Logo

৮২ পেরিয়েও অভিনয়ে আবুল হায়াত, ছয় দশকের বর্ণিল পথচলা

profile picture
বিনোদন প্রতিবেদক
৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৮:২৯
৮২ পেরিয়েও অভিনয়ে আবুল হায়াত, ছয় দশকের বর্ণিল পথচলা
ছবি: সংগৃহীত

কর্মই যেন আবুল হায়াতের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়। বয়স ৮২ পেরিয়েছে, অথচ অভিনয়ের ব্যস্ততা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি তিনি। জীবনের প্রায় ছয় দশক কেটেছে অভিনয়ের সঙ্গে। মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র—তিন মাধ্যমেই দীর্ঘ সময় ধরে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন এই বরেণ্য অভিনেতা।

বিজ্ঞাপন

আজ ৭ সেপ্টেম্বর আবুল হায়াতের ৮২তম জন্মদিন। ১৯৪৪ সালের এই দিনে তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মুর্শিদাবাদে জন্ম তার। বিশেষ কোনো আয়োজন নয়, এবারের জন্মদিন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেই কাটানোর পরিকল্পনা করেছেন তিনি।

দিনটি তার জন্য আরও বিশেষ করে তুলেছে নাতনি শ্রীষার জন্মদিনও। শ্রীষা অভিনেতার মেয়ে নাতাশা হায়াতের সন্তান। জন্মদিনে নাতনিকে নিয়ে ঘুরতে বের হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে আবুল হায়াতের। পরিবারের অন্য সদস্যরাও সেই আয়োজনে থাকবেন।

নয় শব্দের নাম, ডাকনাম রবি

বিজ্ঞাপন

পরিচিতি ও জনপ্রিয়তায় তিনি আবুল হায়াত নামেই। তবে তার পুরো নাম বেশ দীর্ঘ—খন্দকার মোহাম্মদ শামসুল আরেফিন আবুল হায়াত গোলাম মাহবুব। বন্ধু ও স্বজনদের কাছে আবার তিনি ‘রবি’ নামেও পরিচিত।

নিজের নামের গল্প বলতে গিয়ে একসময় আবুল হায়াত জানিয়েছিলেন, ‘আমার বংশের টাইটেল খন্দকার। আর আমাদের অধিকাংশের নামের আগেই মোহাম্মদ থাকে; শামসুল আরেফিন আবুল হায়াত হলো মূল নাম। এর সঙ্গে আবার গোলাম মাহবুব লাগিয়েছেন উনি। আর রবি ডাকনামটি আমার বাবার দেওয়া। সময়ের পরিক্রমায় অবশ্য নামের বেশিরভাগ অংশ ঝরে পড়ে গেছে, রবি নামেও এখন বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ছাড়া কেউ ডাকে না।’

প্রকৌশল থেকে অভিনয়ের জগতে

বিজ্ঞাপন

আবুল হায়াতের বাবা ছিলেন রেলওয়ের কর্মকর্তা। দেশভাগের সময় পরিবারের সঙ্গে চট্টগ্রামে চলে আসেন তিনি। চট্টগ্রামেই তার শৈশব, বেড়ে ওঠা ও শিক্ষাজীবনের বড় অংশ কেটেছে।

১৯৬২ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ভর্তি হন আবুল হায়াত। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা শেষ করে যোগ দেন ঢাকা ওয়াসায় প্রকৌশলী হিসেবে।

তবে পরিবারে সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশ থাকায় ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। সেই আগ্রহ থেকেই ষাটের দশকের শেষদিকে অভিনয়ে প্রবেশ। ১৯৬৯ সালে ‘ইডিপাস’ নাটকের মাধ্যমে টেলিভিশন পর্দায় তার প্রথম উপস্থিতি।

বিজ্ঞাপন

এরপর পেরিয়ে গেছে প্রায় ছয় দশক। দীর্ঘ এই সময়ে অভিনয় করেছেন অসংখ্য নাটক, টেলিছবি ও চলচ্চিত্রে। মঞ্চেও রেখেছেন নিজের দক্ষতার ছাপ।

চলচ্চিত্রে বৈচিত্র্যময় উপস্থিতি

আবুল হায়াতের অভিনয়জীবনের চলচ্চিত্রের তালিকাও বেশ সমৃদ্ধ। ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘চরিত্রহীন’, ‘বধূ বিদায়’, ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘বাবা কেন চাকর’, ‘তেজী’, ‘অনন্ত ভালোবাসা’, ‘প্রেমের তাজমহল’, ‘জয়যাত্রা’, ‘রূপকথার গল্প’, ‘গহীনে শব্দ’, ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’, ‘কোটি টাকার প্রেম’, ‘দারুচিনি দ্বীপ’, ‘অজ্ঞাতনামা’, ‘ফাগুন হাওয়ায়’ ও ‘রাত জাগা ফুল’সহ বহু সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

টেলিভিশনে তৈরি করেছেন স্মরণীয় চরিত্র

দেশের জনপ্রিয় ও কালজয়ী টেলিভিশন নাটকের অনেকগুলোতেই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা গেছে তাকে। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘অয়োময়’, ‘বহুব্রীহি’, ‘নক্ষত্রের রাত’, ‘আজ রবিবার’, ‘হাউজফুল’, ‘এফএনএফ’ ও ‘হাউস ৪৪’—এমন অসংখ্য নাটকের সঙ্গে তার অভিনয় স্মরণীয় হয়ে আছে।

তার অভিনয়ের বৈশিষ্ট্য ছিল চরিত্র অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা। ফলে কখনো কঠোর, কখনো আবেগপ্রবণ আবার কখনো সাধারণ মানুষের চরিত্রেও দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

অভিনয়ের পাশাপাশি নির্মাণ ও লেখালেখি

শুধু অভিনয়েই থেমে থাকেননি আবুল হায়াত। নির্মাতা হিসেবেও কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। নির্মাণ করেছেন নাটক ও টেলিছবি।

লেখালেখিতেও রয়েছে তার আলাদা পরিচয়। তার লেখা একাধিক উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। নিজের দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন আত্মজীবনীও।

বিজ্ঞাপন

পরিবারেও শিল্পের আবহ

১৯৭০ সালে বিয়ে করেন আবুল হায়াত। তার বড় মেয়ে বিপাশা হায়াত দেশের পরিচিত অভিনেত্রী, নাট্যকার ও নির্মাতা। ছোট মেয়ে নাতাশা হায়াতও অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

বিপাশা হায়াতের জীবনসঙ্গী গুণী অভিনেতা-নির্মাতা তৌকীর আহমেদ। নাতাশা হায়াতের জীবনসঙ্গী অভিনেতা শাহেদ শরীফ খান। ফলে পরিবারেও অভিনয় ও সংস্কৃতিচর্চার ধারাটি বহমান।

বিজ্ঞাপন

স্বীকৃতিতে সমৃদ্ধ দীর্ঘ ক্যারিয়ার

দীর্ঘ অভিনয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি হিসেবে আবুল হায়াত পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননা। সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য অর্জন করেছেন একুশে পদকও।

৮২ বছর পেরিয়েও অভিনয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক অটুট। বয়স যেখানে অনেকের জন্য অবসরের সময়, আবুল হায়াত সেখানে এখনো নিয়মিত কাজ করে প্রমাণ করে চলেছেন—শিল্পীর জন্য বয়স নয়, কাজের প্রতি ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় শক্তি।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD