Logo

টিসি দিয়ে বের করে দেওয়া ২৫ শিক্ষার্থীও পেল জিপিএ-৫

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
নরসিংদী
১৫ আগস্ট, ২০২৬, ১৪:০৪
টিসি দিয়ে বের করে দেওয়া ২৫ শিক্ষার্থীও পেল জিপিএ-৫
ছবি: সংগৃহীত

নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের ২০২৬ সালের এসএসসি ফলাফলে শতভাগ জিপিএ-৫ পাওয়ার সাফল্য নিয়ে প্রশংসার পাশাপাশি শিক্ষার্থী বাছাইয়ের অভিযোগও সামনে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির ৩৮২ পরীক্ষার্থীই জিপিএ-৫ পেলেও নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত ৬০১ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২১৯ জন শেষ পর্যন্ত ওই প্রতিষ্ঠান থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি।

বিজ্ঞাপন

আরও আলোচনার জন্ম দিয়েছে টেস্ট পরীক্ষায় বাদ পড়া শিক্ষার্থীদের ফলাফল। প্রতিষ্ঠানটি থেকে টিসি নিয়ে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া নরসিংদী সানবীন স্কুলের ৫০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৫ জনই জিপিএ-৫ পেয়েছে। ফলে নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুলের শতভাগ জিপিএ-৫ অর্জনের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী ও অভিভাবক।

৬০১ থেকে পরীক্ষার্থী ৩৮২

প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে মোট ৬০১ শিক্ষার্থী নিবন্ধিত ছিল। দুই বছর পর ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৩৮২ জন। অর্থাৎ নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২১৯ জন নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়নি।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

ভুক্তভোগী কয়েকজন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের অভিযোগ, টেস্ট বা প্রিটেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য দেখিয়ে তাদের ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। পরে তাদের অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে।

তাদের দাবি, শতভাগ জিপিএ-৫-এর ফলাফল ধরে রাখার লক্ষ্যেই দুর্বল ফল করা শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠান থেকে বাদ দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে।

টিসি নিয়ে অন্য স্কুলে, সেখানেই ভালো ফল

বিজ্ঞাপন

নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল থেকে টিসি নিয়ে নরসিংদী সানবীন স্কুলে ভর্তি হয়ে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া ৫০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৫ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। অর্থাৎ ওই শিক্ষার্থীদের অর্ধেকই সর্বোচ্চ ফল অর্জন করেছে।

এ ছাড়া ঘোড়াদিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া পাঁচ শিক্ষার্থীর মধ্যে তিনজন এবং নরসিংদী মডেল স্কুলের চার শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন জিপিএ-৫ পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য থেকে জানা গেছে।

এ ফলাফল সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে, নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল থেকে বাদ পড়া শিক্ষার্থীরা যদি অন্য প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ভালো ফল করতে পারে, তাহলে তাদের আগে থেকেই এসএসসি পরীক্ষার সুযোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক ছিল।

বিজ্ঞাপন

অভিভাবকের অভিযোগ, ২০ হাজার টাকা নিয়ে ভর্তি

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক অভিভাবক অভিযোগ করেন, তার ছেলে পঞ্চম শ্রেণি থেকে নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসে পড়াশোনা করেছিল। টেস্ট পরীক্ষায় ঐচ্ছিক বিষয় জীববিজ্ঞানে কম নম্বর পাওয়ার পর তাকে টিসি দেওয়া হয়।

ওই অভিভাবকের দাবি, পরে নরসিংদী সানবীন স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত তার ছেলে সেখান থেকেই এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অভিভাবকটির ভাষ্য, এসএসসি পরীক্ষার মাত্র কয়েক মাস আগে একজন শিক্ষার্থীকে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করতে বাধ্য করা হলে তার ওপর মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। তার মতে, শুধু শতভাগ জিপিএ-৫ ধরে রাখার জন্য শিক্ষার্থী বাছাই করা হলে সেটি শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক নয়।

শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র

তবে সব শিক্ষার্থীর বক্তব্য অভিযোগের সঙ্গে এক নয়। নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল থেকে টিসি নিয়ে সানবীন স্কুলে পরীক্ষা দেওয়া এক শিক্ষার্থী জানান, প্রতিষ্ঠানটির নিয়মকানুন কঠোর। তিনি টেস্ট বা প্রিটেস্ট পরীক্ষায় পাস করতে না পারায় অন্য স্কুলে ভর্তি হন।

বিজ্ঞাপন

তার দাবি, তাকে জোর করে বের করে দেওয়া হয়নি। তিনি নিজের ফলাফলের ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করেছেন এবং পরে সানবীন স্কুল থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছেন।

আরেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, অষ্টম শ্রেণি থেকেই ধাপে ধাপে শিক্ষার্থীদের বাদ দেওয়া শুরু হয়। কঠিনভাবে খাতা মূল্যায়ন ও তুলনামূলক কঠিন প্রশ্নপত্রের কারণে অনেক শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠানটি থেকে ঝরে পড়ে বলেও তিনি দাবি করেন।

সানবীন স্কুলে ভর্তি হয়েছিল ৫০ শিক্ষার্থী

বিজ্ঞাপন

নরসিংদী সানবীন স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ মোমতাজ উদ্দিন আহাম্মেদ জানান, নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস থেকে ৫০ শিক্ষার্থী তাদের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছিল। অঙ্গীকারনামা নিয়ে তাদের ভর্তি করা হয়।

তিনি বলেন, ওই ৫০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৫ জন জিপিএ-৫ অর্জন করেছে।

স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি, নিয়ম মেনেই ফরম পূরণ

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের প্রধান শিক্ষক মো. ইমন হোসেন। তার দাবি, টেস্ট পরীক্ষায় ভালো ফল না করা শিক্ষার্থীদের বাছাই করে ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়নি—এমন অভিযোগ সঠিক নয়।

তিনি বলেন, সরকারি নির্দেশনা ও শিক্ষা বোর্ডের পরিপত্র অনুসরণ করেই ফরম পূরণ করা হয়েছে। শুধু এ প্লাস না পাওয়ার কারণে কোনো শিক্ষার্থীকে ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়নি—এমন তথ্যও তিনি অস্বীকার করেন।

প্রধান শিক্ষকের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি নির্দেশনা অনুসারে ৩৩ শতাংশ নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কেউ ৩৩ শতাংশ নম্বর পাওয়ার পরও ফরম পূরণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে—এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে কর্তৃপক্ষ যে সিদ্ধান্ত নেবে, তা তারা মেনে নেবেন।

বিজ্ঞাপন

৪৮৩ জন টেস্টে অংশ নিয়ে পাস ৩৮২

প্রধান শিক্ষক আরও জানান, এবারের টেস্ট পরীক্ষায় মোট ৪৮৩ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ৩৮২ জন উত্তীর্ণ এবং ১০১ জন অকৃতকার্য হয়।

তার দাবি, টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৩৮২ শিক্ষার্থীরই এসএসসি ফরম পূরণ করা হয়েছে। আর যারা অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের ফরম পূরণ করা হয়নি। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

নরসিংদীর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এ এস এম আব্দুল খালেক বলেন, কোনো শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে তাকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় না। সেক্ষেত্রে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টিসির মাধ্যমে গিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।

আরও পড়ুন

তবে কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়মের বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীকে বাদ দিয়েছে কি না, সে বিষয়ে অভিযোগ থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তদন্ত করতে পারে বলে জানান তিনি।

একই সঙ্গে তিনি নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের শতভাগ জিপিএ-৫ ফলাফলকে প্রশংসনীয় বলেও উল্লেখ করেন।

শতভাগ জিপিএ-৫, তবু প্রশ্ন শিক্ষার্থী বাছাই নিয়ে

২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের ৩৮২ পরীক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ পাওয়াকে নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে একই সময়ে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত ৬০১ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২১৯ জনের প্রতিষ্ঠানটি থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানটি থেকে টিসি নিয়ে অন্য স্কুলে পরীক্ষা দেওয়া শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জিপিএ-৫ পাওয়ায় শিক্ষার্থী বাছাইয়ের অভিযোগটি আরও গুরুত্ব পেয়েছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, টেস্ট পরীক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর দুর্বলতা শনাক্ত করে চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য তাকে প্রস্তুত করা। পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের বাদ দেওয়া হলে তাদের শিক্ষাজীবন ও মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তাই নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের শতভাগ জিপিএ-৫ অর্জনের পাশাপাশি শিক্ষার্থী বাছাই ও ফরম পূরণের পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ম অনুযায়ী হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। অভিযোগ ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য—দুই পক্ষের তথ্য যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে বিষয়টির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD