শ্রমিক আন্দোলন থামলেও বিদেশি ক্রেতা হারানোর আশঙ্কায় মালিকরা

টানা কয়েক দিনের শ্রমিক আন্দোলন ও সংঘর্ষের পর নারায়ণগঞ্জের পোশাক কারখানাগুলোতে আবারও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ফিরতে শুরু করেছে। শ্রমিকরা কাজে যোগ দেওয়ায় উৎপাদন কার্যক্রম সচল হলেও আন্দোলনের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না শিল্প মালিকদের। কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তাজনিত কারণে বাতিল হয়েছে বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত পরিদর্শন। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
বিজ্ঞাপন
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি ও গ্যাস সংকট, বিদ্যুতের বাড়তি দাম, ব্যাংকিং ব্যয় এবং শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির চাপের মধ্যে নতুন করে অসন্তোষ তৈরি হওয়ায় পোশাক খাতের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। তবে সামনে নতুন করে কোনো অস্থিরতা না হলে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সহসভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে এবং কোথাও শ্রমিক অসন্তোষের খবর পাওয়া যায়নি। তবে আন্দোলনের কারণে কারখানাভেদে ক্ষতির পরিমাণ ভিন্ন হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, তার কারখানায় ইংল্যান্ডের একজন নতুন ক্রেতার পরিদর্শনে আসার কথা ছিল। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে তিনি হোটেল থেকেই কারখানায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। পরদিন আরও কয়েকজন বিদেশি ক্রেতার আসার কথা থাকলেও তাদের প্রধান কার্যালয় থেকে নিরাপদে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়। ফলে তারাও পরিদর্শনে আসেননি।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
মোর্শেদ সারোয়ার সোহেলের ভাষ্য, কোনো কারখানায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে তার প্রভাব শুধু ওই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, দেশের ভাবমূর্তির ওপরও পড়ে। বিদেশি ক্রেতারা এমন পরিস্থিতি সরাসরি প্রত্যক্ষ করলে বাংলাদেশের পোশাক খাত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব এখনই স্পষ্ট না হলেও দীর্ঘমেয়াদে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের দেশের ইমেজ নষ্ট হচ্ছে। ভবিষ্যতে ক্রেতারা বাংলাদেশকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচনা করবেন। কোনো দেশের ঝুঁকির মাত্রা যত বেশি হয়, সেই দেশে পণ্যের দাম তত কম দেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নারায়ণগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী জানান, অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করছে।
নারায়ণগঞ্জ ব্যাটালিয়নের (৬২ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মির্জা মোহাম্মদ আরাফাত বলেন, এলাকায় ৯ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অসন্তোষ মোকাবিলায় সদস্যরা সতর্ক রয়েছেন।
এর আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক আন্দোলন চললেও নারায়ণগঞ্জের পোশাক কারখানাগুলোতে তেমন উত্তেজনা দেখা যায়নি। তবে শেষ পর্যন্ত ফতুল্লা এলাকায় শ্রমিকদের আন্দোলন সংঘর্ষে রূপ নেয়।
বিজ্ঞাপন
গত ৩ নভেম্বর ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে শিবু মার্কেট এলাকায় বিক্ষোভ শুরু করেন শ্রমিকরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন। অবরোধের মধ্যে আটকে পড়া কয়েকটি যানবাহনও ভাঙচুর করা হয়। পরে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
পরদিন ৪ নভেম্বর ফতুল্লার শিবু মার্কেট ও কাঠেরপুল এলাকায় আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। শ্রমিকদের ইটপাটকেল নিক্ষেপের জবাবে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পরে কয়েক দফায় শ্রমিকরা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এসব ঘটনায় কয়েকজন শ্রমিক আহত হন।
শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলা আন্দোলনের পেছনে উসকানির অভিযোগও তুলেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একটি অংশ আন্দোলনে যুক্ত ছিল এবং শ্রমিকদের উত্তেজিত করতে ভূমিকা রেখেছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি এম এ শাহীন বলেন, শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবিতে তারা মজুরি বোর্ড গঠনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। ইতোমধ্যে বোর্ড গঠন হওয়ায় এখন তাদের ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। বোর্ড নির্ধারিত মজুরি শ্রমিকদের প্রত্যাশা পূরণ না করলে তখন আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পরপরই নতুন মজুরি ঘোষণা করা সম্ভব নয়। বিষয়টি শ্রমিকদের বোঝানোর চেষ্টা করা হলেও তারা নিজেদের মতো করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছেন। এ আন্দোলনের সঙ্গে তাদের সংগঠনের সম্পৃক্ততা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমানের অভিযোগ, একটি স্বার্থান্বেষী মহল শ্রমিকদের উসকানি দিয়েছে। পতিত সরকারের অনুসারীরা শ্রমিক সংগঠনের ভেতরে প্রবেশ করে আন্দোলনকে প্রভাবিত করেছে বলে তিনি দাবি করেন।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হবে। বিভিন্ন স্থানে ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে এবং ড্রোনের মাধ্যমেও ভিডিও ধারণ করা হয়েছে। এসব ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সাধারণ শ্রমিকদের পাশে থাকার এবং তাদের দাবির বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে বলেও জানান তিনি।








