বাড়লেও বাড়িভাড়া ভাতা কমছে ১ হাজার ৯০০ টাকা। দুই খাত মিলিয়ে মাসিক আয় ৬০০ টাকা কমে যেতে পারে। কর্মচারীদের আশঙ্কা, একই ধরনের সমস্যা অন্যান্য গ্রেডেও দেখা দিতে পারে।

উচ্চতর গ্রেড ও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে অসংগতি

বিজ্ঞাপন

উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা ও সময় নির্ধারণ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের অভিযোগ, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে যাদের চাকরির বয়স আট বছর পূর্ণ হয়েছে এবং যাদের ১০ বছর পূর্ণ হয়েছে, তারা উভয়েই ১ জুলাই থেকে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হতে পারেন।

এতে একই গ্রেডের জ্যেষ্ঠ ও জুনিয়র কর্মকর্তাদের মূল বেতন সমান হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বেতন নির্ধারণের ধাপের কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জুনিয়র কর্মকর্তার মূল বেতন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার চেয়েও বেশি হতে পারে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

কর্মচারীদের হিসাব অনুযায়ী, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়ের ব্যবধানও ভবিষ্যতে বেতনবৈষম্য বাড়াতে পারে। তাদের দাবি, দ্বিতীয়বার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো জুনিয়র কর্মকর্তার ১৪ বছর লাগলেও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ক্ষেত্রে সময় লাগতে পারে ১৬ বছর। তবে এসব হিসাবের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

বিজ্ঞাপন

আইবাস++ জটিলতায় আটকে বেতন পুনর্নির্ধারণ

নতুন বেতনকাঠামো কার্যকরের ক্ষেত্রে সরকারের সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আইবাস++-এর জটিলতাও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, বেতন পুনর্নির্ধারণের কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি। অভিজ্ঞ জনবলের ঘাটতি এবং নতুন কর্মকর্তাদের অনভিজ্ঞতার কারণে প্রক্রিয়াটি আরও জটিল হয়ে পড়েছে।

আইবাস++ ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারের বাজেট প্রণয়ন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ, বিল তৈরি, অর্থ পরিশোধ এবং সরকারি আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করা হয়। এই ব্যবস্থায় জটিলতা থাকায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সবার বেতন পুনর্নির্ধারণ শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

সব মিলিয়ে নতুন বেতনকাঠামোর বিভিন্ন অসংগতি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ১ নভেম্বর বর্ধিত বেতন পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান না হলে অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আরও কিছুদিন পুরোনো কাঠামো অনুযায়ী বেতন নিতে হতে পারে। তবে বর্ধিত বেতন ও বকেয়া অর্থ পরিশোধের নতুন সময়সূচি এখনো নিশ্চিত করা হয়নি।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD