Logo

লোডশেডিং: বিদ্যুৎ সংকট, নাকি পরিকল্পনার সংকট?

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১১ আগস্ট, ২০২৬, ১৫:৩৭
লোডশেডিং: বিদ্যুৎ সংকট, নাকি পরিকল্পনার সংকট?
ফাইল ছবি।

গরম এলেই বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে—এটি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য কোনো নতুন বাস্তবতা নয়। গ্রীষ্মে তাপমাত্রা বাড়ে, ফ্যান-এসি-ফ্রিজসহ বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ে, ফলে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ে। কিন্তু প্রতি বছর একই সময়ে যদি মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়, তাহলে এটিকে কি কেবল ‘বিদ্যুৎ সংকট’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায়?

বিজ্ঞাপন

প্রশ্নটি বরং আরও গভীর: আমাদের কি বিদ্যুতের সংকট, নাকি পরিকল্পনার সংকট?

সাম্প্রতিক দিনের পরিস্থিতি সেই প্রশ্নটিকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নির্দিষ্ট সময়সূচি ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ১২ ঘণ্টা, আবার কোথাও দিন-রাত মিলিয়ে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ করেছেন গ্রাহকেরা। সরকারি তথ্যেও সাম্প্রতিক সময়ে একাধিকবার ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিংয়ের চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের নতুন রেকর্ড।

কিন্তু লোডশেডিংয়ের হিসাব শুধু মেগাওয়াটে হয় না। এর আসল হিসাব হয় মানুষের দুর্ভোগে, উৎপাদন বন্ধ হওয়ার ঘটনায়, নষ্ট হয়ে যাওয়া পণ্যে এবং হারিয়ে যাওয়া আয়ে।

বিজ্ঞাপন

রাজশাহীর গ্রামাঞ্চলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়েছেন। রংপুরে হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সেবা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কুড়িগ্রাম ও সুনামগঞ্জে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাভাবিক জীবন ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে।

যশোরের অভয়নগরে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় তীব্র গরমের মধ্যে একটি পোলট্রি খামারে চার শতাধিক মুরগি মারা যাওয়ার ঘটনাটি এ সংকটের ভয়াবহতার একটি বাস্তব উদাহরণ। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় বিদ্যুৎ সংকটে বরফ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় জেলেদের মাছ সংরক্ষণেও সমস্যা হচ্ছে। একটি পরিবারের ফ্যান বন্ধ থাকা যেমন ভোগান্তি, তেমনি একজন খামারির শত শত মুরগি মারা যাওয়া বা একজন জেলের মাছ সংরক্ষণ করতে না পারা সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতি।

অর্থাৎ বিদ্যুৎহীনতার প্রতিটি ঘণ্টার একটি অর্থনৈতিক মূল্য আছে—যে মূল্য বিদ্যুৎ বিভাগের লোডশেডিংয়ের তালিকায় ধরা পড়ে না।

বিজ্ঞাপন

সক্ষমতা আছে, বিদ্যুৎ নেই কেন?

বিদ্যুৎ সংকটের তাৎক্ষণিক কারণগুলো অবশ্যই বাস্তব। বিদ্যুৎ খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া সংকটের অন্যতম কারণ। পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এর সঙ্গে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটের যান্ত্রিক ত্রুটি এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে।

কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

একটি দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা কি এমন হওয়া উচিত, যেখানে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা কমলেই কয়েক হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হবে? একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বিকল হলে তার বিকল্প ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত থাকবে? আর বিদ্যুৎ আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়লে সরবরাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় আমাদের পরিকল্পনা কতটা কার্যকর?

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের সময় চাহিদা ছিল প্রায় ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট। অথচ তখন সরবরাহ হয়েছে সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াটের মতো। অর্থাৎ কাগজে-কলমে উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনের সময় সেই সক্ষমতার বড় অংশ কাজে লাগানো যায়নি।

এখানেই বোঝা যায়, সমস্যাটি কেবল ‘বিদ্যুৎ উৎপাদন কম’—এত সরল নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জ্বালানি সরবরাহ, অর্থায়ন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা এবং সর্বোপরি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা।

বিজ্ঞাপন

বিদ্যুৎ খাতে তাই শুধু এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়—‘আমরা কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারি?’

আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—‘প্রয়োজনের সময় আমরা কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে সেই বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারি?’

দাম বাড়ল, নির্ভরযোগ্যতা বাড়ল কি?

বিজ্ঞাপন

সংকটের মধ্যে আরও একটি বিষয় সাধারণ মানুষের প্রশ্নের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ার পরও যদি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন না হয়, তাহলে গ্রাহক বাড়তি মূল্য দিয়ে আসলে কী পাচ্ছেন?

জুনেই পাইকারি পর্যায়ে গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। অর্থাৎ গ্রাহকের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এর বিনিময়ে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হয়নি। বরং সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিং আরও বেড়েছে।

অবশ্য বিদ্যুতের বিল শুধু বিদ্যুৎ থাকার সময়ের ওপর নির্ভর করে না; ব্যবহৃত ইউনিট, ইউনিটপ্রতি মূল্য এবং প্রযোজ্য বিভিন্ন চার্জের ভিত্তিতেই বিল নির্ধারিত হয়। তারপরও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না পাওয়ার পরও বিলের অঙ্ক নিয়ে গ্রাহকের প্রশ্ন উঠলে সেটিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো বিষয়টি পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা এবং গ্রাহকের আস্থা নিশ্চিত করা।

বিজ্ঞাপন

কারণ বিদ্যুৎ শুধু একটি পণ্য নয়; আধুনিক জীবনে এটি একটি অপরিহার্য সেবা।

সংকটের ভার কি সবাই সমানভাবে বহন করছে?

লোডশেডিংয়ের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো এর অসম বণ্টন। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে দেশের গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।

বিজ্ঞাপন

ঢাকার দুই বিতরণ সংস্থার তুলনায় ঢাকার বাইরের গ্রামীণ এলাকাগুলোতে ঘাটতি অনেক বেশি। নেত্রকোনায় ১৫৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে কোনো কোনো সময় সরবরাহ নেমে এসেছে মাত্র ৫৯ মেগাওয়াটে। নীলফামারীর ডোমারেও প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ফলে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে—বিদ্যুৎ সংকটের ভার কি সমানভাবে ভাগ হচ্ছে?

শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে সরবরাহ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রেখে গ্রামের মানুষকে যদি দীর্ঘ সময় অন্ধকারে থাকতে হয়, তাহলে এটি শুধু বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার বিষয় থাকে না; এটি সেবার ন্যায্য বণ্টনের প্রশ্নও হয়ে দাঁড়ায়।

বিজ্ঞাপন

একজন কৃষক জানেন না কখন সেচের পাম্প চালাবেন। একজন ব্যবসায়ী জানেন না কখন দোকানের মেশিন চালু করবেন। একজন শিক্ষার্থী জানে না কখন পড়ার টেবিলে আলো জ্বলবে। আর হাসপাতালের ক্ষেত্রে অনিশ্চিত বিদ্যুৎ সরবরাহের ঝুঁকি তো আরও গুরুতর।

অন্ধকারের চেয়েও বড় সমস্যা অনিশ্চয়তা

লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি অনেকাংশে কমানো সম্ভব, যদি মানুষ আগে থেকে জানতে পারে কখন বিদ্যুৎ থাকবে না। নির্দিষ্ট সময়সূচি থাকলে কৃষক সেচের পরিকল্পনা করতে পারেন, ব্যবসায়ী কাজের সময় ঠিক করতে পারেন, শিক্ষার্থী পড়াশোনার রুটিন সাজাতে পারে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই বারবার বিদ্যুৎ চলে গেলে সমস্যাটি কেবল বিদ্যুৎ না থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তৈরি হয় অনিশ্চয়তা।

তাই লোডশেডিং যদি সাময়িকভাবে এড়ানো সম্ভব না-ও হয়, অন্তত এর ব্যবস্থাপনা হতে পারে আরও মানবিক, স্বচ্ছ ও পরিকল্পিত। কোন এলাকায় কতক্ষণ বিদ্যুৎ থাকবে না, কেন থাকবে না এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগতে পারে—এসব তথ্য মানুষকে জানানো জরুরি।

সমাধান কি শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র?

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানও তাই শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিকল বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত মেরামত করা, জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে এমন পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে প্রতিবছর গরম এলেই বিদ্যুৎ সংকট নতুন করে জাতীয় দুর্ভোগে পরিণত না হয়।

বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনায় তাই ‘সর্বোচ্চ সক্ষমতা’ নয়, ‘নির্ভরযোগ্য সক্ষমতা’কে গুরুত্ব দিতে হবে। কাগজে ২৯ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা থাকলেই হবে না; প্রয়োজনের মুহূর্তে কত মেগাওয়াট নির্ভরযোগ্যভাবে উৎপাদন ও সরবরাহ করা যাচ্ছে, সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি।

কারণ একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা যায়, কিন্তু একটি নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎব্যবস্থা গড়ে তুলতে লাগে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সঠিক বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, দক্ষ রক্ষণাবেক্ষণ এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা।

বিদ্যুৎ এখন আর শুধু আলো, ফ্যান বা টেলিভিশন চালানোর বিষয় নয়। একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা, একজন রোগীর চিকিৎসা, একজন কৃষকের সেচ, একজন জেলের মাছ সংরক্ষণ এবং একজন ব্যবসায়ীর উৎপাদন—সবকিছুর সঙ্গে বিদ্যুৎ সরাসরি জড়িত।

তাই প্রশ্নটা শুধু ‘বিদ্যুৎ কখন আসবে?’—এখানে থামিয়ে রাখলে চলবে না।

প্রশ্ন হওয়া উচিত—প্রতি বছর গরম এলেই কেন আমাদের আবার একই সংকটের মুখোমুখি হতে হয়?

লোডশেডিংয়ের অন্ধকার হয়তো কয়েক ঘণ্টার জন্য। কিন্তু একটি অনিশ্চিত বিদ্যুৎব্যবস্থার অন্ধকার মানুষের জীবন, জীবিকা ও অর্থনীতিতে তার চেয়ে অনেক দীর্ঘ ছায়া ফেলতে পারে।

সুতরাং এবারের সংকটকে আরেকটি সাময়িক দুর্ভোগ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে দেখতে হবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনা নতুন করে মূল্যায়নের একটি সতর্কবার্তা হিসেবে।

কারণ বিদ্যুৎ সংকটের অন্ধকার যতটা না ভয়ংকর, তার চেয়েও ভয়ংকর হলো—একই অন্ধকার যদি প্রতি বছর ফিরে আসে।

লেখক: ফারহানা মীম

শিক্ষার্থী,

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD