Logo

ডিসির দেওয়া পড়ায় স্কুলের একমাত্র জিপিএ-৫ জয়ী সাদিয়া

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
দিনাজপুর
১৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:২১
ডিসির দেওয়া পড়ায় স্কুলের একমাত্র জিপিএ-৫ জয়ী সাদিয়া
ছবি: সংগৃহীত

অভাবের সংসারে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অনিশ্চয়তা ছিল। আর্থিক সহায়তার আশায় এক বছর আগে মাকে সঙ্গে নিয়ে দিনাজপুরের জেলা প্রশাসকের কাছে গিয়েছিল দশম শ্রেণির ছাত্রী সাদিয়া আফরিন। তবে জেলা প্রশাসক তাকে সরাসরি অর্থ সহায়তা না দিয়ে দিয়েছিলেন পড়ার দায়িত্ব। নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন পড়াশোনার রুটিন। সেই নির্দেশনা মেনে নিয়মিত পড়াশোনা করে এক বছর পর এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সাদিয়া।

বিজ্ঞাপন

সাদিয়া আফরিন দিনাজপুর সদর উপজেলার ৬ নম্বর আউলিয়াপুর ইউনিয়নের মাসিমপুর সরকারপাড়ার মিলশ্রমিক সেলিম ও গৃহবধূ আরফা বেগমের তিন সন্তানের মধ্যে বড়। সে পুলহাট কাদের বকস মেমোরিয়াল কলেজিয়েট হাই স্কুলের শিক্ষার্থী।

এবারের এসএসসি পরীক্ষায় ওই বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান, মানবিক ও অন্যান্য বিভাগ মিলিয়ে ৪৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ২২ জন পাস করেছে। তবে পুরো বিদ্যালয়ে একমাত্র সাদিয়া আফরিনই জিপিএ-৫ অর্জন করেছে।

আর্থিক সহায়তার বদলে পড়ার দায়িত্ব

বিজ্ঞাপন

পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন সাদিয়ার মা আরফা বেগম। গত বছরের জুলাইয়ে তিনি মেয়ের পড়াশোনার জন্য আর্থিক সহযোগিতা চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এরপর গণশুনানিতে সাদিয়াকে সঙ্গে নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান তিনি। সেখানে জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম সাদিয়ার সঙ্গে পড়াশোনা নিয়ে কথা বলেন এবং নানা প্রশ্ন করেন। প্রথম সাক্ষাতে অনেক প্রশ্নের উত্তর ঠিকভাবে দিতে না পারলেও সাদিয়ার আত্মবিশ্বাস ও মেধার সম্ভাবনা বুঝতে পারেন তিনি।

তাই সেদিন সরাসরি আর্থিক সহযোগিতা না দিয়ে সাদিয়াকে নিয়মিত পড়াশোনার দায়িত্ব দেন। প্রতি সপ্তাহে বুধবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এসে আগের সপ্তাহের পড়া জমা দিতে এবং নতুন পড়া নিয়ে যেতে বলা হয়।

বিজ্ঞাপন

নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয় পড়ার রুটিন

জেলা প্রশাসক সাদিয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট রুটিনও ঠিক করে দেন। রাতে দুই ঘণ্টা এবং ভোরে দুই ঘণ্টা পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। রাত ১০টার মধ্যে ঘুমাতে এবং ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠতে বলা হয়। বিকেলে এক ঘণ্টা খেলাধুলার সময়ও রাখা হয়।

বিদ্যালয়ে ক্লাস থাকুক বা না থাকুক, প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়। এই রুটিন নিয়মিত অনুসরণ করতে পারলে কয়েক মাস পর আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। তবে এর পরের মাসেই সাদিয়াকে সাত হাজার টাকা সহায়তা করা হয়।

বিজ্ঞাপন

এরপর প্রায় এক বছর ধরে প্রতি বুধবার সকালে মাকে সঙ্গে নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যেত সাদিয়া। সেখানে আগের সপ্তাহের দেওয়া পড়া জমা দিয়ে নতুন পড়া নিয়ে এরপর স্কুলে ক্লাস করত।

ছোট ঘরে বড় স্বপ্ন

সাদিয়ার পরিবারের আর্থিক অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। মাত্র দুই শতক জায়গার ওপর টিনের তৈরি ছোট একটি ঘরেই পরিবারের বসবাস। ঘরের মাঝখানে পুরোনো কাপড় পর্দার মতো টানিয়ে দুই ভাগ করা হয়েছে। এক অংশে সাদিয়া ও তার মেজ বোন থাকেন। অন্য অংশে থাকেন বাবা-মা ও ছোট বোন।

বিজ্ঞাপন

সাদিয়ার পড়ার জন্য আলাদা টেবিল-চেয়ারও নেই। কখনো বিছানায়, কখনো মেঝেতে বসেই পড়াশোনা করতে হয় তাকে। এই প্রতিকূলতার মধ্যেও নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে গেছে সে।

জিপিএ-৫ পেয়ে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন

নিজের সাফল্যে আনন্দিত সাদিয়া আফরিন। সে জানায়, জেলা প্রশাসক যেভাবে পড়াশোনা করতে বলেছেন, সে সেভাবেই নিয়ম মেনে পড়েছে। এখন ভবিষ্যতে পড়াশোনা করে চিকিৎসক হতে চায় সে।

বিজ্ঞাপন

সাদিয়ার বাবা সেলিম বলেন, তাঁর মেয়ে ছোটবেলা থেকেই মেধাবী। কিন্তু মিলের কর্মচারী হিসেবে তাঁর সীমিত আয় এবং স্ত্রীর সেলাইয়ের কাজ থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে তিন সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালানো কঠিন। মেয়ের জিপিএ-৫ অর্জনে তাঁরা অত্যন্ত আনন্দিত হলেও সামনে উচ্চশিক্ষার খরচ কীভাবে বহন করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

তিনি জানান, সাদিয়া চিকিৎসক হতে চায়। কিন্তু মেয়ের স্বপ্ন পূরণে পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সাদিয়ার মা আরফা বেগম বলেন, সংসারের আয় দিয়ে নিত্যদিনের খরচ চালানোই কঠিন। অসুস্থতার সময় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছিল। তখন মেয়ের পড়াশোনার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে গিয়েছিলেন তিনি। জেলা প্রশাসক অর্থের পাশাপাশি পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ ও নিয়মিত রুটিন মেনে চলার যে নির্দেশনা দিয়েছিলেন, সাদিয়া তা মেনে চলেছে।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষকরাও গর্বিত

সাদিয়ার সাফল্যে তার স্কুলের শিক্ষক, সহপাঠী ও এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দ বিরাজ করছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মকসেদ আলী বলেন, সাদিয়া অত্যন্ত মেধাবী ও নিয়মিত ছাত্রী। প্রতি বুধবার সকালে সে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে পড়া জমা দিয়ে নতুন পড়া নিয়ে আসত। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্কুলে উপস্থিত হয়ে ক্লাস করত।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি জানান, বিদ্যালয় থেকে একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়ায় সাদিয়ার সাফল্যে শিক্ষকরা গর্বিত।

বিজ্ঞাপন

‘তার মেধা বিকাশে সহযোগিতা করেছি’

সাদিয়ার ফলাফলে অভিনন্দন জানিয়েছেন দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রথম দিন সাদিয়ার সঙ্গে কথা বলেই তার মধ্যে মেধার সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন। সেই মেধাকে কাজে লাগাতে পড়াশোনার কৌশল ও নিয়মিত অনুশীলনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

জেলা প্রশাসকের ভাষ্য, সাদিয়া নিজের প্রতিভার যথাযথ প্রয়োগ করেছে এবং এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে তার সেই পরিশ্রমের স্বাক্ষর রেখেছে।

এক বছর ধরে নিয়মিত পড়াশোনা, নির্ধারিত রুটিন অনুসরণ এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও হাল না ছাড়ার ফল হিসেবে সাদিয়ার এই সাফল্য এখন তার পরিবার ও বিদ্যালয়ের জন্য আনন্দের কারণ। তবে জিপিএ-৫ অর্জনের পর নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে—উচ্চশিক্ষার পথ ধরে তার চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন কতটা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে, সেটিই এখন পরিবারের প্রধান চিন্তা।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD