Logo

আবারও ফিরবে চলচ্চিত্র শিল্পের হারানো গৌরবময় স্বর্ণযুগ

profile picture
পারভেজ আবীর
২৫ জুলাই, ২০২৬, ১৮:১৮
আবারও ফিরবে চলচ্চিত্র শিল্পের হারানো গৌরবময় স্বর্ণযুগ
ফাইল ছবি।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচিত (২০২৬-২০২৮) আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্তির পর থেকেই একটি বিষয় নিয়ে আমাকে বারবারই ভাবাচ্ছে,সেটা হলো আমরা চলচ্চিত্রের বর্তমান অস্তিত্বের সংকট নিয়ে অনেক আলোচনা করি, নানা রকমের মতামত দেই এবং বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলি। কিন্তু আমার মনে হয়, চলচ্চিত্র শিল্পের রুগ্নদশার জন‍্য মূল সমস্যাটিকে আমরা এখনও চিহ্নিত করতে পারছি না,সেটাই বাস্তবতা।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নবনির্বাচিত প্রতিনিধিদের সৌজন্য সাক্ষাৎকালে মতবিনিময় করার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে প্রযোজক জনাব শামসুল আলম বলেন, এবারের নির্বাচন বানচাল না হলে আগামী বছরে ১২০টি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা সম্ভব হবে। তাঁর বক্তব্যের প্রেক্ষাপট আমি পুরোপুরি বুঝেছি কি না জানি না। তবে,আমার মনে একটি প্রশ্ন এসেছে। আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের বর্তমান সংকট কি শুধু কি নির্বাচন না হওয়ার কারণে? যদি তাই হতো, তাহলে নির্বাচন হলেই কি বিনিয়োগ, দর্শক, প্রদর্শনব্যবস্থা ও বাজারের সব সংকট দূর হয়ে যেত?

একই অনুষ্ঠানে এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নতুন প্রতিভা খোঁজার এবং তৈরির জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের প্রস্তাবনার রুপরেখা তুলে ধরেন। এসব উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শুধু নতুন প্রতিভা তৈরি করলেই কি চলচ্চিত্র শিল্প টেকসই হয়ে উঠবে?

আমি মনে করি, আসলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় সংকট প্রতিভার অভাব নয়,বরং মূল সমস‍্যা হচ্ছে প্রযোজকদের এই শিল্পে বিনিয়োগের আস্থা ও নিরাপত্তার অভাব আছে।চলচ্চিত্র শুধু শিল্প বলে আবদ্ধ না রেখে এটিকে রুপ দিতে হবে একটি বহুমাত্রিক বড় অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায়। একজন প্রযোজক যখন কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন, তখন তাঁর কাছে ন্যূনতম আস্থা থাকতে হবে,তিনি যেন ন্যায্যভাবে সেই বিনিয়োগের লাভসহ মুনাফায় উন্নিত করতে পারেন সেই পরিকল্পনা সরকারকেই করতে হবে। সেই আস্থা এবং পরিবেশ সৃষ্টি করতে না পারলে আমি নিশ্চিত যে,এই শিল্পে বিনিয়োগের প্রবাহ কমে যাবে।যার ফলে ভালো গল্প, সৃজনশীল ছবির নির্মাণ,চলচ্চিত্র শিল্পে আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন এবং নতুন প্রতিভার বিকাশও থেমে যাবে।

বিজ্ঞাপন

অতীতের দিকে একটু তাকালে বড় ধরনের পার্থক্য চোখে পড়ে, একসময় আমাদের দেশের প্রযোজকেরা চলচ্চিত্র নির্মাণকে শুধু একটি ব্যবসা হিসেবে দেখতেন না। একটি সফল চলচ্চিত্রের আয় দিয়ে তারা পরিবার পরিচালনা করতেন, সন্তানদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিতেন, সম্পদ গড়ে তুলতেন এবং সেই লাভের অর্থ আবার নতুন চলচ্চিত্র নির্মাণে বিনিয়োগ করতেন। এভাবেই চলচ্চিত্র শিল্পে টেকসই বিনিয়োগের একটি ধারাবাহিক চক্র গড়ে উঠেছিল। অর্থাৎ চলচ্চিত্র তখন শুধু আপামর সংস্কৃতির বাহক ছিল না,এটি একটি সমাজে টিকে থাকার জন্য কার্যকর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও ছিল বটে।

কিন্তু আজ বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। বর্তমানে অনেক প্রযোজক যে অর্থ চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ করেন,সেই বিনিয়োগের বড় অংশই আর ফিরে পান না। ফলে নতুন করে বিনিয়োগ করার সাহস ও সক্ষমতা দুটোই কমে যাচ্ছে।মোটাদাগে চিন্তা করতে গেলে একটি শিল্প তখনই টেকসই হয়, যখন বিনিয়োগকারী তাঁর লাভসহ ন্যায্য মুনাফা ফিরে পান।সেই মুনাফা থেকেই আবার নতুন চলচ্চিত্র নির্মিত হয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং পুরো শিল্পের অর্থনৈতিক চক্র সচল থাকে।

চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ যদি ধারাবাহিকভাবে ফেরত না আসে, তাহলে সেই মূলধনের পুনঃপ্রবাহ বন্ধ হতে বাধ‍্য। এর প্রভাব শুধু চলচ্চিত্র শিল্পেই সীমাবদ্ধ থাকে না; দেশের সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়। তাই চলচ্চিত্রকে নিছক বিনোদনের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে তা নয় বরং অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবেও দেখা উচিত।

বিজ্ঞাপন

আমার দেখা, চলচ্চিত্র শিল্পের চলমান সংকট নিয়ে বহু বছর ধরে অসংখ্য সভা, সেমিনার ও আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সমস‍্যা সেই তিমিরেই। আলোচনা যত বেড়েছে, আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প ততটাই সংকুচিত হয়েছে। তাই আমার মনে হয়, রোগ যেখানে, চিকিৎসাও সেখানেই হওয়া উচিত। মূল সমস্যার সমাধান ছাড়া অন্য বিষয় নিয়ে বছরের পর বছর ব্যস্ত থাকলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।

আমাদের বর্তমান শিল্পীরাও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির বর্তমান সভাপতিও নিয়মিত নাটকে অভিনয় করছেন। কারণ সেখানে এখন একটি বাজার সৃস্টি হয়েছে, সেখানে প্রযোজকের বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার মোটামুটি বাস্তব সম্ভাবনা ও আস্থার স্থান তৈরি হয়েছে । তবে এটাও সত্য যে, এখন তুলনায় টেলিভিশন নাটক ও টেলিফিল্মের সংখ্যাও কমেছে। কারণ দর্শকদের একটি বড় অংশ এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ইউটিউবমুখী। ধরে নিতে হবে প্ল্যাটফর্ম বদলেছে কিন্তু ধারা বদলায়নি। যে ধারা বা প্ল্যাটফর্মেই কাজ হোক না কেন প্রযোজকদের বিনিয়োগ নিরাপদ না হলে সেই শিল্প দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না। সুতরাং সর্বাগ্রে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে এবং কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে এই শিল্পকে বাঁচাতে হবে ।সেই জন্য এই শিল্পক বাঁচিয়ে রাখার জন্য অচিরেই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সহ রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।

আজ বিশ্বের অনেক দেশ, যেমন চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত, তাদের চলচ্চিত্রকে শুধু সংস্কৃতির মাধ্যম হিসেবে নয়, একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক শিল্পে পরিণত করেছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তারা বিপুল আয় করছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে, পর্যটনকে উৎসাহিত করছে এবং নিজেদের সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরছে। বাংলাদেশেরও সেই সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রথমেই একটি টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে।

বিজ্ঞাপন

আমার মতে, এখন সময় একটি জাতীয় চলচ্চিত্র অর্থনৈতিক রোডম্যাপ তৈরির। সেখানে প্রযোজকের ন্যায্য আয় নিশ্চিত করতে হবে, সিনেমা হল ও ডিস্ট্রিবিউশন ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে হবে এবং রাজস্ব বণ্টনে স্বচ্ছতা আনতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিবেশক, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, চলচ্চিত্র উৎসব এবং বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র সংস্থার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তুলে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের জন্য নতুন বাজার সৃষ্টি করতে হবে।

আমি তো মনে করি, একটি আস্থাশীল শিল্পে প্রতিভাকে খোঁজার কথা নয়,প্রতিভাবানরাই সেই শিল্পের দিকে এমনিই এগিয়ে আসার কথা।যে প্রক্রিয়ায় প্রতিভা খোঁজ করা হোকনা কেন,এই ধরনের ভবিষ্যৎহীন শিল্পে কোন ব্যক্তিই নিজের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে চাইবেনা।

এই লেখাটি কারো সমালোচনা জন্য নয়, বরং লেখাটি গঠনমূলক আলোচনার আহ্বান।আমরা সবাই যদি সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে আবার অতীত সোনালি সময়ে ফিরিয়ে আনতে চাই, তাহলে আমাদের প্রথমে বুঝতে হবে আমরা কি মূল সমস্যার চিকিৎসা করছি,নাকি শুধু উপসর্গ নিয়ে আলোচনা করছি?

বিজ্ঞাপন

আমার বিশ্বাস,যে দিন একজন প্রযোজক নিশ্চিত হবেন যে তিনি তাঁর বিনিয়োগ ফিরে পাবেন এবং ন্যায্য মুনাফা অর্জন করতে পারবেন,সেদিন নতুন চলচ্চিত্রের জন্য তাঁকে আর আলাদা করে উৎসাহিত করতে হবে না।তিনি নিজেই সবসময় বিনিয়োগ করতে উৎসাহী হবেন। আর সেদিনই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের বহুমাত্রিকভাবে শক্তিশালী ভিত তৈরি হবে।

পারভেজ আবীর চৌধুরী

আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD