প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর ও আমাদের প্রত্যাশা

বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো বিশ্ব শ্রমবাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস এবং অটোমেশন আগামী দশকে বহু স্বল্প দক্ষ চাকরি কমিয়ে দিতে পারে। নির্মাণ, উৎপাদন এবং সেবা খাতের অনেক কাজ প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে।
বিজ্ঞাপন
আজ যে কাজের জন্য হাজার হাজার শ্রমিক প্রয়োজন, কয়েক বছর পর হয়তো সেই কাজ কয়েক শ দক্ষ প্রযুক্তিবিদ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সম্পন্ন করা যাবে।একই সময়ে ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এবং নেপালের মতো দেশগুলো দক্ষ কর্মী তৈরিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে।
যদি বাংলাদেশ এখনো কেবল বিদেশে শ্রমিক পাঠিয়ে রেমিট্যান্স অর্জনের পুরোনো মডেলের ওপর নির্ভর করে, তাহলে ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত কমসংখ্যক কিন্তু অধিক দক্ষ কর্মী পাঠিয়ে বেশি আয় নিশ্চিত করা। এই বাস্তবতায় বেশিসংখ্যক কর্মী নয়, বরং বেশি বেশি দক্ষ কর্মী হওয়া উচিত বাংলাদেশের নতুন অভিবাসন-দর্শন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন মালয়েশিয়া সফর ঘিরে দেশে ও প্রবাসে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। দুই বছর ধরে স্থবির হয়ে থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ফের চালুর সম্ভাবনা, অনথিভুক্ত বাংলাদেশিদের বৈধকরণ, প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের বিভিন্ন দাবিদাওয়ার সমাধান এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের নতুন দিগন্ত-সব মিলিয়ে এই সফর নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞাপন
বিশেষত মালয়েশিয়ায় বসবাসরত লাখ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসীর কাছে এই সফর কেবল একটি কূটনৈতিক ঘটনা নয়;বরং এটি তাঁদের জীবিকা,নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সুতরাং অনেকেই আশা করছেন, দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত থাকা শ্রমবাজার, ভিসা জটিলতা, কনস্যুলার সেবার সীমাবদ্ধতা এবং অনথিভুক্ত কর্মীদের সমস্যার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হবে।
তবে প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি আবারও কেবল শ্রমবাজার খুলে যাওয়ার ঘোষণায় সন্তুষ্ট থাকবে, নাকি এবার অভিবাসন ব্যবস্থার গভীরে থাকা কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধানের সুযোগ হিসেবে এই সফরকে কাজে লাগাবে? মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো গল্প নয়। গত দুই দশকের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখিয়েছে যে বাজার খোলা এবং বাজার বন্ধ হওয়ার পুনরাবৃত্ত চক্রের মধ্যেই আমরা ঘুরপাক খাচ্ছি।
২০০৮ সালে বন্ধ, ২০১৬ সালে আবার চালু, ২০১৮ সালে আবার বন্ধ, ২০২২ সালে নতুনভাবে চালু এবং ২০২৪ সালে আবার স্থগিত-এই ইতিহাস একটি কঠিন সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে: সমস্যাটি বাজার খোলা বা বন্ধ হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সমস্যাটি আমাদের শ্রম অভিবাসন ব্যবস্থার ভেতরেই নিহিত। এ কারণেই এবারের সফরের সাফল্য কত হাজার নতুন কর্মী মালয়েশিয়ায় যাবে, সেই সংখ্যায় পরিমাপ করা উচিত নয়।
বিজ্ঞাপন
বরং প্রকৃত সাফল্য হবে যদি বাংলাদেশ একটি স্বচ্ছ, দক্ষ, মানবিক এবং দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসনকাঠামো প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রসর হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় নিঃসন্দেহে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার চালু করা। কিন্তু এই বাজার কীভাবে কোন মডেলে খুলবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের ইতিহাস আসলে সুযোগ এবং ব্যর্থতার মিশ্র গল্প।
১৯৭৮ সালে মাত্র কয়েকজন কর্মী পাঠানোর মধ্য দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা পরে লাখো মানুষের জীবিকা ও বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়। কিন্তু একই সঙ্গে এই বাজার বারবার বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। নিয়োগে অস্বচ্ছতা, সীমিতসংখ্যক এজেন্সির একচেটিয়া প্রভাব, কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, চুক্তিভঙ্গ, মানব পাচারের অভিযোগ এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা-এসব কারণে একাধিকবার মালয়েশিয়া শ্রমবাজার স্থগিত করেছে।
একই সমস্যা বারবার ফিরে আসে, কারণ আমরা সাধারণত শ্রমবাজার খুলে যাওয়াকেই সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করি, কিন্তু বাজার পরিচালনার কাঠামোগত সংস্কারকে গুরুত্ব দিই না। ফলে সমস্যার মূল কারণগুলো অমীমাংসিত থেকে যায়। এবারের সফরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত একটি সিন্ডিকেট মুক্ত,স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং জবাবদিহিমূলক অভিবাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে মালয়েশিয়ার সঙ্গে সমন্বিত কাঠামো তৈরি করা।
বিজ্ঞাপন
অতীতে বাজার বন্ধ হওয়ার পেছনে যেমন মালয়েশিয়ার নিজস্ব নীতিগত কারণ ছিল, তেমনি বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও অস্বচ্ছতা ও নিয়োগব্যবস্থার দুর্বলতা বড় ভূমিকা রেখেছে। তাই এবারের আলোচনায় বাংলাদেশের সবচেয়ে দৃঢ় অবস্থান হওয়া উচিত কোনো ধরনের একচেটিয়া নিয়োগব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়। শ্রমবাজারকে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক এবং জবাবদিহিমূলক করতে হবে।
বাংলাদেশের উচিত মালয়েশিয়ার সঙ্গে এমন একটি ডিজিটাল ও স্বচ্ছ নিয়োগ-কাঠামো নিয়ে আলোচনা করা, যেখানে কর্মী নির্বাচন, চাকরির চুক্তি, নিয়োগকর্তার তথ্য, ভিসা প্রক্রিয়া এবং খরচের বিবরণ অনলাইনে উন্মুক্ত ও যাচাইযোগ্য থাকবে। প্রত্যেক কর্মীর নিয়োগ ব্যয় প্রকাশ্যে আনতে হবে এবং সরকারি পর্যায়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কর্মী, নিয়োগকর্তা এবং সরকারের মধ্যে সরাসরি ডিজিটাল সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা কমাতে হবে। শুধু বিদেশে কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না, কর্মীদের আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরে একটি বড় অর্জন হতে পারে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া যৌথ দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি। যৌথ দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও দেওয়া যেতে পারে। মালয়েশিয়ার শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশে যৌথ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা গেলে কর্মীরা বিদেশে যাওয়ার আগেই নির্দিষ্ট চাকরির জন্য প্রস্তুত হতে পারবেন।
বিজ্ঞাপন
মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অনথিভুক্ত বাংলাদেশিদের বিষয়টি শুধু অভিবাসন নয়, মানবিক মর্যাদারও প্রশ্ন। বিষয়টি এই সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হওয়া উচিত। মালয়েশিয়ায় অনথিভুক্ত বাংলাদেশিদের বড় অংশ কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত নন। বরং নিয়োগকর্তার প্রতারণা, কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাওয়া, ভিসা নবায়নের জটিলতা কিংবা প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে তাঁরা বৈধ মর্যাদা হারিয়ে অনিয়মিত অবস্থায় পড়েছেন।
বাংলাদেশের উচিত মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে একটি বিশেষ নিয়মিতকরণ বা বৈধকরণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করা, যাতে কর্মীরা জরিমানা বা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণের মাধ্যমে বৈধ অবস্থায় ফিরে আসতে পারেন। এটি শুধু মানবিক পদক্ষেপ নয়; মালয়েশিয়ার অর্থনীতির জন্যও লাভজনক হবে। কারণ, এই কর্মীদের অনেকেই দেশটির উৎপাদন ও সেবা খাতে ইতিমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে নতুন করে অনথিভুক্ত কর্মী সৃষ্টি না হয়, সে জন্য কর্মীদের কর্মস্থল পরিবর্তন, নিয়োগকর্তা বদল এবং ভিসা নবায়নের প্রক্রিয়া আরও নমনীয় করার বিষয়েও আলোচনা প্রয়োজন। মালয়েশিয়ায় লাখ লাখ বাংলাদেশি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বিভিন্ন প্রদেশে কাজ করেন।
কিন্তু বেশির ভাগ কনস্যুলার সেবা পেতে তাঁদের কুয়ালালামপুরে যেতে হয়। এতে সময়, অর্থ এবং শ্রম-সবকিছুর অপচয় হয়। বিভিন্ন প্রত্যন্ত প্রদেশে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিদের জন্য কনস্যুলার সেবা পাওয়া এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সাবা, সারাওয়াক, পেনাং কিংবা জহুর থেকে কুয়ালালামপুরে এসে পাসপোর্ট নবায়ন বা অন্যান্য সেবা নেওয়া সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।
বিজ্ঞাপন
প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় আঞ্চলিক কনস্যুলার সেবাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, মোবাইল কনস্যুলার সেবা এবং পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সেবা চালুর বিষয়গুলো গুরুত্ব পাওয়া উচিত। সবশেষে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার চালু হওয়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু বাংলাদেশের জন্য তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন একটি অভিবাসনকাঠামো গড়ে তোলা, যা বারবার সংকটে পড়বে না। এমন একটি নতুন অভিবাসন-দর্শন গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে প্রবাসী শ্রমিককে কেবল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং দেশের মানবসম্পদ, অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফর বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন দরজা খুলে দিতে পারে। কিন্তু সেই দরজা দিয়ে ভবিষ্যতের দিকে কত দূর এগোনো যাবে, তা নির্ভর করবে আমরা অতীতের ভুল থেকে কতটা শিক্ষা নিতে পারি তার ওপর।
বিজ্ঞাপন
লেখক : রায়হান আহমেদ তপাদার
গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য।








