Logo

পর্দার বাইরে নানা পাটেকর ছিলেন শুটার ও মানবদরদি

profile picture
বিনোদন ডেস্ক
৮ অক্টোবর, ২০২৬, ২০:০৫
পর্দার বাইরে নানা পাটেকর ছিলেন শুটার ও মানবদরদি
ছবি: সংগৃহীত

পাঁচ দশকের দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নানা পাটেকর নিজেকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। অভিনয়ের পাশাপাশি স্পষ্টবাদী স্বভাব, সাদাসিধে জীবনযাপন এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কারণেও আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছিলেন তিনি। খ্যাতি ও অর্থের হাতছানি থাকলেও বিলাসী জীবনযাপনের প্রতি তার খুব একটা আগ্রহ ছিল না।

বিজ্ঞাপন

তবে পর্দায় শক্তিশালী অভিনয়ের জন্য পরিচিত এই অভিনেতার জীবনের আরও কিছু দিক অনেকেরই অজানা। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি ছিলেন দক্ষ শুটার। কয়েক দশক ধরে রাজ্য ও জাতীয় পর্যায়ের রাইফেল শুটিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন তিনি। শুটিংয়ে দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছিলেন ‘রেনাউন্ড শট’ বা ‘খ্যাতিমান শুটার’-এর মর্যাদাও।

১৯৯১ সালে ‘প্রহার’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে প্রশিক্ষণ নেওয়ার অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তার শুটিং দক্ষতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। অভিনয় ও শুটিংয়ের বাইরে ঘরোয়া জীবনেও নানা ছিলেন একেবারেই সাধারণ মানুষ। নিজের কাজ নিজে করা এবং রান্না করার প্রতি ছিল তার বিশেষ আগ্রহ।

বিশেষ করে রান্না করতে এবং অন্যকে খাওয়াতে খুব ভালোবাসতেন নানা পাটেকর। এমনকি এক সাক্ষাৎকারে নিজের অভিনয়ের চেয়ে রান্নায় বেশি দক্ষতার কথাও মজা করে জানিয়েছিলেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নানা পাটেকর বলেছিলেন, ‘রান্না আমার আরেকটি শখ। মানুষকে খাওয়াতে আমার খুব ভালো লাগে। আমার মনে হয়, আমি অভিনেতার চেয়ে ভালো রাঁধুনি।’

মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রেও নানা পাটেকরের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। মহারাষ্ট্রের লাতুরের কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো, দুস্থ মানুষের চিকিৎসায় সহায়তা এবং বন্যাদুর্গতদের জন্য ত্রাণ দেওয়াসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি। তার উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘নাম ফাউন্ডেশন’ কৃষক ও প্রান্তিক মানুষের কল্যাণেও কাজ করেছে।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নিজের উপার্জনের বড় একটি অংশ নানা পাটেকর জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতেন। এমনকি তার আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত দান করার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে এই ৯০ শতাংশের তথ্যটি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদননির্ভর দাবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

শুটিংয়ের প্রতি তার আগ্রহের গল্পও বেশ ব্যতিক্রমী। ২০১১ সালে ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নানা জানিয়েছিলেন, শুটিং প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনি প্রায়ই প্রধান অতিথি হিসেবে যেতেন। সেখানে বিভিন্ন ধরনের বন্দুক দিয়ে গুলি চালানোর সুযোগ পেতেন। ধীরে ধীরে তার নিশানা আরও নিখুঁত হতে থাকে।

একপর্যায়ে মিনারেল ওয়াটারের বোতলের ছোট ক্যাপের মতো ক্ষুদ্র লক্ষ্যবস্তুতেও নিখুঁতভাবে গুলি করতে পারতেন তিনি।

প্রায় ২০০১ সালের দিকে প্রতিযোগিতামূলক শুটিংয়ে অংশ নেওয়া শুরু করেন নানা পাটেকর। ৫০ মিটার রাইফেল প্রোন এবং ৩০০ মিটার বিগ-বোর ইভেন্টে প্রতিযোগিতা করতেন তিনি। পুনের বালেওয়াড়ি এবং মধ্যপ্রদেশের মহুরসহ বিভিন্ন শুটিং রেঞ্জে নিয়মিত অনুশীলন করতেন।

বিজ্ঞাপন

২০০৪ সালে ইন্দোরের বিএসএফের রেওতি রেঞ্জে অনুষ্ঠিত ৪৮তম জাতীয় শুটিং চ্যাম্পিয়নশিপে ৩০০ মিটার বিগ-বোর ইভেন্টে রুপার পদক জেতেন নানা পাটেকর। এর তিন বছর পর, ২০০৭ সালে একই প্রতিযোগিতায় মহারাষ্ট্রের হয়ে দলগতভাবে ব্রোঞ্জ পদকও অর্জন করেন তিনি। ওই প্রতিযোগিতায় ৬০০-এর মধ্যে ৫৪৯ পয়েন্ট নিয়ে ৪৯ জন প্রতিযোগীর মধ্যে ১৩তম হয়েছিলেন নানা।

২০০৭ সালের পারফরম্যান্সের পর ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া তাকে ‘রেনাউন্ড শট’ বা ‘খ্যাতিমান শুটার’ উপাধি দেয়। এই স্বীকৃতির মাধ্যমে তিনি শুল্ক ছাড়াই একটি রাইফেল আমদানির সুযোগ পেয়েছিলেন।

পরবর্তী সময়েও শখের বশে শুটিং চালিয়ে যান নানা। দেশের বিভিন্ন স্থানে শুটিং রেঞ্জের কাছে যাওয়ার সুযোগ পেলে নিজের সরঞ্জাম সঙ্গে নিয়ে অনুশীলন করতেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

অভিনয়, শুটিং, রান্না কিংবা সমাজসেবা—জীবনের নানা ক্ষেত্রে নিজের আলাদা একটি পরিচয় তৈরি করেছিলেন নানা পাটেকর। পর্দায় তার তীব্র অভিনয় যেমন দর্শকদের মনে জায়গা করে নিয়েছিল, তেমনি পর্দার বাইরে সাদাসিধে জীবন ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টিও তাকে আলাদা করে তুলেছিল।

তবে সেই বহুমাত্রিক জীবনের অবসান ঘটেছে। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে গোয়ার ডোনা পাওলায় নিজের বাসভবনে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় তাকে। পরে তাকে মণিপাল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। হাসপাতাল সূত্র অনুযায়ী, হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তাকে আর ফেরানো সম্ভব হয়নি। ভোর ৫টা ২০ মিনিটের দিকে ৭৫ বছর বয়সে মারা যান বর্ষীয়ান এই অভিনেতা।

নানা পাটেকরের মৃত্যুর খবর তার ছেলে মালহার পাটেকরও নিশ্চিত করেছেন। তার প্রয়াণে ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্রে অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্র উপহার দেওয়া এই অভিনেতার বহুমুখী জীবন ও কাজও এখন স্মৃতির অংশ হয়ে রইল।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD