গাইড বইয়ের প্রশ্নে আর নয় পরীক্ষা, শিক্ষকদের জন্য কঠোর বার্তা

দেশের বিভিন্ন স্কুল ও মাদরাসায় দীর্ঘদিন ধরে গাইড বই, নোটবই কিংবা প্রস্তুতকৃত প্রশ্নপত্র থেকে হুবহু প্রশ্ন নিয়ে অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা আয়োজনের অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি ময়মনসিংহ অঞ্চলের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে এমন অভিযোগ নতুন করে সামনে আসার পর বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে শিক্ষা প্রশাসন। শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা ও শেখার অগ্রগতি মূল্যায়নের স্বার্থে গাইডনির্ভর প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়ার প্রবণতা বন্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষা প্রশাসন জানিয়েছে, আসন্ন অর্ধবার্ষিক, বার্ষিক, প্রাক-নির্বাচনী ও নির্বাচনী পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদেরই প্রস্তুত করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই বাইরের উৎস, গাইড বই, নোটবই কিংবা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা প্রস্তুত প্রশ্নপত্র ব্যবহার করা যাবে না।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বহু বছর ধরে কিছু এলাকায় ‘রেডিমেড’ প্রশ্নপত্র ব্যবহারের একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিক্ষাগত দক্ষতা মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশ্ন প্রণয়নের দক্ষতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষার্থীরা অনেক সময় আগে থেকেই সম্ভাব্য প্রশ্ন সম্পর্কে ধারণা পেয়ে যাওয়ায় পরীক্ষার ফলাফল বাস্তব শিক্ষাগত অবস্থার প্রতিফলন করে না।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, পরীক্ষা মৌসুমে কিছু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ও তাদের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন স্কুল-মাদরাসার সঙ্গে যোগাযোগ করে সম্ভাব্য প্রশ্ন, মডেল টেস্ট কিংবা প্রস্তুত প্রশ্নসেট সরবরাহের প্রস্তাব দিয়ে থাকে। যদিও এসব কার্যক্রমের ব্যাপ্তি বা প্রকৃত পরিসংখ্যান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি, তবুও অভিযোগের বিষয়টি শিক্ষা প্রশাসনের নজরে এসেছে।
এদিকে রাজধানীর টিকাটুলিকেন্দ্রিক কিছু শিক্ষাসামগ্রীর বাজার থেকেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উপযোগী করে তৈরি প্রশ্নসেট সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ অঞ্চলের উপপরিচালকের কার্যালয় থেকে জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার সব প্রশ্নপত্র প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের মাধ্যমে প্রস্তুত করতে হবে। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নির্দেশনাটি সংশ্লিষ্ট সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান নীতিমালার উদ্ধৃতি দিয়ে নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, পাবলিক পরীক্ষা ছাড়া অন্য সব পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকেই তৈরি করতে হবে এবং বাইরের কোনো উৎস থেকে সংগৃহীত প্রশ্ন ব্যবহার করা যাবে না।
শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি, বিষয়ভিত্তিক বোঝাপড়া এবং শ্রেণিকক্ষে অর্জিত দক্ষতা যাচাই করা। তাই প্রশ্নপত্র তৈরিতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা ময়মনসিংহ অঞ্চলের উপপরিচালক মোহা. নাসির উদ্দীন বলেন, বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষকদেরই প্রশ্নপত্র প্রস্তুত করতে হবে। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাইরের উৎস থেকে প্রশ্ন নিয়ে পরীক্ষা নিলে তা নিয়মবহির্ভূত হবে। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষকদের একটি অংশও মনে করেন, নিজস্ব প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করলে শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি, পাঠ্যক্রমের অগ্রগতি এবং শ্রেণিকক্ষের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া সম্ভব হয়। তবে তারা একই সঙ্গে প্রশ্ন প্রণয়ন দক্ষতা বাড়াতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের অনেক শিক্ষক বাস্তব সমস্যার কথাও তুলে ধরেছেন। তাদের মতে, বিশেষ করে গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। একজন শিক্ষককে একাধিক বিষয়ে পাঠদান করতে হয়। পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজ, তথ্য হালনাগাদ, রেজিস্টার সংরক্ষণসহ নানা দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে প্রশ্নপত্র তৈরি ও পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
বিজ্ঞাপন
গাজীপুরের শ্রীপুরের একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শিক্ষক স্বল্পতা ও অতিরিক্ত দায়িত্বের কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান বাইরের প্রশ্নপত্র ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তবে এটি নিয়মসম্মত নয়। প্রয়োজনীয় জনবল ও সময় নিশ্চিত করা গেলে এই প্রবণতা অনেকাংশে কমে আসবে।
ময়মনসিংহের আরেকটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, অনেক সময় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা নমুনা প্রশ্নপত্র সরবরাহ করেন। কিছু প্রতিষ্ঠান সহজ সমাধান হিসেবে সেগুলো ব্যবহার করলেও দীর্ঘমেয়াদে এতে শিক্ষার্থীদেরই ক্ষতি হয়।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মাধ্যমিক শাখার পরিচালক অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রচলিত নির্দেশনার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হলে গাইডনির্ভর প্রশ্নপত্রের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষকদের নিজস্ব প্রশ্ন প্রণয়নের চর্চা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত জনবল এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা হলে শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।








