Logo

টানা বৃষ্টি: জরাজীর্ণ স্কুল ভবনে ঝুঁকিতে ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
হবিগঞ্জ
১২ জুলাই, ২০২৬, ১৩:২১
টানা বৃষ্টি: জরাজীর্ণ স্কুল ভবনে ঝুঁকিতে ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী
ছবি: সংগৃহীত

টানা বৃষ্টিতে হবিগঞ্জের শত শত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ ভবনগুলোতে বেড়েছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। কোথাও ছাদ থেকে পানি চুঁইয়ে পড়ছে, কোথাও দেয়ালে দেখা দিয়েছে বড় বড় ফাটল, আবার কোথাও হঠাৎ খসে পড়ছে ছাদের পলেস্তারা। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে শ্রেণিকক্ষে বসছে হাজারো শিক্ষার্থী। শিক্ষক, অভিভাবক এবং স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভবনগুলো সংস্কার না হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকি আরও বেড়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি মাধবপুর উপজেলার আন্দিউড়া ইউনিয়নের হরিশ্যামা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া একটি দুর্ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। গত ২০ জুন সকাল প্রায় ১১টার দিকে বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণিকক্ষের ছাদের পলেস্তারা ভেঙে পড়ে অফিস সহকারী প্রকাশ দাস আহত হন। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।

দীর্ঘদিন ধরে ওই বিদ্যালয়ে কর্মরত প্রকাশ দাস জানান, ভবনটির অবস্থা বহু বছর ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ। যে কোনো সময় এমন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কা তাদের অনেক দিনের। তিনি বলেন, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে আরও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দুর্ঘটনার সময় শ্রেণিকক্ষে ক্লাস চলছিল না, সেটিই ছিল বড় সৌভাগ্যের বিষয়। অন্যথায় সেখানে শিক্ষার্থীরা থাকলে হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারত।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিদ্যালয়টির শিক্ষক ও অভিভাবকদের ভাষ্য, ওই ঘটনার পর থেকে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বর্ষাকাল এখনও শেষ না হওয়ায় জেলার অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়েও একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

হবিগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার মোট ১ হাজার ৫২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৫৯টি বিদ্যালয় ভবন আনুষ্ঠানিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এসব ভবনে বর্তমানে প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী নিয়মিত পাঠ গ্রহণ করছে। এছাড়া ২০টি বিদ্যালয়কে 'অতিঝুঁকিপূর্ণ' হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

হরিশ্যামা বিদ্যালয়ের ঘটনার পর বিষয়টি আদালতের নজরেও এসেছে। হবিগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য রুহি দাস প্রধান বিচারিক হাকিমের আদালতে একটি আবেদন করে জেলার সব ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ তালিকা চেয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

তার মতে, এত বিপুল সংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয় প্রমাণ করে যে বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ছিল। তিনি বলেন, এটি কেবল ভবন সংস্কারের প্রশ্ন নয়; হাজারো শিশুর জীবনের নিরাপত্তার বিষয়। বড় দুর্ঘটনার অপেক্ষা না করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ঘুরেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। কোথাও শ্রেণিকক্ষের ছাদে বড় ফাটল, কোথাও বৃষ্টির পানি সরাসরি কক্ষে প্রবেশ করছে। অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে পাঠদান ও পাঠগ্রহণ করছেন।

গৌরাঙ্গ এলাকার চক বাবুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থাও উদ্বেগজনক। ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৯৫ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সম্প্রতি ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী আহত হওয়ার পর আতঙ্ক আরও বেড়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনোয়ারা বেগম জানান, পরীক্ষা চলাকালে ছাদের একটি অংশ ভেঙে পড়ে শিক্ষার্থী আহত হয়। এরপর থেকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন ভয় নিয়ে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন।

আহত শিক্ষার্থীর অভিভাবক শাহিদা বেগম বলেন, প্রতিদিন সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠানোর সময় ভয় কাজ করে। তিনি জানান, ছেলের আহত হওয়ার পর থেকে বাড়ি ফিরে না আসা পর্যন্ত দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোও সম্ভব হচ্ছে না। তাই দ্রুত ভবনটি মেরামত বা নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানান তিনি।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীপঙ্কর রায় বলেন, প্রতিষ্ঠানটি ১৯৩৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও সর্বশেষ নতুন ভবন নির্মাণ করা হয় ১৯৯৪ সালে। এরপর আর বড় ধরনের সংস্কার হয়নি। বর্তমানে ভবনের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং বর্ষাকালে শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে পড়ে। ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তিনি জানান, ভবনের এমন অবস্থার কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দিচ্ছেন। এতে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।

আরেক অভিভাবক আব্দুল কাশেম বলেন, বৃষ্টি হলেই শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে এবং ভবনটি দেখে মনে হয় যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। একাধিকবার সংশ্লিষ্টদের জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বড় দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায় কে নেবে—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জ সদর, লাখাই, বাহুবল, মাধবপুর ও চুনারুঘাট উপজেলায় তিনটি করে বিদ্যালয় অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। নবীগঞ্জে রয়েছে দুটি এবং বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ ও শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলায় রয়েছে একটি করে অতিঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেলার অধিকাংশ ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয় ভবনে গত ২৫ বছরেও বড় ধরনের সংস্কার করা হয়নি। ফলে প্রতিটি বর্ষায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী মো. সেলিম মিয়া বলেন, এসব বিদ্যালয়ের ভবন পুনর্নির্মাণকে জরুরি জাতীয় কর্মসূচি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। দীর্ঘদিনের অবহেলায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো শুধু সামান্য সংস্কার করে নিরাপদ করা সম্ভব নয়। তিনি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোর জন্য দ্রুত অর্থ বরাদ্দ এবং স্বাধীন প্রকৌশল পরিদর্শন কমিটি গঠনের আহ্বান জানান।

এ বিষয়ে হবিগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহ আলম বলেন, চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোর জন্য আগামী অর্থবছরে নতুন ভবন নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি জানান, পর্যায়ক্রমে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর পরিবর্তে নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, শিশুদের নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তাই বর্ষা মৌসুমে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামো দ্রুত সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের বিকল্প নেই। অন্যথায় যেকোনো সময় একটি ছোট অবহেলা বড় ধরনের প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD