Logo

অর্থহীনতার ভিড়ে জীবনের অর্থ অনুসন্ধান

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১৩ জুলাই, ২০২৬, ১৩:১৬
অর্থহীনতার ভিড়ে জীবনের অর্থ অনুসন্ধান
ফাইল ছবি।

অস্তিত্বের উষালগ্ন থেকেই মানুষ এক অদৃশ্য আশার তাড়নায় প্রবহমান। আপনি কেন পড়াশোনা করছেন? নিশ্চয়ই ভালো ফলাফল অর্জনের মাধ্যমে একটি সম্মানজনক ক্যারিয়ার গড়ার প্রত্যয়ে। হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে অর্থ উপার্জন করছেন বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে নিষ্কণ্টক ও সুন্দর করার তাগিদে।

বিজ্ঞাপন

আমরা নামাজ পড়ি কিংবা পূজা করি—পরকালে জান্নাত বা স্বর্গ নিশ্চিত করার পরম আশায়; আবার কাউকে ভালোবাসি তার হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন পাওয়ার প্রবল প্রত্যাশায়। সন্তানকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার পেছনেও বপিত থাকে এক সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন। আমাদের প্রতিটি কর্মযজ্ঞের নেপথ্যেই লুকিয়ে থাকে কোনো না কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য, এক কাঙ্ক্ষিত ফলাফলের তৃষ্ণা। ​কিন্তু হঠাৎ যদি কেউ আপনাকে বলে—এই নিরন্তর পরিশ্রম, এত বিপুল ত্যাগ, এর সবই আসলে অর্থহীন! ভালো ফলাফল করলেই যে কাঙ্ক্ষিত চাকরি মিলবে, তার কোনো সুনিশ্চয়তা নেই। কর্মক্ষেত্রে সেরা নৈপুণ্য দেখিয়েও পদোন্নতি না-ও জুটতে পারে। সারাজীবনের সঞ্চিত অর্থ মুহূর্তেই হারিয়ে যেতে পারে ব্যাংক ডাকাতি বা দেউলিয়া হওয়ার আকস্মিক কবলে পড়ে। যুক্তির এই নির্মম বিশ্লেষণ যখন মানুষের আশার মূলভিত্তিকে প্রকম্পিত করে, তখন তা তাকে ঠেলে দেয় এক অতল অন্ধকারের দিকে; দর্শনশাস্ত্রের ভাষায় যার নাম ‘নিহিলিজম’ বা শূন্যবাদ।

​‘নিহিলিজম’ (Nihilism) শব্দটি মূলত লাতিন শব্দ ‘নিহিল’ (Nihil) থেকে উদ্ভূত, যার আক্ষরিক অর্থ ‘কিছুই না’ বা ‘শূন্য’। দর্শনশাস্ত্রে এটি এমন এক মতবাদ, যা প্রচার করে—জীবনের কোনো পূর্বনির্ধারিত অর্থ, গুরুত্ব বা শাশ্বত উদ্দেশ্য নেই। এই মতবাদ অনুযায়ী—নৈতিকতা, মূল্যবোধ, জ্ঞান, বিবেক এবং সমাজসৃষ্ট যাবতীয় নিয়মকানুন মূলত বিমূর্ত ও অকার্যকর। যাঁরা এই দর্শনে বিশ্বাস স্থাপন করেন, তাঁদের ‘নিহিলিস্ট’ বা শূন্যবাদী বলা হয়। আধুনিক সভ্যতায় এই ধারণাটি এখন আর কেবল তাত্ত্বিক বিতর্কের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা এক গভীর সাংস্কৃতিক সংকটের রূপ পরিগ্রহ করেছে। বিশেষ করে মানুষ যখন নৈতিক দ্বন্দ্ব ও অস্তিত্বগত সংকটের মুখোমুখি হয়, তখন সমাজে নিহিলিজমের প্রভাব প্রকট হয়ে ওঠে। এটি কেবল নৈরাশ্যেরই চাষাবাদ করে না, বরং অনেকের কাছে চরম ধ্বংসবাদ হিসেবেও আবির্ভূত হয়। মানুষ যখন ভাবতে শুরু করে যে মহাবিশ্বের এই অনন্ত বিস্তৃতির বুকে তার অস্তিত্বের কোনো স্বকীয় বা মহাজাগতিক মূল্য নেই, তখন সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও জীবনের প্রতি চরম বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে।

​দার্শনিক এই শূন্যবাদ বা নিহিলিজম বাস্তবে কতটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে, তার এক উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিসংখ্যানে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে ১০০ কোটিরও (এক বিলিয়ন) বেশি মানুষ নানা ধরনের মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছেন। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এর পেছনের অন্যতম প্রধান কারণ জীবনের এই ‘অর্থহীনতা’ বা অস্তিত্বগত শূন্যতাবোধ। অন্যদিকে, গ্যালাপের (Gallup) এক চাঞ্চল্যকর জরিপে দেখা গেছে, ‘জেন-জি’ (Gen-Z) প্রজন্মের প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষই অনুভব করেন যে তাঁদের জীবনে সুনির্দিষ্ট কোনো অর্থ বা উদ্দেশ্য নেই। এছাড়া গ্যালাপের ‘স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ওয়ার্কপ্লেস’ রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে মাত্র ২০ শতাংশ কর্মী তাঁদের পেশাগত কাজে মানসিকভাবে নিবেদিত ; যার ফলশ্রুতিতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রতি বছর প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে। এই পরিসংখ্যানগুলো নিছক কিছু গাণিতিক সংখ্যা নয়, বরং এগুলো নিহিলিজমের রূঢ় বাস্তবতারই অকাট্য প্রতিফলন। মানুষের অবচেতনে ‘কেন বাঁচব’—এই প্রশ্নের জবাবে যখন ‘বেঁচে থাকার কোনো মানে নেই’ উত্তরটি প্রতিধ্বনিত হয়, তখন সমাজের প্রতিটি স্তরেই এর এক মারাত্মক ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

বিজ্ঞাপন

​মনস্তাত্ত্বিক ও অস্তিত্বগত দৃষ্টিকোণ থেকে নিহিলিজমের এই প্রভাব আরও গভীর ও প্রাণঘাতী। গবেষণায় দেখা যায়, অস্তিত্বগত নিহিলিজম সরাসরি আত্মহত্যার প্রবণতাকে উসকে দেয়, যা কেবল সাধারণ বিষণ্নতার ক্লিনিক্যাল লক্ষণগুলোর ওপর নির্ভরশীল নয়। অর্থাৎ, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একজন মানুষ ‘ক্লিনিক্যালি ডিপ্রেসড’ না হয়েও, তিনি যদি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন যে জীবনের কোনো অর্থ নেই, তবে তিনি অনায়াসেই আত্মধ্বংসের পথে ধাবিত হতে পারেন। অনেক গবেষক নিহিলিজমকে এমন এক অদৃশ্য বিষের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা মানুষের ভেতর থেকে জীবনের ‘উদ্দেশ্য’ থাকার স্বতঃস্ফূর্ত অনুভূতিকেই ধীরে ধীরে মেরে ফেলে। বিষণ্নতা কাটাতে যেমন আবেগীয় নিরাময়ের প্রয়োজন হয়, ঠিক তেমনি নিহিলিজমের গ্রাস থেকে মুক্তির জন্য জীবনের নতুন উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া বা স্বীয় উদ্যোগে তা তৈরি করা অপরিহার্য। মানুষ যখন শুষ্ক যুক্তির অতি-প্রলেপে নিজের আবেগ, ভালোবাসা ও স্বপ্নগুলোকে বিসর্জন দেয়, তখন সে মূলত এক যান্ত্রিক অস্তিত্বে পরিণত হয়। আর এই যান্ত্রিকতাই মানুষকে তার মৌলিক মানবসত্তা থেকে বিচ্যুত করে এক অন্তহীন অন্ধকার গহ্বরে নিক্ষেপ করে। ​এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, যদি নিহিলিজমের যুক্তিগুলো আংশিক বা পুরোপুরি সত্যও হয়, তবে মানুষের বেঁচে থাকার তাৎপর্য কোথায়? এর উত্তরটা খুব সহজ—মানুষ কেবল নিরেট যুক্তি দিয়ে বাঁচে না, মানুষ বাঁচে আশা আর স্বপ্নের সঞ্জীবনী সুধায়। নিহিলিজমের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এটি জীবনের ‘ফলাফল’-এর ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, জীবনে কোনো কিছুরই শতভাগ নিশ্চয়তা নেই। তাই কেবল চূড়ান্ত ফলাফলের দিকে তাকিয়ে না থেকে, কর্মের স্বকীয় আনন্দ ও যাত্রাপথের অভিজ্ঞতাকেই বড় করে দেখতে হবে।

​আমরা পড়াশোনা করি কেবল একটি গতানুগতিক চাকরির জন্য নয়, বরং জ্ঞান অর্জনের বিশুদ্ধ আনন্দে; আমরা কাজ করি কেবল অর্থ উপার্জনের জন্য নয়, বরং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার আত্মতৃপ্তিতে; আমরা ভালোবাসি কেবল প্রতিদান পাওয়ার শর্তে নয়, বরং ভালোবাসার সহজাত পবিত্রতায়। আমাদের প্রতিটি প্রচেষ্টার অন্তর্নিহিত মূল্য চূড়ান্ত ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না, বরং নির্ভর করে সেই নিরলস সাধনার ওপর—যা আমাদের সত্যিকারের মানবিক গুণাবলিতে সমৃদ্ধ করে। মহাজাগতিক দৃষ্টিকোণ থেকে জীবনের হয়তো কোনো পূর্বনির্ধারিত অর্থ নেই, কিন্তু মানুষের সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি হলো নিজের হাতে নিজের জীবনের অর্থ নির্মাণ করে নেওয়া। এই সৃজনশীলতা আর আশাবাদই মানুষকে নিহিলিজমের ভয়াল কালো ছায়া থেকে মুক্ত রাখে।

​নিহিলিজম বা শূন্যবাদ আমাদের জীবনের এক রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায় ঠিকই, তবে এটিই মানব-অস্তিত্বের শেষ সত্য নয়। মহাবিশ্ব হয়তো আমাদের প্রশ্নের জবাবে অনন্তকাল নীরব থাকবে, আর জীবনের হয়তো কোনো নির্দিষ্ট মহাজাগতিক উদ্দেশ্যও নেই; কিন্তু ঠিক এই অভাববোধের কারণেই আমাদের অস্তিত্ব এত সুন্দর। কারণ, আমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ জীবনের অনন্য রচয়িতা। আমরা যখন গভীরভাবে উপলব্ধি করি যে জীবনের কোনো পূর্বনির্ধারিত অর্থ নেই, ঠিক তখনই আমরা নিজের মতো করে অর্থপূর্ণ জীবন যাপন করার পরম স্বাধীনতা লাভ করি। আমাদের প্রতিটি ভালোবাসা, প্রতিটি স্বপ্ন, প্রতিটি সংগ্রাম তখন আর কোনো মহাজাগতিক বাধ্যবাধকতার ফসল থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে একান্তই আমাদের নিজস্ব নান্দনিক সৃষ্টি। ​তাই আসুন, নৈরাশ্যের এই অন্ধকার দর্শনকে আমাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে না দিয়ে, আমরাই প্রবল আশা ও স্বপ্নের শক্তিতে একে জয় করি। শূন্যতার এই অসীম মহাবিশ্বে আমাদের ভালোবাসা আর অবিরাম বেঁচে থাকার লড়াইটাই হোক অর্থহীনতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো ও সুন্দরতম প্রতিবাদ।

বিজ্ঞাপন

লেখক পরিচিতি:

আমানুর রহমান

শিক্ষার্থী, স্নাতক, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, শান্তিনগর, ঢাকা।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD