শিক্ষাক্রমে সুফিবাদ অন্তর্ভুক্তির দাবি সুফিবাদ গবেষণা ফাউন্ডেশনের

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তকে সুফিবাদ বিষয়ক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে সুফিবাদ গবেষণা ফাউন্ডেশন। সংগঠনটির ১১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা ও আধ্যাত্মিক চেতনা বিকাশে সুফিবাদের শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শান্তি, সম্প্রীতি এবং আত্মশুদ্ধির বার্তা ছড়াতে পাঠ্যসূচিতে অবিলম্বে সুফিবাদ যুক্ত করা প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ‘সুফিবাদ বিষয়ক শিক্ষা জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তকে প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত করে পাঠদান’ শীর্ষক আলোচনা সভায় শিক্ষা ব্যবস্থায় সুফিবাদ বিষয়ক পাঠ অন্তর্ভুক্তির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন বক্তারা।
সভায় সভাপতির স্বাগত বক্তব্যে সুফিবাদ গবেষণা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সুফি মোবারক হোসেন মুরাদ শিক্ষাক্রমে সুফিবাদ অন্তর্ভুক্তির জোর দাবি জানান।
তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনে সুফিবাদের শিক্ষা অত্যন্ত জরুরি। মানবিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা ও আধ্যাত্মিক চেতনা বিকাশে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শান্তি, সম্প্রীতি ও আত্মশুদ্ধির বার্তা ছড়িয়ে দিতে পাঠ্যসূচিতে অবিলম্বে সুফিবাদ যুক্ত করা প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান এবং সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আবদুর রহমান মিয়াজী।
বক্তব্যে তিনি দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার ও পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। যুগের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি যুগোপযোগী ও নৈতিকতাভিত্তিক শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিশেষ আবেদন জানান।
ড. আবদুর রহমান মিয়াজী বলেন, মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে, যা শিক্ষার্থীদের দক্ষ, মানবিক ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে। এ সময় তিনি সুফিবাদের মূলধারা ও এর মানবিক দর্শনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
বিজ্ঞাপন
প্রধান আলোচক ছিলেন বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ও কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জাকির হোসেন।
তিনি সুফি কবি কাজী নজরুল ইসলামের আধ্যাত্মিক দর্শনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, নজরুল কেবল সাম্য ও বিদ্রোহের কবি ছিলেন না; তাঁর সৃষ্টিজুড়ে ছিল গভীর আধ্যাত্মিকতা ও সুফিবাদের প্রভাব। নজরুলের ইসলামী গান, গজল ও শ্যামাসংগীতের অন্তরালে পরম সত্তার প্রতি যে আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে, তা সুফি দর্শনেরই বহিঃপ্রকাশ।
জাকির হোসেন বলেন, কবি মানুষের ভেতরের খোদা বা ঐশ্বরিক শক্তিকে জাগ্রত করতে চেয়েছেন। ধর্মের বাহ্যিক আচার-সর্বস্বতার ঊর্ধ্বে উঠে হৃদয়ের পবিত্রতা ও মানবতার মাধ্যমে স্রষ্টাকে খোঁজার যে বার্তা নজরুল দিয়েছেন, সেটিই তাঁর আধ্যাত্মিকতার মূল ভিত্তি। এই আধ্যাত্মিক চেতনা নজরুলকে সংকীর্ণতামুক্ত ও উদার অসাম্প্রদায়িক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিল, যা বর্তমান সমাজেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
মুখ্য আলোচক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আহসানুল হাদি সুফিবাদের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সুফিবাদ কোনো আকস্মিক বা হঠাৎ তৈরি হওয়া ধারণা নয়; ইসলামের ইতিহাসের শুরু থেকেই এর গভীর ভিত্তি রয়েছে।
আলোচনায় সুফিবাদের অন্যতম ঐতিহাসিক উৎস হিসেবে ইসলামের প্রাথমিক যুগের ‘আসহাবে সুফ্ফা’ বা সুফ্ফাবাসীদের কথা উল্লেখ করেন তিনি। ড. আহসানুল হাদি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে মদিনার মসজিদে নববীর একটি নির্দিষ্ট চত্বরে সুফ্ফায় যেসব ত্যাগী সাহাবি জিকির ও ইলম চর্চায় মগ্ন থাকতেন, তাঁদের আধ্যাত্মিক জীবনধারা ও আত্মশুদ্ধির প্রয়াস পরবর্তী সময়ে সুফিবাদের প্রেরণা ও উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ইসলামের মৌলিক আদর্শ ও নবীজির সাহাবিদের জীবনচর্যার ধারাবাহিকতায় সুফিবাদের বিকাশ ঘটেছে। এটি আকস্মিকভাবে সৃষ্টি হয়নি।
বিজ্ঞাপন
উদ্বোধনী বক্তব্যে বকশীবাজার দরবার শরীফের গদ্দিনশীন পীর শাহসুফি সাঈদ আনোয়ার মোবারকী আলকাদরী বলেন, সুফিবাদ কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের আত্মিক শুদ্ধি, মহব্বত ও পরমতসহিষ্ণুতার শিক্ষা দেয়। সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় সুফি দর্শনের চর্চা বাড়ানো প্রয়োজন।
বর্তমান অস্থির সময়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই মানবিক চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন কাজী নজরুল সুফি সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক, নজরুল গবেষক ও দৈনিক নিরপেক্ষের যুগ্ম সম্পাদক মুহাম্মদ আতা উল্লাহ খান, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র লেকচারার গাজী নাফিস আহমেদ, সোনার বাংলা সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশনের সভাপতি শেখ মোহাম্মদ শাহ কামাল শ্যামল, শাহসুফি ফিরোজ চিশতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক মুহাম্মদ আব্দুল মুহিত, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক ড. আব্দুল মোমেন, সংগঠনের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হানিফ নাহিদ এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাদিম লাবিবসহ অনেকে।
বিজ্ঞাপন
সুফিবাদ গবেষণা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সুফি মোবারক হোসেন মুরাদের সভাপতিত্বে সভা পরিচালনা করেন সংগঠনের সদস্য সচিব আলহাজ মোজাফফর আহমেদ।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনায় বক্তারা সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজার ও দরগাহে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, এ ধরনের ঘটনা সমাজে অস্থিরতা ও বিভাজন তৈরি করছে। বক্তারা আরও বলেন, বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে পীর-আউলিয়াদের ভূমিকা রয়েছে।
তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা, অসহিষ্ণুতা ও বিভাজন কমিয়ে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে সুফিবাদের শিক্ষা সহায়ক হতে পারে বলেও মত দেন তারা। এ কারণে জাতীয় শিক্ষাক্রমে সুফিবাদ বিষয়ক পাঠ অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে দাবি করেন বক্তারা।
বিজ্ঞাপন
আলোচনা সভা শেষে মিলাদ, দোয়া ও তাবারুক বিতরণের মধ্য দিয়ে সুফিবাদ গবেষণা ফাউন্ডেশনের ১১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজন শেষ হয়।








