Logo

রথদ্বিতীয়া সনাতন ধর্মের অন্যতম উৎসব

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১৬ জুলাই, ২০২৬, ২১:১৩
রথদ্বিতীয়া সনাতন ধর্মের অন্যতম উৎসব
নটো কিশোর আদিত্য : লেখক ও সাংবাদিক

রথযাত্রা দুটি সংস্কৃত শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়েছে, ‘রথ” শব্দের আভিধানিক অর্থ অক্ষ, যুদ্ধযান বা কোনো প্রকার যানবাহন অথবা চাকাযুক্ত ঘোড়ায় টানা হালকা যাত্রীবাহী গাড়ি। এবং যাত্রা হলো কোথাও গমন, অতিবাহন বা তীর্থযাত্র।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে জগন্নাথ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ‘জগৎ’ বা ’বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রভু’। জগন্নথি’ কথাটি তৎপুরুষ সমাস। এটি “জগৎ” ও “নাথ” শব্দের সংমিশ্রণ গঠিত। যেমন “জগৎ” (যার মূল ধাতু “গম্”, অর্থাৎ “যা কিছু চলে”) এবং (“নাথ” অর্থাৎ, প্রভু বা আশ্রয়) শব্দটির সংমিশ্রণে গঠিত। সুতরাং “জগন্নাথ” অর্থ “যিনি এই বিশ্বব্রহ্মান্ডের আশ্রয় চলমান জগতের আশ্রয়দাতা অর্থাৎ প্রভু”।

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের ভাবাদর্শে, মানুষের এই মানবজীবন নিজেই একটি রথ। এই রথের প্রকৃত চালক বা সারথি হলেন আমাদের আদর্শ বা ইষ্ট। রথযাত্রার প্রকৃত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত—ইষ্ট বা গুরুর নির্দেশিত পথে জীবনের রথকে সঠিকভাবে চালিত করা, যা মানুষকে পরম কল্যাণের দিকে নিয়ে যায়। তিনি মনে করতেন, যে কোনো ধর্মীয় উৎসব বা আচার-অনুষ্ঠানের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানব চরিত্রের গঠন ও আত্মিক উন্নতি।

শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন, ”যিনি আমাদের জীবনের রক্ষক, পালনকর্তা, পরিচালক বা জীবন্ত ইষ্টগুরু, তিনিই মূলত 'জগন্নাথ'।” আমরা যখন জাগতিক অহংকার ও অন্ধবিশ্বাসে প্রকৃত জীবন্ত পুরুষ বা গুরুকে বুঝতে না পেরে কেবল বাহ্যিক উৎসব বা আচার-অনুষ্ঠানে মত্ত থাকি, তখন সেই উৎসব সার্থকতা হারায়।

বিজ্ঞাপন

আর শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাষায় মুল লক্ষ, “তুমি যদি সৎ হও, তোমার দেখাদেখি হাজার হাজার লোক সৎ হয়ে পড়বে।" এর মূল অর্থ হলো— নিজের ভালো কাজের বা সততার প্রভাব চারপাশের সবার উপর পড়ে। নিজে আদর্শবান হলে, অন্যরাও তা দেখে অনুপ্রাণিত হয় এবং সমাজ নিজে থেকেই সুন্দর হয়ে ওঠে। রথযাত্রা আমাদের নিজেদের জীবনকে সুন্দর ও সৎ পথে পরিচালিত করার এক অসাধারণ অনুপ্রেরণা।

রথযাত্রা বা রথদ্বিতীয়া প্রতিবছর আষাঢ় মাসে ধুমধাম করে অনুষ্ঠিত হওয়া সনাতনীদের অন্যতম একটি উৎসব। এই রথযাত্রা উৎসব সবথেকে জনপ্রিয় উড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশে। তবে রথযাত্রা কথা বললেই মনে পরে পুরীর রথ।

জানা যায় রথযাত্রার শুরু সত্যযুগে। পুরীর এই রথযাত্রার (স্থানীয় ভাষায় পাহাণ্ডি নামে পরিচিত) উৎপত্তির পেছনে একটি পৌরাণিক ইতিহাস আছে।

বিজ্ঞাপন

কথিত আছে আষাঢ় মাসের শুক্ল দ্বিতীয়ায় বলরাম ও বোন সুভদ্রার সঙ্গে মাসির বাড়ি যান জগন্নাথ। মাসির বাড়ি অর্থাৎ ইন্দ্রদ্যুম্নের পত্নী গুন্ডিচার বাড়ী। সেখান থেকে আবার সাতদিন পর মন্দিরে ফিরে আসেন জগন্নআত। এটাকেই জগন্নাথ দেবের মাসির বাড়ি যাওয়া বলে৷ পরপর তিনটি সুসজ্জিত রথে চেপে মাসির বাড়ির উদ্দেশ্যে যান জগন্নাথ। এই যাওয়াকে সোজা রথ আর ফিরে আসাকে উল্টো রথ বলে।

জগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রার তিনটি রথ প্রতি বছর নির্দিষ্ট গাছের কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয় যেমন ফাসি, ধৌসা ইত্যাদি। এগুলি প্রথাগতভাবে দাসপল্লার প্রাক্তন রাজ্য রাজ্য থেকে ছুতারদের একটি বিশেষজ্ঞ দল দ্বারা আনা হয় যাদের বংশগত অধিকার এবং সুবিধা রয়েছে। একই কারণে. কাঠগুলি ঐতিহ্যগতভাবে মহানদীতে ভেলা হিসাবে ভেসে থাকে। এগুলো পুরীর কাছে সংগ্রহ করা হয় এবং তারপর সড়কপথে পরিবহন করা হয়।

তিনটি রথ নির্ধারিত অনন্য স্কিম অনুসারে সজ্জিত এবং শতাব্দী ধরে অনুসরণ করা বড় ডান্ডা, গ্র্যান্ড অ্যাভিনিউতে দাঁড়িয়ে আছে। রথগুলি তার পূর্ব প্রবেশদ্বারের কাছে মন্দিরের সামনে প্রশস্ত পথ জুড়ে সারিবদ্ধ, যা সিংহদ্বার বা সিংহদ্বার নামেও পরিচিত।

বিজ্ঞাপন

প্রতিটি রথের চারপাশে নয়টি পার্ব দেবতা, আঁকা কাঠের মূর্তি রথের পাশে বিভিন্ন দেবদেবীর প্রতিনিধিত্ব করে। প্রতিটি রথে একটি সারথি (সারথি) এবং চারটি ঘোড়া থাকে।

রথযাত্রার ইতিহাস। ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ (মহাপুরাণ) অনুযায়ী, কৃষ্ঞ তাঁর ভক্ত রাজা ইন্দ্রদ্যন্মুর সম্মুখে আবিভূর্ত হয়ে পুরীর সমুদ্রতটে ভেসে আসা একটি কাষ্ঠখণ্ড দিয়ে তাঁর মূর্তি নির্মাণের আদেশ দেন। মূর্তিনির্মাণের জন্য রাজা একজন উপযুক্ত কাষ্ঠশিল্পীর সন্ধান করতে থাকেন। তখন এক রহস্যময় বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ কাষ্ঠশিল্পী তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হন এবং মূর্তি নির্মাণের জন্য কয়েকদিন সময় চেয়ে নেন। সেই কাষ্ঠশিল্পী রাজাকে জানিয়ে দেন মূর্তি নির্মাণকালে কেউ যেন তাঁর কাজে বাধা না দেন। বন্ধ দরজার আড়ালে শুরু হয় কাজ। রাজা ও রানি সহ সকলেই নির্মাণকাজের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ওঠেন। প্রতিদিন তাঁরা বন্ধ দরজার কাছে যেতেন এবং শুনতে পেতেন ভিতর থেকে খোদাইয়ের আওয়াজ ভেসে আসছে। ৬-৭ দিন বাদে যখন রাজা বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন এমন সময় আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়। অত্যুৎসাহী রানি কৌতুহল সংবরণ করতে না পেরে দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করেন। দেখেন মূর্তি তখনও অর্ধসমাপ্ত এবং কাষ্ঠশিল্পী অন্তর্ধিত। এই রহস্যময় কাষ্ঠশিল্পী ছিলেন দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা। মূর্তির হস্তপদ নির্মিত হয়নি বলে রাজা বিমর্ষ হয়ে পড়েন। কাজে বাধাদানের জন্য অনুতাপ করতে থাকেন। তখন দেবর্ষি নারদ তাঁর সম্মুখে আবির্ভূত হন। নারদ রাজাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন এই অর্ধসমাপ্ত মূর্তি পরমেশ্বরের এক স্বীকৃত স্বরূপ ও এই অসম্পূর্ণ রুপেই পূজা শুরু করতে বলেন। অসম্পূর্ণ রূপে অস্টেলিয়রে ব্রিসবেন শহরে জগন্নাথ, বলরাম, ও সুভদ্রা রথযাত্রা প্রচলন।

এছাড়া ইসকন ব্যাপক প্রচারের জন্য এখন এটি বিশ্বব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর কৃষ্ঞের বৃন্দাবন প্রত্যাবর্তনের স্মরণে এই উৎসব আয়োজিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশের ইসকনের রথ ও ধামরাই জগন্নাথ রথ বিশেষ প্রসিদ্ধ।

বিজ্ঞাপন

রথযাত্রা উপলক্ষে বিভিন্ন স্থানে মেলার আয়োজন করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে রথযাত্রার সময় যাত্রাপালা মঞ্চস্থের রীতি বেশ জনপ্রিয়। শ্রীরামকৃষ্ঞ পরমহংদেব তাঁর স্ত্রী মা সারদা দেবী, নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ, সাহিত্য সম্রাট বন্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়-সহ প্রমুখ ব্যক্তিরা রথের বিখ্যাত মেলা পরিদর্শনে আসতেন।

আন্তর্জাতিক কৃষ্ঞ ভাবামৃত সংঘের মাধ্যমে ১৯৬৮ সাল থেকে বিশ্বের বেশিরভাগ প্রধান শহরে রথযাত্রা উৎসব একটি সাধারণ দৃশ্য হয়ে উঠেছে ।

ধামরাই জগন্নাথ রথ বাংলাদেশের ধামরাইতে অবস্থিত হিন্দু দেবতা জগন্নাথকে উৎসর্গ করা হয়েছে। বার্ষিক জগন্নাথ রথযাত্রা একটি বিখ্যাত হিন্দু উৎসব যা হাজার হাজার মানুষকে আকর্ষণ করে। ধামরাইয়ের রথযাত্রা বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব।

বিজ্ঞাপন

লেখাটির মূল উৎস: উইকিপিডিয়া।

নটো কিশোর আদিত্য : লেখক ও সাংবাদিক

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD