Logo

ভারত কেন বছরের পর বছর আটকে রেখেছে ‘সতলুজ’ সিনেমার মুক্তি?

profile picture
বিনোদন ডেস্ক
১১ জুলাই, ২০২৬, ১৮:১৭
ভারত কেন বছরের পর বছর আটকে রেখেছে ‘সতলুজ’ সিনেমার মুক্তি?
ছবি: সংগৃহীত

ভারতে চলচ্চিত্র সেন্সরশিপ নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে জনপ্রিয় অভিনেতা দিলজিৎ দোসাঞ্জ অভিনীত চলচ্চিত্র ‘সতলুজ’। দীর্ঘ কয়েক বছর সেন্সর বোর্ডের অনুমোদন না পাওয়ার পর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পরিকল্পনা বাতিল করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করা হলেও মাত্র দুই দিনের মধ্যে ভারত থেকে সেটি সরিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনাকে ঘিরে চলচ্চিত্র অঙ্গন, মানবাধিকারকর্মী ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

চলচ্চিত্রটির কাহিনি আবর্তিত হয়েছে ভারতের পাঞ্জাবে আশির ও নব্বইয়ের দশকের রাজনৈতিক সহিংসতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। নির্মাতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় এক বছর ধরে চলচ্চিত্রটির শুটিং ও নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলেও সেন্সর অনুমোদন পেতে কয়েক বছর ধরে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়।

প্রথমদিকে চলচ্চিত্রটির নাম ছিল ‘পাঞ্জাব ’৯৫’। পরে সেন্সর বোর্ডের আপত্তির পর নাম পরিবর্তন করে ‘সতলুজ’ রাখা হয়। তবুও অনুমোদনের জট কাটেনি। নির্মাতারা আদালতের দ্বারস্থ হলেও কাঙ্ক্ষিত সমাধান না পেয়ে শেষ পর্যন্ত প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এরপর গত সপ্তাহে একটি অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে চলচ্চিত্রটি প্রকাশ করা হয়। কিন্তু মুক্তির মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্ল্যাটফর্মটি ভারতীয় দর্শকদের জন্য সিনেমাটি সরিয়ে দেয়। সংস্থাটি সংক্ষিপ্ত এক বিবৃতিতে জানায়, ‘বর্তমান পরিস্থিতির’ কারণে ভারতে ছবিটি আর প্রদর্শন করা হচ্ছে না। যদিও ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। তবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ এবং রাষ্ট্রবিরোধী গোষ্ঠী এটি ব্যবহার করতে পারে— এমন আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ নেয়।

বিজ্ঞাপন

চলচ্চিত্রটির মূল চরিত্র মানবাধিকারকর্মী জস্বন্ত সিং খালরার জীবন ও কর্মকাণ্ড থেকে অনুপ্রাণিত। তিনি পাঞ্জাবে বিচ্ছিন্নতাবাদবিরোধী অভিযানের সময় হাজারো মানুষের নিখোঁজ হওয়া ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছিলেন। পরে তাকেও অপহরণ ও হত্যার শিকার হতে হয় বলে বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

নির্মাতাদের অভিযোগ, সেন্সর বোর্ড শুধু কয়েকটি দৃশ্য নয়, বরং পুরো চলচ্চিত্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিবর্তনের দাবি জানায়। তাদের দাবি অনুযায়ী, মোট ১২৭টি পরিবর্তন বা কাটছাঁটের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

এসব পরিবর্তনের মধ্যে ছিল চলচ্চিত্রের নাম বদলানো, প্রধান চরিত্রের পরিচয় কাল্পনিক করে দেওয়া, পাঞ্জাবের নাম উল্লেখ না করা, ভারতের জাতীয় পতাকা সংক্রান্ত দৃশ্য বাদ দেওয়া এবং তৎকালীন রাজনৈতিক ঘটনাবলির উল্লেখ মুছে ফেলার মতো বিষয়ও।

বিজ্ঞাপন

পরিচালক হানি ত্রেহান এক সাক্ষাৎকারে বলেন, প্রতিবার সংশোধন করার পরও নতুন নতুন আপত্তি জানানো হয়েছে। একপর্যায়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে, মনে হচ্ছিল কর্তৃপক্ষই যেন পুরো চিত্রনাট্য লিখে দিতে চায়।

ভারতের সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবী নাভরোজ সীরভাইয়ের মতে, এমন পরিস্থিতি শুধু একটি চলচ্চিত্রের জন্য নয়, বরং পুরো চলচ্চিত্রশিল্পের জন্য উদ্বেগজনক। তার ভাষায়, নির্মাতাদের কাছে এটি এমন একটি বার্তা যে, তারা যত বিনিয়োগই করুন না কেন, শেষ সিদ্ধান্ত কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকবে।

চলচ্চিত্রটি সরিয়ে নেওয়ার পরও বিতর্ক থেমে থাকেনি। বরং বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে অননুমোদিত কপি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। পাঞ্জাবের বিভিন্ন গ্রাম ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও স্থানীয়ভাবে চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনের খবর প্রকাশিত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এ প্রসঙ্গে দিলজিৎ দোসাঞ্জ ভক্তদের উদ্দেশে এক ভিডিও বার্তায় বলেন, একটি গল্পকে যত বেশি থামানোর চেষ্টা করা হয়, সেটি তত বেশি মানুষের আলোচনায় চলে আসে। তার মতে, ছবির মূল বার্তা ইতোমধ্যেই মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

চলচ্চিত্রটির বাজেট প্রায় ৪৫ লাখ মার্কিন ডলার বলে আদালতে জমা দেওয়া নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এত বড় বিনিয়োগের পরও দীর্ঘ সেন্সর প্রক্রিয়া এবং শেষ পর্যন্ত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকেও সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় নির্মাতারা আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে রাজনৈতিক, মানবাধিকার, জাতিগত বৈষম্য, পুলিশি নির্যাতন কিংবা রাষ্ট্রীয় নীতির সমালোচনামূলক বিষয় নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো সেন্সর জটিলতায় বেশি পড়ছে। অন্যদিকে সরকারপন্থী বা জাতীয়তাবাদী বার্তাধর্মী চলচ্চিত্র তুলনামূলকভাবে সহজে অনুমোদন পাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সরকারি সমর্থনও অর্জন করছে।

বিজ্ঞাপন

চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অভিযোগ, সেন্সর প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার অভাব, মৌখিক নির্দেশনা, দীর্ঘসূত্রতা এবং বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক চাপের কারণে সৃজনশীল স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে। অনেক প্রযোজক ও পরিচালক বিতর্ক এড়াতে শুরু থেকেই সংবেদনশীল বিষয় বাদ দিয়ে চিত্রনাট্য তৈরি করছেন, যা শিল্পের স্বাধীন বিকাশের জন্য ইতিবাচক নয়।

অন্যদিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন মহল বলছে, শিল্প, ইতিহাস ও মানবাধিকারভিত্তিক বিষয় নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রকে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে রেখে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তাদের মতে, সেন্সর প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা হলে চলচ্চিত্রশিল্প যেমন উপকৃত হবে, তেমনি দর্শকরাও বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি জানার সুযোগ পাবেন।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD