অনুমোদনের এক বছরেও অনুদান পাননি ১৬৯০ ইবতেদায়ী শিক্ষক

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও সরকারি অনুদান পাননি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শূন্য পদে নিয়োগ পাওয়া ১ হাজার ৬৯০ জন শিক্ষক। অনুদান চালু না হওয়ায় আর্থিক সংকটে পড়েছেন তাঁরা। পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ, বাড়িভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেক শিক্ষক। তাঁদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও অনুদান ছাড়ে কার্যকর অগ্রগতি হয়নি।
বিজ্ঞাপন
তবে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর জানিয়েছে, অনুমোদিত তালিকা নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর যাচাই-বাছাই করে নতুন তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তালিকাটি চূড়ান্ত করতে আগামী সপ্তাহে সভা করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নভেম্বরের মধ্যে শিক্ষকদের অনুদান দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মুহাম্মদ শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘প্রার্থীরা আমার কাছে এসেছিলেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পরও কেন তাদের অনুদান ছাড় হয়নি, তা খতিয়ে দেখা হবে। সরকারি ছুটি শেষে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব। যারা প্রাপ্য তাদের অনুদান দ্রুত সময়ের মধ্যে ছাড়ের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
অনুদানবঞ্চিত শিক্ষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের কোডপ্রাপ্ত প্রায় ৯ হাজার স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার মধ্যে ১ হাজার ৫১৯টি প্রতিষ্ঠান সরকারি অনুদান পায়। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক মাসে ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং সহকারী শিক্ষক ৩ হাজার ৩০০ টাকা করে অনুদান পান। প্রতি প্রতিষ্ঠানে চারজন শিক্ষক ধরে অনুদানপ্রাপ্ত শিক্ষকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬ হাজার ৭৬ জন।
১৯৯৪ সালে অনুদান কার্যক্রম চালুর পর মৃত্যু, অবসর, পদত্যাগ ও বহিষ্কারসহ বিভিন্ন কারণে অনেক শিক্ষকের পদ শূন্য হয়। ২০২৩ সালে ৫৬টি জেলার ১ হাজার ৮৫০টি শূন্য পদ পূরণ করা হয়। তবে বাকি আট জেলায় দীর্ঘদিনেও শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এতে আরও ১ হাজার ৬৯০টি শূন্য পদের শিক্ষকের তথ্য পায় মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর।
অধিদপ্তরের সাত সদস্যের কমিটি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাঁচ সদস্যের কমিটির প্রক্রিয়া শেষে এসব শিক্ষককে অনুদান দেওয়ার বিষয়ে ২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর আদেশ জারি করা হয়। কিন্তু অনুমোদনের পরও অনুদান চালু না হওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।
শিক্ষকদের ভাষ্য, মাসে ৩ হাজার ৩০০ বা ৩ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে পরিবারের সব ব্যয় মেটানো সম্ভব নয়। তবে চাল-ডাল কেনা, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ কিংবা চিকিৎসার মতো জরুরি প্রয়োজনে এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এই সহায়তা না পাওয়ায় তাঁদের আর্থিক দুরবস্থা আরও বেড়েছে।
বিজ্ঞাপন
অনেক শিক্ষক অন্য কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস ছাড়াই শিক্ষকতা করছেন বলে দাবি করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা, সন্তানদের শিক্ষার ব্যয়, অসুস্থ স্বজনের চিকিৎসা ও ধারদেনা পরিশোধ করতে গিয়ে নিয়মিত সংকটে পড়তে হচ্ছে। একদিকে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন, অন্যদিকে পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণের সংগ্রাম—দুই চাপ সামলাতে হচ্ছে তাঁদের। অনুদান পাওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা জাতীয় শিক্ষক ঐক্যফ্রন্টের মহাসচিব মো. রেজাউল হক বলেন, ‘নিয়োগ বা তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কিছু অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করা যেতে পারে। যেসব ক্ষেত্রে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেসব ক্ষেত্রে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু অভিযোগের কারণে যাদের নিয়োগ ও কাগজপত্র বৈধ, তাদেরও অনির্দিষ্টকাল অনুদানের বাইরে রাখা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়।’
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
অনুদানবঞ্চিত শিক্ষকদের অভিযোগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কার্যকর উদ্যোগের অভাবে বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। মহাপরিচালকের ইতিবাচক মনোভাব থাকলেও অনুদান ছাড়ে গড়িমসি করা হচ্ছে বলে দাবি তাঁদের।
শিক্ষকদের মতে, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া এবং অভিযোগগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি করা হলে এত দীর্ঘ সময় ধরে অনুদান আটকে থাকার কথা নয়।
বিজ্ঞাপন
স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা জাতীয় শিক্ষক ঐক্যফ্রন্টের যুগ্ম মহাসচিব মো. মনিরুজ্জামান বলেন, বিষয়টি শুধু অনুদানের অর্থ ছাড়ের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; এর সঙ্গে ১ হাজার ৬৯০টি পরিবারের জীবিকা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা জড়িত। প্রকৃত যোগ্য শিক্ষকদের অনুদান চালু করে তাঁদের পরিবারগুলোকে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
এ বিষয়ে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মুহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন খান বলেন, ‘১৬৯০ জনের যে তালিকা করা হয়েছিল তা নিয়ে অভিযোগ ছিল। অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিষয়টি তদন্ত করে কিছু শিক্ষককে তালিকা বাদ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আগামী সপ্তাহে সভা করে তালিকা চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে।’
তিনি আরও জানান, নভেম্বর মাসের মধ্যে শিক্ষকদের অনুদান দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।








