Logo

কঠোর অবস্থানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ১৮ পরীক্ষায় বহিষ্কার ২৫৭১

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১০ মে, ২০২৬, ১৭:১৭
কঠোর অবস্থানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ১৮ পরীক্ষায় বহিষ্কার ২৫৭১
ছবি: সংগৃহীত

দেশের সর্ববৃহৎ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরীক্ষায় গত দেড় বছরে নজিরবিহীন হারে শিক্ষার্থী বহিষ্কারের ঘটনা ঘটেছে। নকল, জালিয়াতি ও অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১৮টি পরীক্ষায় মোট ২ হাজার ৫৭১ জন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা শৃঙ্খলা কমিটি। সংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় এটি একটি উদ্বেগজনক ও নেতিবাচক দৃষ্টান্ত।

বিজ্ঞাপন

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ দপ্তর ও শৃঙ্খলা কমিটির নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বহিষ্কারের সংখ্যায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে অনার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা। অনার্সের ছয়টি পরীক্ষায় মোট ১ হাজার ২৭২ জন শিক্ষার্থী শাস্তির আওতায় এসেছে, যা মোট বহিষ্কারের প্রায় অর্ধেক। এর মধ্যে ‘অনার্স ৩য় বর্ষ-২০২৩’ পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ৩৩৭ জন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়।

এছাড়া ‘অনার্স ৪র্থ বর্ষ-২০২৩’ পরীক্ষায় ৩১৮ জন, ‘অনার্স ৪র্থ বর্ষ-২০২২’ পরীক্ষায় ৩০৪ জন, ‘অনার্স ২য় বর্ষ-২০২৩’ পরীক্ষায় ১৯০ জন এবং ‘অনার্স ১ম বর্ষ-২০২৩’ পরীক্ষায় ১১৯ জন শিক্ষার্থী সাজা পেয়েছেন। নতুন শুরু হওয়া ‘অনার্স ১ম বর্ষ-২০২৪’ পরীক্ষাতেও ইতোমধ্যে ৮৪ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কৃত হয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

ডিগ্রি পাস কোর্সের পরিস্থিতিও কম উদ্বেগজনক নয়। ছয়টি পরীক্ষায় মোট ৫৩১ জন শিক্ষার্থী শাস্তি পেয়েছেন। এর মধ্যে ‘ডিগ্রি পাস ৩য় বর্ষ-২০২৩’ পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ১২৩ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কার হয়েছেন। একই বর্ষের ২০২২ সালের পরীক্ষায় ৮২ জন, ‘২য় বর্ষ-২০২৩’ পরীক্ষায় ৯৩ জন, ‘২য় বর্ষ-২০২২’ পরীক্ষায় ৮২ জন, ‘১ম বর্ষ-২০২৩’ পরীক্ষায় ৯০ জন এবং ‘১ম বর্ষ-২০২২’ পরীক্ষায় ৭৩ জন শিক্ষার্থী সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন।

মাস্টার্স ও প্রিলিমিনারি পর্যায়েও অনিয়মের চিত্র উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ‘মাস্টার্স শেষ পর্ব-২০২২’ পরীক্ষায় ১২৭ জন এবং ‘মাস্টার্স শেষ পর্ব-২০২১’ পরীক্ষায় ১২৪ জন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া ‘প্রিলিমিনারি টু মাস্টার্স-২০২২’ পরীক্ষায় ৮৩ জন এবং ‘প্রিলিমিনারি টু মাস্টার্স-২০২১’ পরীক্ষায় ৫৭ জন শিক্ষার্থী শাস্তির মুখে পড়েছেন।

পেশাজীবী কোর্স হিসেবে পরিচিত এলএলবি পরীক্ষাতেও বড় ধরনের জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে। ‘এলএলবি শেষ পর্ব-২০২২’ পরীক্ষায় একসঙ্গে ২৩৪ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কৃত হয়েছেন, যা একক পরীক্ষার ক্ষেত্রে অন্যতম সর্বোচ্চ সংখ্যা। এছাড়া ‘এলএলবি ১ম পর্ব-২০২৩’ পরীক্ষায় আরও ৫১ জন শিক্ষার্থীকে সাজা দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, অনার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি শাস্তির মুখোমুখি হয়েছেন। মোট বহিষ্কৃতদের প্রায় ৪৯ দশমিক ৪৭ শতাংশই অনার্সের শিক্ষার্থী। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ডিগ্রি পাস কোর্স, যেখানে বহিষ্কারের হার প্রায় ২০ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এলএলবি কোর্সে বহিষ্কারের হার ১১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মাস্টার্স ও প্রিলিমিনারি পর্যায়ে তা প্রায় ১৫ শতাংশ।

বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনার্সের চূড়ান্ত বর্ষগুলোতেই জালিয়াতির প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। অনার্স ৩য় ও ৪র্থ বর্ষের তিনটি পরীক্ষায় মোট ৯৫৯ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কার হয়েছেন, যা অনার্স পর্যায়ের মোট বহিষ্কারের প্রায় ৭৫ শতাংশেরও বেশি।

বিজ্ঞাপন

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা বিধিমালায় পরীক্ষাসংক্রান্ত ১৯ ধরনের অপরাধ চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এসব অপরাধের জন্য ছয় ধরনের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। সাধারণ কথাবার্তা বলা, মোবাইল বহন, অননুমোদিত কাগজপত্র রাখা থেকে শুরু করে উত্তরপত্র পাচার, পরিচয় জালিয়াতি, শিক্ষক লাঞ্ছনা কিংবা নাশকতার মতো গুরুতর অপরাধ পর্যন্ত তালিকাভুক্ত রয়েছে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বছরের পরীক্ষা বাতিল থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ চার বছর পর্যন্ত বহিষ্কারের শাস্তি দেওয়া হয়। গুরুতর নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের ক্ষেত্রে স্থায়ী বহিষ্কারের বিধানও রয়েছে।

পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। গত ৩০ এপ্রিল ময়মনসিংহে আঞ্চলিক কার্যালয়ের উদ্বোধন শেষে কয়েকটি পরীক্ষা কেন্দ্রে আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে ঘটনাস্থলেই ১০ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে উপাচার্য বলেন, “পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে পরীক্ষা নেওয়া শুধু প্রহসনে পরিণত হয়।” তিনি আরও বলেন, পরীক্ষা কেন্দ্র ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের নৈতিক মানোন্নয়ন ছাড়া পরীক্ষার মান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

বিজ্ঞাপন

পরীক্ষায় নকলের ধরন নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন বিভিন্ন কলেজের শিক্ষকরা। তাদের ভাষ্য, আগে যেখানে ছোট চিরকুট বা বেঞ্চে লিখে নকলের প্রবণতা ছিল, এখন সেখানে যুক্ত হয়েছে স্মার্টফোন, ক্ষুদ্র ডিজিটাল ডিভাইস ও ইন্টারনেটভিত্তিক জালিয়াতি। বিশেষ করে ইংরেজি, গণিত ও অ্যাকাউন্টিংয়ের মতো বিষয়ে প্রযুক্তিনির্ভর নকলের প্রবণতা বাড়ছে। অনেক সময় এসব অনিয়ম শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

শিক্ষকদের মতে, সারা বছর ক্লাসে অনুপস্থিত থাকা এবং পরীক্ষার আগে শুধুমাত্র গাইড বইনির্ভর প্রস্তুতি নেওয়ার কারণে অনেক শিক্ষার্থী আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। চাকরির বাজারে সনদের গুরুত্ব বাড়লেও বাস্তব দক্ষতার ঘাটতি তাদের নকলের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় এখন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। উপাচার্য ড. এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, নকল দমন ছাড়াও খাতা মূল্যায়নে অবহেলা করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। পুনর্মূল্যায়নে কোনো শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে বলেও জানান তিনি।

উপাচার্যের দাবি, বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার তদারকি আগের তুলনায় অনেক বাড়ানো হয়েছে। ২০২৫ সালে প্রায় ৩০০টি পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে, যেখানে অংশ নিয়েছেন প্রায় ৩০ লাখ শিক্ষার্থী। আগে ফল প্রকাশে পাঁচ থেকে ছয় মাস সময় লাগলেও এখন সর্বোচ্চ ৪৫ দিনের মধ্যেই ফল প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ সেশনজট কমানো হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তা ৭০ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চের মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রায় সম্পূর্ণ সেশনজটমুক্ত করার লক্ষ্য নিয়েও কাজ চলছে বলে জানান তিনি।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD