গোপনে মুক্তি পেয়েও সরকারি চাপে গায়েব নিষিদ্ধ সিনেমা!

দীর্ঘ চার বছরের সেন্সর জটিলতা, একাধিকবার নাম পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকে সরে দাঁড়ানো এবং শেষ পর্যন্ত ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তির মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মাথায় ভারতে প্রত্যাহার—দিলজিৎ দোসাঞ্জ অভিনীত ‘সতলুজ’-এর যাত্রাপথ এখন ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। চলচ্চিত্রটি সরিয়ে নেওয়ার পেছনে সরকারি চাপ ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে, যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম জি৫।
বিজ্ঞাপন
গত ৩ জুলাই কোনো ধরনের প্রচারণা ছাড়াই জি৫-এ মুক্তি পায় ‘সতলুজ’। তবে মুক্তির দুই দিনের মাথায়, ৫ জুলাই, প্ল্যাটফর্মটি জানায় ‘বর্তমান পরিস্থিতির’ কারণে ভারতে ছবিটি অনির্দিষ্টকালের জন্য সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যদিও একই সময়ে ভারতের বাইরে জি৫ গ্লোবালে ছবিটি দেখা যাচ্ছিল। এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন ওঠে, বৈধভাবে মুক্তি পাওয়ার পরও কেন হঠাৎ সিনেমাটি প্রত্যাহার করা হলো।
তিনবার বদলেছে সিনেমার নাম
চলচ্চিত্রটির প্রথম নাম ছিল ‘ঘালুঘারা’। শিখ ইতিহাসে বহুল ব্যবহৃত এই শব্দটি গণহত্যার স্মৃতির সঙ্গে জড়িত হওয়ায় শুরু থেকেই নামটি বিতর্কের জন্ম দেয়। পরে সেন্সর বোর্ডের আপত্তির মুখে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘পাঞ্জাব ৯৫’। ওটিটিতে মুক্তির আগে আবারও নাম বদলে রাখা হয় ‘সতলুজ’, যা পাঞ্জাবের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত একটি নদীর নাম।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
পরিচালক হানি ত্রেহান জানান, নাম পরিবর্তন করতে হলেও ছবির মূল গল্প বা বক্তব্যে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।
জসবন্ত সিং খালরার জীবনের অনুপ্রেরণায় নির্মাণ
বিজ্ঞাপন
চলচ্চিত্রটির কাহিনি মানবাধিকারকর্মী জসবন্ত সিং খালরার অনুসন্ধানী কর্মকাণ্ড থেকে অনুপ্রাণিত। ১৯৮০-এর দশকের শেষভাগ ও ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে পাঞ্জাবে নিখোঁজ হওয়া বহু মানুষের ঘটনায় তদন্ত করে তিনি দাবি করেছিলেন, হাজার হাজার অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মরদেহ গোপনে দাহ করা হয়েছে।
১৯৯৫ সালে খালরা অপহৃত হন এবং পরে নিহত হন বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী তদন্তে কয়েকজন পুলিশ সদস্য দোষী সাব্যস্ত হন। নির্মাতাদের দাবি, ছবিটি শুধু একজন ব্যক্তির জীবনী নয়, বরং মানবাধিকার, সত্য অনুসন্ধান এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
দীর্ঘ সেন্সর জটিলতা
বিজ্ঞাপন
২০২২ সালে নির্মাতারা ছবিটি সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশনের (সিবিএফসি) কাছে জমা দিলে প্রথমে ২১টি দৃশ্য ও সংলাপে কাটছাঁটের সুপারিশ করা হয়। পরে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই সংখ্যা ১২৭-এ পৌঁছানোর দাবি ওঠে। যদিও সিবিএফসি আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করেনি।
নির্মাতারা আদালতের দ্বারস্থ হলেও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর মামলা প্রত্যাহার করেন। পরিচালক হানি ত্রেহান ও অভিনেতা দিলজিৎ দোসাঞ্জ দুজনই জানান, অযৌক্তিক কাটছাঁট মেনে নিয়ে ছবির মূল বক্তব্য পরিবর্তন করতে তারা রাজি ছিলেন না।
টরন্টো উৎসবেও প্রদর্শনী বাতিল
বিজ্ঞাপন
২০২৩ সালে ‘পাঞ্জাব ৯৫’ নামে ছবিটি বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে গালা প্রিমিয়ারের জন্য নির্বাচিত হয়েছিল। তবে উৎসব শুরুর আগেই প্রদর্শনী বাতিল হয়ে যায়। আনুষ্ঠানিকভাবে কারণ জানানো না হলেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা ও সেন্সর জটিলতার বিষয়টি আলোচনায় আসে।
কেন সরিয়ে নেওয়া হলো?
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ এবং ২০২১ সালের তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) বিধির আওতায় সরকারের নির্দেশেই জি৫ ভারতে ছবিটি সরিয়ে নেয়। সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, ছবিটি আগে সেন্সর বোর্ডে জমা পড়লেও প্রস্তাবিত কাটছাঁট মানা হয়নি। পরে নতুন নামে ওটিটিতে মুক্তি দেওয়া হলে বিষয়টি সরকারের নজরে আসে।
বিজ্ঞাপন
ভারতে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কনটেন্ট সরাসরি সেন্সর বোর্ডের অধীন নয়। তবে এগুলো তথ্যপ্রযুক্তি (ইন্টারমিডিয়ারি গাইডলাইনস অ্যান্ড ডিজিটাল মিডিয়া এথিকস কোড) রুলস, ২০২১ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। সরকার নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে প্ল্যাটফর্মটিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাইরেসি নিয়ে ভিন্ন অবস্থান
ছবিটি সরিয়ে নেওয়ার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর পাইরেটেড কপি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। জি৫ দর্শকদের অবৈধভাবে সিনেমা না দেখার আহ্বান জানিয়ে জানায়, তারা বৈধ উপায়ে ছবিটি পুনরায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে দিলজিৎ দোসাঞ্জ ইনস্টাগ্রাম লাইভে দর্শকদের উদ্দেশে বলেন, যারা ছবিটি ডাউনলোড করে রেখেছেন, তারা যেন অন্যদেরও দেখার সুযোগ করে দেন। তাঁর মতে, একবার কোনো কনটেন্ট অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে সেটিকে পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা সম্ভব নয়।
আগেই কি আঁচ করেছিলেন দিলজিৎ?
মুক্তির পর এক ইনস্টাগ্রাম লাইভে দিলজিৎ বলেছিলেন, তাঁর ধারণা সোমবারের মধ্যেই ছবিটি সরিয়ে নেওয়া হতে পারে। সে সময় অনেকেই মন্তব্যটিকে রসিকতা হিসেবে নিলেও মাত্র দুই দিনের মধ্যেই ছবিটি ওটিটি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে তিনি সামাজিক মাধ্যমে ছবির একটি দৃশ্য শেয়ার করে লেখেন, ‘খালরার মতোই ছবিটিও বাধার মুখে পড়েছে।’
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়া
ছবিটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে পাঞ্জাবের কয়েকটি রাজনৈতিক দল এবং শিখদের শীর্ষ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান শিরোমণি গুরুদ্বারা প্রবন্ধক কমিটি (এসজিপিসি)। সাবেক রাজ্যসভার সদস্য সাকেত গোখলেও ছবিটি পুনরায় মুক্তির আহ্বান জানিয়ে কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়েছেন।
অন্যদিকে, সিদ্ধান্তের সমর্থকদের যুক্তি—পাঞ্জাবের সহিংস অতীত নিয়ে নির্মিত যেকোনো চলচ্চিত্র অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তাই এ ধরনের বিষয় উপস্থাপনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন।
সমালোচকদের প্রশংসা
যারা ছবিটি প্রত্যাহারের আগে দেখতে পেরেছেন, তাঁদের অনেকেই পরিচালক হানি ত্রেহানের সংযত নির্মাণশৈলী এবং দিলজিৎ দোসাঞ্জের অভিনয়ের প্রশংসা করেছেন। বিভিন্ন পর্যালোচনায় ছবিটিকে কোনো রাজনৈতিক প্রচারণা নয়, বরং মানবাধিকার, সত্য অনুসন্ধান ও ন্যায়বিচারের গল্প হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, ‘সতলুজ’ দিলজিৎ দোসাঞ্জের অভিনয়জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে।








