Logo

যে কারণে অভিনয় ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন কিংবদন্তি শাবানা

profile picture
বিনোদন প্রতিবেদক
২২ অক্টোবর, ২০২৬, ১৬:০২
যে কারণে অভিনয় ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন কিংবদন্তি শাবানা
ছবি: সংগৃহীত

মাত্র আট বছর বয়সে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু। এরপর টানা ৩৫ বছরের অভিনয়জীবনে উপহার দিয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমা। দর্শকের ভালোবাসা আর সাফল্যের শিখরে থাকা অবস্থায় হঠাৎ অভিনয় ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী শাবানা। কেন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি? তাঁর ভাষ্য, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা এবং মা হিসেবে তাদের পাশে থাকতেই প্রিয় পেশা থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপন

শাবানার পুরো নাম আফরোজা সুলতানা রত্না। ষাটের দশকের শুরুতে এহতেশাম পরিচালিত ‘নতুন সুর’ ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে তাঁর অভিষেক হয়। ১৯৬৭ সালে একই পরিচালকের উর্দু ছবি ‘চকোরী’র মাধ্যমে নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। এরপর একের পর এক সিনেমায় অভিনয় করে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী হয়ে ওঠেন। নায়িকা থেকে ভাবি, মা—বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে নিজের দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন ১১টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং আজীবন সম্মাননা।

শাবানার বাবা ফয়েজ চৌধুরী চট্টগ্রাম আদালতপাড়ায় টাইপিস্ট হিসেবে কাজ করতেন। পরে চলচ্চিত্র পরিচালক আজিজুর রহমানের উৎসাহে পরিচালনার সঙ্গেও যুক্ত হন। তাঁর মা ফজিলাতুন্নেসা ছিলেন গৃহিণী। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় ‘নতুন সুর’ ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পান শাবানা। পারিবারিক পরিচয়ের সূত্রে পরিচালক এহতেশাম তাঁর বাবাকে মেয়েকে ছবিতে নেওয়ার প্রস্তাব দেন।

শাবানার স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, প্রথমে তাঁর বাবা রাজি হতে চাননি। তিনি বলেছিলেন, ‘রত্না (শাবানার ডাক নাম) কীভাবে অভিনয় করবে! সে এত লাজুক, কারও সামনেই আসতে চায় না।’ তবে এহতেশাম নাছোড়বান্দা ছিলেন। তাঁর কথায়, ‘তোর মেয়েটার মতো একটা মেয়েই আমি খুঁজছি।’ শেষ পর্যন্ত রাজি হন শাবানার বাবা।

বিজ্ঞাপন

প্রথম ছবির অভিজ্ঞতা সম্পর্কে শাবানা গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘ছবিতে আমার প্রথম দৃশ্য ছিল এমন, খুশিতে আমি দৌড়ে এসে বলব, “ভাইয়া, ভাইয়া, আপুর বিয়ে।” আমাকে জড়িয়ে ভাইয়া বলবে, “তাই নাকি রে!” প্রথমবারে শট ওকে! তার পর থেকে মায়ের চেয়ে বাবাই সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করতেন, অনুপ্রেরণা দিতেন।’

শাবানার বাবা ফয়েজ চৌধুরীও কয়েকটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে ‘মুক্তি’ (১৯৬৯), ‘মালকাবানু’ (১৯৭৪), ‘বিজয়িনী সোনাভান’ (১৯৭৯), ‘আলতাবানু’ (১৯৮২) ও ‘রাজার মেয়ে বেদিনী’ (১৯৯১)। শাবানার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘মালকাবানু’ ছিল সুপারহিট; ছবিটির গান এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

দীর্ঘ অভিনয়জীবনে শাবানা মোট ২৯৯টি সিনেমায় কাজ করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছবিতে জুটি বেঁধেছেন আলমগীরের সঙ্গে। এই নায়কের বিপরীতে তাঁর অভিনীত সিনেমার সংখ্যা ১৩০। এরপর রাজ্জাকের সঙ্গে জুটি হয়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ছবিতে অভিনয় করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

সন্তানদের জন্য ছাড়েন প্রিয় পেশা

জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা অবস্থায় অভিনয় ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া শাবানার জন্য সহজ ছিল না। তবে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছিল। বড় মেয়ে সুমী এ লেভেল শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান। পরে ছোট মেয়ে ঊর্মি ও ছেলে নাহিনও সেখানে চলে যান। সন্তানদের বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাঁদের কাছ থেকে দূরে থাকতে চাননি শাবানা।

গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি বলেন, ‘লাখো-কোটি মানুষের ভালোবাসায় শাবানা হলাম। হঠাৎ মনে হলো, সন্তানদেরও তো সময় দেওয়া দরকার। আমার বড় মেয়ে সুমী তখন এ লেভেল শেষ করল। উচ্চশিক্ষার জন্য তাকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হলো। কিছুদিন পর ছোট মেয়ে ঊর্মি আর ছেলে নাহিনও যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেল। ওদের সবার বয়সই–বা তখন আর কত। বাচ্চারা আমাকে খুব মিস করছিল। দেশে যখন ছিল, তখন তো আমার চোখের সামনেই ছিল। কাজের ফাঁকে দেখতাম। তখন আমিও ভাবলাম, মা হিসেবে আমার তো কিছু দায়িত্ব আর কর্তব্য আছে। সন্তানদের যদি ঠিকভাবে গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে আমার এই অভিনয়জীবন দিয়ে কী হবে! তাই কষ্ট হলেও সিনেমা ছেড়ে সন্তানদের ব্যাপারে মনোযোগী হলাম। এ জন্যই বাধ্য হয়ে দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।’

বিজ্ঞাপন

এই সিদ্ধান্তে তাঁর প্রযোজক স্বামী ওয়াহিদ সাদিক সহযোগিতা করেন। যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসার সুযোগ থাকায় তাঁরা সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। শাবানা মনে করেন, দীর্ঘদিন চলচ্চিত্রে কাজ করার পর পরিবারকে সময় দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, ‘সাদিক সাহেবও ওখানে কিছু ব্যবসার ব্যবস্থা করলেন। আমিও দেখলাম, অনেক দিন তো সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে ছিলাম, এবার ঘরের দিকে মনোযোগী হই। তাই চলে গেলাম। তবে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিও কিন্তু আমার কাছে একটা পরিবারের মতো ছিল। সেখানে আমি রাতদিন অবসরবিহীন কাজ করেছি। সহশিল্পী, পরিচালকদের সঙ্গে দারুণ সম্পর্ক গড়ে উঠল। কাউকে ভাই, আবার কাউকে চাচা ডাকতাম। সবাইকে খুব মিস করলেও কিন্তু মানুষের জীবনে একটা সময় আসে, যখন কোনো উপায় থাকে না। জীবনের ধাপে ধাপে কিছু সময় আসে, সে সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব দরকার। সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া, আমি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছি।’

সন্তানদের সাফল্যেই তৃপ্তি

বিজ্ঞাপন

সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নেওয়া সিদ্ধান্তের পর কেটে গেছে বহু বছর। বড় মেয়ে সুমী ইকবাল এমবিএ শেষ করে বিয়ে করেছেন। ছোট মেয়ে ঊর্মি সাদিক হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। ছেলে নাহিন সাদিক রটগার্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। তিনিও বিয়ে করে সংসারী হয়েছেন। সন্তানদের পড়াশোনা শেষ করে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা শাবানার জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি।

শৈশব থেকেই অভিনয়ে যুক্ত থাকায় নিজের জন্য সময় বের করার সুযোগ খুব কম পেয়েছিলেন তিনি। কাজের প্রতি তাঁর একাগ্রতা ছিল প্রবল। তবে একপর্যায়ে পরিবার ও সন্তানদের সময় দেওয়াকে জরুরি মনে করেন।

শাবানা বলেন, ‘শৈশবে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত হই। নিজেকে দেওয়ার মতো সময় পাইনি। কাজ, কাজ আর কাজ। এভাবেই কেটেছে একটানা ৩৫ বছর। পরিবার ও সন্তানদের সময় দেওয়ার ব্যাপারটি আমার কাছে জরুরি হয়ে পড়ে। তাই সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অভিনয়টা ছাড়তে হয়েছে।’

বিজ্ঞাপন

চলচ্চিত্রের খোঁজ রাখেন এখনো

অভিনয় ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করলেও দেশের চলচ্চিত্রের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি শাবানার। ফেসবুক ও ইউটিউবের মাধ্যমে যতটা সম্ভব দেশের সিনেমার খবর রাখেন। ঢাকায় থাকাকালে শাকিব খানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল। স্বামী ওয়াহিদ সাদিক একটি সিনেমা নির্মাণের পরিকল্পনা করায় শাকিবের সঙ্গে তাঁদের বাসায় কথাও হয়েছিল।

শাবানার স্মৃতিতে, শাকিব খান ছিলেন সুদর্শন, ভদ্র ও অমায়িক। কয়েক বছর আগে শাকিব যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালে তাঁর এক নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে ফোনেও শাবানার সঙ্গে কথা হয়। দেশের চলচ্চিত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে শাকিব খানের নামই বেশি শোনেন বলে জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

শাবানার ভাষায়, ‘শাকিব তো অনেকটা সময় ধরে কাজ করছে। শুনছি, এখন বেশ ভালো করছে। তার সিনেমা মুক্তি পেলে আমাদের এখানেও চলে। বিশ্বের আরও দেশে শাকিবের সিনেমা মুক্তি পায়; এটা নিঃসন্দেহে আনন্দের, গর্বের।’

বিভিন্ন সময়ে নতুন সিনেমায় শাবানার ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে বেগম রোকেয়ার জীবনীভিত্তিক একটি চলচ্চিত্রে তাঁকে দেখা যেতে পারে বলে গুঞ্জন ছড়িয়েছিল। তবে এখন আর অভিনয়ে ফেরার ইচ্ছা নেই তাঁর। বয়স বেড়েছে, জীবনের ব্যস্ততাও বদলেছে। এখন পরিবার, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়েই সময় কাটে।

অভিনয়ে ফেরার প্রসঙ্গে শাবানা বলেন, ‘এই বয়সে আর কীভাবে? এখন তো অনেক বয়স হয়ে গেছে। আল্লাহর নাম নিয়ে পার করে দিচ্ছি সময়। মাঝেমধ্যে কাজের সময়ের স্মৃতি মনে করি। ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনিরা মাঝেমধ্যে আমার ছবি সম্পর্কে নানা কিছু জিজ্ঞাসা করে। আমিও তখন বলি, ওই ছবিটা দেখো। এখন পরিবারটাই আমার জগৎ। এ জগতে আমার অনেক ব্যস্ততা।’

বিজ্ঞাপন

একসময় শুটিংয়ের ব্যস্ততায় দিনরাত কাটানো শাবানা এখন পর্দার বাইরে থাকলেও দর্শকের হৃদয়ে তাঁর জায়গা অটুট। টেলিভিশনে তাঁর অভিনীত সিনেমা প্রচারিত হয়, পুরোনো চরিত্রগুলো নতুন প্রজন্মের কাছেও তাঁকে পরিচিত করে তোলে। সন্তানদের পাশে থাকার জন্য অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই। বরং জীবনের প্রয়োজন বুঝে সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন বলেই সন্তুষ্ট এই বরেণ্য অভিনেত্রী।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD