Logo

ভূমধ্যসাগরে নৌকা নষ্ট, খাবার সংকটে প্রাণ গেল ১১ বাংলাদেশির

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ আগস্ট, ২০২৬, ১৭:০৩
ভূমধ্যসাগরে নৌকা নষ্ট, খাবার সংকটে প্রাণ গেল ১১ বাংলাদেশির
ছবি: সংগৃহীত

লিবিয়া থেকে সাগরপথে অবৈধভাবে গ্রিসে যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে নৌকা বিকল হয়ে অন্তত ১১ বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় খাবার ও পানি ছাড়া সাগরে ভেসে থাকায় তাদের কয়েকজনের মৃত্যু হয়। পরে মরদেহগুলোতে পচন ধরলে দুর্গন্ধের কারণে সেগুলো সাগরে ফেলে দিতে বাধ্য হন জীবিতরা।

বিজ্ঞাপন

ঘটনাটি ঘটে লিবিয়ার তাবারুক উপকূল থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করা একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায়। নৌকাটিতে মোট ৪২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী ছিলেন। তাদের মধ্যে ৩৮ জনই বাংলাদেশি বলে জানা গেছে।

ঝড়ের কবলে নৌকা, সাগরে ভেসে যায় খাবার-পানি

জানা যায়, গত ৩ আগস্ট রাতে ৪২ জনকে নিয়ে নৌকাটি লিবিয়ার তাবারুক উপকূল ছাড়ে। যাত্রার কিছু সময় পরই নৌকাটি ঝড়ের কবলে পড়ে। এতে নৌকায় থাকা খাবার ও পানির বড় অংশ সাগরে ভেসে যায়।

বিজ্ঞাপন

খাবার ও পানির মজুত হারানোর পরও যাত্রা বন্ধ করেননি অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। ঝুঁকি নিয়ে তারা গ্রিসের দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন। একপর্যায়ে গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছালে নৌকাটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়।

ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর নৌকাটি সাগরের মধ্যে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ভাসতে থাকে। এ সময় তাদের উদ্ধারে কোনো দালালচক্রের লোকজন কিংবা অন্য কোনো সংস্থা এগিয়ে আসেনি বলে জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

নয় দিন সাগরে ভেসে থাকার পর উদ্ধার

বিজ্ঞাপন

ইঞ্জিন বিকল হওয়ার পর টানা প্রায় নয় দিন ভূমধ্যসাগরে ভেসে থাকার একপর্যায়ে বাতাসের স্রোতে নৌকাটি মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলের কাছাকাছি চলে আসে।

পরে মিশরের নিরাপত্তা বাহিনী নৌকায় থাকা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের উদ্ধার করে। স্থানীয় পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৩০ জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৮ জনের শারীরিক অবস্থা গুরুতর হওয়ায় মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

তবে উদ্ধার হওয়া সবাই বাংলাদেশি কি না, তা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি।

বিজ্ঞাপন

খাবার-পানির অভাবে চোখের সামনে মৃত্যু

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামের আব্দুল হেকিমের ছেলে আব্দুল করিম পুরো ঘটনার ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ৪২ জন গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন। গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। এরপর তাদের কাছে থাকা খাবার ও পানিও শেষ হয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

আব্দুল করিম বলেন, খাবার ও পানির অভাবে তাদের চোখের সামনেই কয়েকজন বাংলাদেশি মারা যান। প্রথমে নয়জন মারা যাওয়ার পর তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দিতে হয়। পরে আরও দুজনের মৃত্যু হয়।

দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানির মধ্যে থাকার কারণে জীবিতদের অনেকের শরীরেও বিভিন্ন ধরনের ক্ষত ও পচন দেখা দিয়েছে বলে জানান তিনি।

বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আব্দুল করিম দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মিশরের চিকিৎসকেরা তাদের চিকিৎসা দিচ্ছেন এবং খাবারের ব্যবস্থাও করছেন। সুস্থ হয়ে তারা দেশে ফিরে যেতে চান।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ দূতাবাসের তৎপরতা

ঘটনার পর মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাস আহত বাংলাদেশি নাগরিকদের বিষয়ে খোঁজখবর শুরু করেছে। দূতাবাসের পক্ষ থেকে মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শরিফ এবং স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা বাদরানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

দূতাবাস জানিয়েছে, হাসপাতালে ভর্তি ১৮ জন বাংলাদেশির শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অন্যদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আহত বাংলাদেশিরা সুস্থ হয়ে উঠলে মিশরের প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর তাদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী ট্রাভেল পারমিটের ব্যবস্থা করে দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর কথাও জানিয়েছে দূতাবাস।

অবৈধ সমুদ্রপথে যাত্রার ভয়াবহ ঝুঁকি

লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করতে গিয়ে প্রতিবছরই বহু অভিবাসনপ্রত্যাশী দুর্ঘটনার শিকার হন। অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই, অনিরাপদ নৌযান, পর্যাপ্ত খাবার-পানির অভাব এবং দীর্ঘ সময় সাগরে ভেসে থাকার কারণে এসব যাত্রা প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।

বিজ্ঞাপন

সাম্প্রতিক ঘটনাটিতেও নৌকার ইঞ্জিন বিকল হওয়ার পর অভিবাসনপ্রত্যাশীরা দীর্ঘ সময় সাগরে আটকা পড়ে যান। খাবার ও পানির সংকটের পাশাপাশি উদ্ধার না পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত মিশরের উপকূলের কাছে পৌঁছানোর পর তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD