Logo

সিরাজগঞ্জের ১০৫৬ বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
সিরাজগঞ্জ
১৩ আগস্ট, ২০২৬, ১৯:৪২
সিরাজগঞ্জের ১০৫৬ বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক
ছবি: সংগৃহীত

সিরাজগঞ্জের নয়টি উপজেলায় ১ হাজার ৫৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। জেলার মোট ১ হাজার ৬৭১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৩ শতাংশের বেশি প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। একই সঙ্গে সহকারী শিক্ষক পদেও বড় ধরনের ঘাটতি থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি নিয়মিত পাঠদানও ব্যাহত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

কোন উপজেলায় কত বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই

জেলার নয়টি উপজেলার মধ্যে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলায় ২৪৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৪০টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। তাড়াশে ৯৭টি, রায়গঞ্জে ১১৩টি, কামারখন্দে ৩১টি, শাহজাদপুরে ১৫৫টি, কাজীপুরে ১৫৯টি, বেলকুচিতে ১০৩টি, চৌহালীতে ৯০টি এবং উল্লাপাড়ায় ২৭৮টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৬৮টিতে প্রধান শিক্ষক নেই।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

ফলে এসব বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের কাউকে কাউকে চলতি বা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অনুমোদিত সহকারী শিক্ষকের পদ রয়েছে ৯ হাজার ৩৭৩টি। এর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ৮ হাজার ৫২৬ জন। অর্থাৎ সহকারী শিক্ষক পদেও ৮৪৭টি শূন্য রয়েছে।

প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক—দুই পর্যায়েই পদ শূন্য থাকায় একদিকে প্রশাসনিক দায়িত্ব বেড়েছে, অন্যদিকে শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের পাঠদানেও চাপ তৈরি হয়েছে।

একই সঙ্গে ক্লাস ও প্রশাসনিক দায়িত্ব

বিজ্ঞাপন

রায়গঞ্জ উপজেলার কয়ড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে বিদ্যালয়টি সরব। বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চলছে। কোনো শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করছেন, আবার কেউ দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত।

বিদ্যালয়টির জ্যেষ্ঠ শিক্ষক আশরাফুল আলম ২০১৯ সাল থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। তার ভাষ্য, প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের কারণে আগের তুলনায় শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময় কমে গেছে।

একই উপজেলার চরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ফিরোজ মাহমুদ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন।

বিজ্ঞাপন

বিদ্যালয়টির শিক্ষকদের মতে, শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষক এমনিতেই কম। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষক না থাকায় একজন শিক্ষককে একই সঙ্গে পাঠদান ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।

শিক্ষার্থীদেরও ভোগান্তি

প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ের নানা কার্যক্রমে সমস্যা হচ্ছে বলে জানায় শিক্ষার্থীরা। রায়গঞ্জের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মারুফ শেখ জানায়, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। সীমিতসংখ্যক শিক্ষককে একাধিক শ্রেণির পাঠদান সামলাতে হচ্ছে। ফলে বিদ্যালয়ের সার্বিক বিষয়গুলো দেখভালের জন্য আলাদা কেউ থাকছেন না।

বিজ্ঞাপন

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সাকিব হোসেনের অভিযোগ, কখনো কখনো একজন শিক্ষককে একই সময়ে দুটি শ্রেণিতে পাঠদান করতে হয়। আবার একটি শ্রেণির পাঠ শেষ হওয়ার আগেই অন্য শ্রেণিতে যেতে হয় শিক্ষককে।

অভিভাবকদের উদ্বেগ

অভিভাবকরাও বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, প্রধান শিক্ষক শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন না; বিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম, শিক্ষক তদারকি, নথিপত্র সংরক্ষণ এবং অভিভাবক ও শিক্ষা বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

জালাল উদ্দিন নামে এক অভিভাবক বলেন, প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকলে একজন সহকারী শিক্ষককে অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব নিতে হয়। এতে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক সংখ্যা কমে যায় এবং স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হয়।

বিজ্ঞাপন

আরেক অভিভাবক সিমা খাতুন জানান, শিক্ষকস্বল্পতার কারণে তার সন্তান পড়াশোনায় প্রয়োজনীয় মনোযোগ পাচ্ছে না। পরিস্থিতির কারণে তাকে আলাদাভাবে পড়ানোর ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। এমনকি সন্তানকে অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করার বিষয়টিও বিবেচনা করছেন তিনি।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের বাড়তি চাপ

রায়গঞ্জ উপজেলার চরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক ফিরোজ মাহমুদ ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন।

বিজ্ঞাপন

বিদ্যালয়টিতে মোট শিক্ষার্থী ১৩৩ জন। প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য হওয়ার পাশাপাশি ওই সময়ে আরও দুইজন সহকারী শিক্ষক অবসরে যান। বর্তমানে বিদ্যালয়ে মোট তিনজন শিক্ষক রয়েছেন, যার মধ্যে একজন প্রেষণে কর্মরত।

ফিরোজ মাহমুদের ভাষ্য, পাঠদানের পাশাপাশি তাকে প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজ করতে হচ্ছে। শিক্ষা কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ, মাসিক সভায় অংশগ্রহণ, শিক্ষক ও পাঠদান তদারকি এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সরবরাহের মতো দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে তাকে। ফলে একজন শিক্ষককে একসঙ্গে একাধিক দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে।

শিক্ষার মান নিয়েও শঙ্কা

বিজ্ঞাপন

ব্রহ্মগাছা ইউনিয়নের চাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রুবেল আহমেদের মতে, একটি বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব ও একাডেমিক ব্যবস্থাপনায় প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পদটি দীর্ঘদিন শূন্য থাকলে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে ঘাটতি তৈরি হয়।

তার মতে, প্রধান শিক্ষক থাকলে প্রশাসনিক দায়িত্ব, শিক্ষক তদারকি ও পাঠদান—সবকিছু সমন্বয় করে পরিচালনা করা সম্ভব হয়। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে থাকা শিক্ষককে একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও দাপ্তরিক কাজ করতে হওয়ায় উভয় ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ে।

বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, দীর্ঘস্থায়ী শিক্ষক সংকট প্রাথমিক শিক্ষার মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শফিকুল ইসলামের মতে, শিক্ষকস্বল্পতা, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সীমিত যোগাযোগ এবং অবকাঠামোগত নানা সমস্যার কারণে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা এমনিতেই চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এর সঙ্গে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক সংকট যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।

তার মতে, বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীরাই শিক্ষকস্বল্পতার কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের বাড়তি সহায়তা দেওয়ার সুযোগও কমে যায়।

নিয়োগ জটিলতায় দীর্ঘ হচ্ছে সংকট

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলার এক উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, মামলা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পদগুলো পূরণ করা যাচ্ছে না। নিয়োগ পরীক্ষার দীর্ঘসূত্রতাও সংকট বাড়াচ্ছে।

আরও পড়ুন

তার মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের শিখন-ঘাটতি আগে থেকেই উদ্বেগের বিষয়। এর সঙ্গে শিক্ষক সংকট যুক্ত হলে পরবর্তী শ্রেণিতে ওঠার সময় শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা আরও বাড়তে পারে।

দ্রুত পদ পূরণের উদ্যোগ

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাহাব উদ্দিন জানিয়েছেন, শুধু প্রধান শিক্ষক নয়, জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ৮৪৭টি সহকারী শিক্ষক পদও শূন্য রয়েছে।

তিনি বলেন, শূন্য পদগুলো পূরণের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। অধিদপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া গেলে শূন্য পদ পূরণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও অভিভাবকদের দাবি, বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখা এবং শিক্ষার্থীদের মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করতে দ্রুত প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদগুলো পূরণ করা প্রয়োজন।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD