Logo

বাজারের স্বাধীনতা বনাম জ্বালানি নিরাপত্তা: বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত

profile picture
পারভেজ আবীর
১৩ আগস্ট, ২০২৬, ২১:৪৫
বাজারের স্বাধীনতা বনাম জ্বালানি নিরাপত্তা: বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত
ছবি : জনবাণী গ্রাফিক্স

দেশের জ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে। বলা হচ্ছে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে জ্বালানি আমদানি, মজুত ও বিপণনের সুযোগ দেওয়া হলে সরকারের ওপর চাপ কমবে, নতুন বিনিয়োগ আসবে এবং বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে। আপাতদৃষ্টিতে যুক্তিটি যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য। বিশ্বের অনেক দেশেই জ্বালানি খাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সফলভাবে কাজ করছে। সে হিসেবে বাংলাদেশে বেসরকারি বিনিয়োগ এলে আপত্তি কোথায়?

বিজ্ঞাপন

আপত্তি বেসরকারি বিনিয়োগে নয়, প্রশ্নটি সময়, কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। জ্বালানির মতো কৌশলগত একটি খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আগে দেখা দরকার, আমাদের বাজার ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এর জন্য কতটা প্রস্তুত। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, এই মুহূর্তেই জ্বালানি আমদানি ও বিপণনে বেসরকারি খাতকে বড় পরিসরে আনার প্রয়োজন এত জরুরি হয়ে উঠল কেন? সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এই প্রশ্নগুলোর পরিষ্কার উত্তর থাকা জরুরি।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ইন্টারনেট বা টিভি ডিশের সেবা যদি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সংগ্রহ, বিতরণ ও পরিচালনা করতে পারে, তাহলে জ্বালানির ক্ষেত্রে সমস্যা কোথায়? কথাটা শুনতে সহজ এবং যুক্তিসংগত মনে হতে পারে। কিন্তু জ্বালানিকে ইন্টারনেট বা টিভি ডিশের সঙ্গে একই পাল্লায় মাপার সুযোগ নেই। ইন্টারনেট কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকলে মানুষের অসুবিধা হয়, টিভি না চললে বিনোদন বন্ধ থাকে; কিন্তু জ্বালানি সরবরাহে সংকট হলে পরিবহন থামে, কৃষি ও শিল্পে চাপ পড়ে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়, পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ে এবং তার ধাক্কা গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের বাজারের ব্যাগে। জ্বালানি কোনো সাধারণ সেবা নয়, এটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম চালিকাশক্তি। তাই কে জ্বালানি বিক্রি করবে, সেটাই বড় প্রশ্ন নয়; সংকটের দিনে জ্বালানির মজুত, সরবরাহ, মূল্য ও বাজারের শেষ নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, সেই প্রশ্নের উত্তরই আগে পরিষ্কার হওয়া দরকার।

সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট আমাদের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতাও তুলে ধরেছে। রাষ্ট্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকার পরও কোথাও কোথাও পাম্পে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে জ্বালানি বিক্রির অভিযোগ উঠেছে, বাজার সামলাতেও সরকারকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। বর্তমান ব্যবস্থাতেই যদি সংকটের কয়েকটি দিনে নির্ধারিত মূল্য ও স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে আমদানি, মজুত ও বিপণনের বড় অংশ বেসরকারি হাতে যাওয়ার পর পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বাজার খুলে দেওয়ার আগে তাই শুধু বেসরকারি খাত কতটা প্রস্তুত, সেটি দেখলেই হবে না; তাদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো রাষ্ট্র নিজে কতটা প্রস্তুত, সেটিই আগে প্রমাণ হওয়া দরকার।

বিজ্ঞাপন

একটি বা দুটি বড় প্রতিষ্ঠানের হাতে জ্বালানি বাজারের উল্লেখযোগ্য অংশ চলে গেলে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ তৈরির ঝুঁকি থাকবে। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দিলেই যে বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই। কারণ প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নিজেদের মধ্যে দাম, সরবরাহ কিংবা বাজারের অংশ ভাগাভাগি নিয়ে প্রকাশ্য বা অঘোষিত সমঝোতায় যায়, তাহলে বহু প্রতিষ্ঠানের আড়ালেই গড়ে উঠতে পারে শক্তিশালী কার্টেল। তখন কাগজে প্রতিযোগিতা থাকলেও বাস্তবে বাজারের নিয়ন্ত্রণ চলে যেতে পারে কয়েকটি শক্তিশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে। জ্বালানির মতো কৌশলগত খাতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে শুধু সাধারণ মানুষই নয়, একপর্যায়ে রাষ্ট্রও জ্বালানি সরবরাহ ও বাজার স্থিতিশীল রাখার প্রশ্নে এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর বাধ্যতামূলকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। আর রাষ্ট্র যখন কোনো কৌশলগত পণ্যের জন্য বেসরকারি গোষ্ঠীর ওপর বাধ্যতামূলকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সেটি আর শুধু বাজারের বিষয় থাকে না, সরাসরি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

তাই বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার আগে মূল আলোচনা হওয়া উচিত নিয়ন্ত্রণের কাঠামো নিয়ে। একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বাজারের সর্বোচ্চ কত শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, কত দিনের জ্বালানি মজুত বাধ্যতামূলক থাকবে, মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি কী হবে, কৃত্রিম সংকট বা সরবরাহে কারসাজি করলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং জাতীয় জরুরি পরিস্থিতিতে বেসরকারি মজুত ও সরবরাহের ওপর সরকারের সরাসরি নির্দেশ দেওয়ার আইনি ক্ষমতা থাকবে কি না, এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর আগে নিশ্চিত করা জরুরি। বাজার খুলে দেওয়ার পর নিয়ন্ত্রণের পথ খোঁজা নয়, নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেই বাজার খুলতে হবে।

এর সঙ্গে এখন আরেকটি বাস্তবতাও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই, সেটি জনমত। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে Facebook-এ মানুষের প্রতিক্রিয়া যেভাবে দ্রুত ও তীব্রভাবে প্রকাশ পাচ্ছে, তাকে নিছক অনলাইন আলোচনা হিসেবে দেখার সুযোগ কমে এসেছে। জ্বালানির মতো সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি কৌশলগত খাত নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এই জনমতের রাজনৈতিক গুরুত্বও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

কারণ জ্বালানির দাম বা সরবরাহে সামান্য অস্থিরতাও শুধু পেট্রোল পাম্পে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে পরিবহন ভাড়া, কৃষি উৎপাদন, শিল্পের খরচ এবং শেষ পর্যন্ত নিত্যপণ্যের বাজারে। ফলে জ্বালানির একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত খুব অল্প সময়ের মধ্যেই জনজীবনের সংকট এবং সেখান থেকে রাজনৈতিক অসন্তোষের বিষয়ে পরিণত হতে পারে।

বর্তমান সরকার যদি মানুষের এই উদ্বেগের গভীরতা সময়মতো অনুধাবন করতে না পারে, তাহলে একটি অর্থনৈতিক সংস্কারই উল্টো বড় রাজনৈতিক চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে মানুষের মধ্যে যদি এমন ধারণা তৈরি হয় যে রাষ্ট্র একটি কৌশলগত খাতের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে ছেড়ে দিয়ে কয়েকটি শক্তিশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, তাহলে সেই ধারণার রাজনৈতিক মূল্যও সরকারকে বহন করতে হতে পারে।

তাই বিষয়টিকে শুধু নতুন বিনিয়োগ বা বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরির প্রশ্ন হিসেবে দেখলে চলবে না। জনস্বার্থ, জ্বালানি নিরাপত্তা, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা, চারটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

বেসরকারি খাত আসুক, বিনিয়োগও হোক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে আইনের মধ্যে রাখার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আমাদের রাষ্ট্র এখনও পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি। সেই সক্ষমতা তৈরি হওয়ার আগেই জ্বালানির মতো কৌশলগত খাতের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

জ্বালানির মতো কৌশলগত খাতে মানুষের আস্থা হারিয়ে কোনো সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী করা সহজ নয়। সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন না তুলেও বলা যায়, জনমতের ভাষা সময় থাকতে বুঝতে না পারলে আজ যে সিদ্ধান্তকে অর্থনৈতিক সংস্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে, আগামী দিনে সেটিই বড় রাজনৈতিক চাপ কিংবা সংকটের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

পারভেজ আবীর চৌধুরী

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি

বিজ্ঞাপন

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD