Logo

ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধার ১৫ বাংলাদেশি

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১১ আগস্ট, ২০২৬, ১৫:৩০
ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধার ১৫ বাংলাদেশি
ছবি: সংগৃহীত

ইউরোপে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে বিপদে পড়ে ভাসতে থাকা ১৫ বাংলাদেশিসহ ৪৭ জনকে উদ্ধার করেছে ডেনমার্কের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৩২ জন মিশরের নাগরিক। পরে তাদের মিশরীয় নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।

বিজ্ঞাপন

নৌবাহিনী উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের পোর্ট সাঈদ সিকিউরিটি সেন্টারে নিয়ে যায়। সেখানে বর্তমানে ১৫ বাংলাদেশি নাগরিক মিশরীয় কর্তৃপক্ষের হেফাজতে রয়েছেন।

বিপদের খবর পেয়ে তৎপর বাংলাদেশ দূতাবাস

ঘটনার খবর পাওয়ার পর দ্রুত উদ্যোগ নেয় কায়রোতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস। সম্প্রতি দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত গৌতম কুমার দে এবং প্রথম সচিব (শ্রম) মো. জাকির হোসেন পোর্ট সাঈদে যান। সেখানে তারা সুয়েজ ক্যানাল কর্তৃপক্ষের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং পোর্ট সাঈদ সিকিউরিটি সেন্টারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বৈঠকে হেফাজতে থাকা বাংলাদেশিদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি তাদের আইনি সহায়তা এবং দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করা হয়।

পোর্ট সাঈদ সিকিউরিটি সেন্টারের পুলিশ প্রধান দূতাবাসের কর্মকর্তাদের নিশ্চিত করেন যে, ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধার হওয়া ১৫ বাংলাদেশি বর্তমানে তাদের হেফাজতে রয়েছেন। পরে দূতাবাসের প্রতিনিধিরা তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে পুরো ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নেন।

২০২২ থেকে ২০২৬ সালে লিবিয়ায় যান তারা

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশি নাগরিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে তারা আলাদাভাবে লিবিয়ায় যান। সেখানে গিয়ে ইউরোপে অনিয়মিতভাবে প্রবেশের চেষ্টা করেন তারা।

কেউ কেউ ইউরোপে যাওয়ার জন্য মানবপাচারকারী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আবার কয়েকজন লিবিয়ার বিভিন্ন মাফিয়া চক্রের হাতে আটক হওয়ার পর তাদের মাধ্যমেই সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার উদ্যোগ নেন।

ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় পাচারকারীদের সঙ্গে মৌখিক চুক্তি করে তারা বিপুল অর্থ পরিশোধ করেন বলে জানিয়েছেন। এই অর্থের জোগান দিতে কেউ কেউ বাংলাদেশে থাকা জমিজমা বিক্রি করেছেন বলেও দূতাবাসের কর্মকর্তাদের জানান।

বিজ্ঞাপন

তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ক্ষেত্রবিশেষে প্রত্যেকে ১০ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ পরিশোধ করেছেন।

নেভিগেশন ছাড়া রাবারের নৌকায় যাত্রা

আটক বাংলাদেশিদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১০ জুলাই দিবাগত রাতে ১৫ বাংলাদেশি ও ৩২ মিশরীয় নাগরিকসহ মোট ৪৭ জন একটি রাবারের নৌকায় করে লিবিয়ার তবরুক থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করেন।

বিজ্ঞাপন

নৌকাটিতে স্পিডবোটের ইঞ্জিন থাকলেও কোনো নেভিগেশন ব্যবস্থা ছিল না। তাদের বলা হয়েছিল, সমুদ্রপথে গ্রিসে পৌঁছাতে আনুমানিক ৩৬ ঘণ্টা সময় লাগবে। কিন্তু নেভিগেশন ব্যবস্থা না থাকায় যাত্রাপথে নৌকাটি দিক হারিয়ে ফেলে। প্রায় ৪৮ ঘণ্টা ধরে সেটি ভূমধ্যসাগরে ঘুরতে থাকে।

একপর্যায়ে নৌকার জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে সেটি পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। এরপর সাগরের মধ্যে নৌকাটি ভাসতে থাকে এবং যাত্রীদের জীবন চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

দুই দিন তিন রাত খাবার-পানি ছাড়াই সাগরে

বিজ্ঞাপন

নৌকাটি অচল হয়ে যাওয়ার পর প্রায় দুই দিন তিন রাত পর্যাপ্ত খাবার ও পানীয় জল ছাড়াই সাগরে ভাসতে হয় তাদের। জীবন বাঁচানোর আশায় রাতে দূরে কোনো জাহাজের আলো দেখা গেলে মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে সাহায্যের সংকেত দেওয়ার চেষ্টা করেন তারা।

দীর্ঘ সময় সাগরে আটকে থাকার পর অবশেষে ডেনমার্কের বাণিজ্যিক জাহাজ ‘মায়েরস্ক’ তাদের দেখতে পায় এবং উদ্ধার করে। পরে উদ্ধার হওয়া ৪৭ জনকে মিশরীয় নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেখান থেকে তাদের পোর্ট সাঈদ সিকিউরিটি কর্তৃপক্ষের কাছে নেওয়া হয়।

অসুস্থ হয়ে পড়েছেন অনেক বাংলাদেশি

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘ সময় প্রতিকূল পরিবেশে সমুদ্রে অবস্থান করার কারণে ১৫ বাংলাদেশির অনেকেই শারীরিকভাবে দুর্বল ও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। গ্রিসে পৌঁছানোর চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় তারা হতাশ হয়েছেন। বর্তমানে তাদের বেশিরভাগই দ্রুত বাংলাদেশে ফিরে আসতে চান বলে দূতাবাসের কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন।

পোর্ট সাঈদ সিকিউরিটি সেন্টারে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যে রয়েছেন মুন্সিগঞ্জের মো. শাওন খান, সুনামগঞ্জের মো. সাজুর আহমেদ, সুলেমান মিয়া, হবিগঞ্জের মো. সবুজ আহমেদ, মো. সারওয়ার হোসেন, সুনামগঞ্জের মো. সেলিম হোসেন, ফরিদপুরের মো. সাইম শেখ এবং কিশোরগঞ্জের মো. তোফায়েল হোসেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া হবিগঞ্জের জয় শেখ, সিলেটের জয়নাল উদ্দিন, হবিগঞ্জের আব্দুল আওয়াল চৌধুরী, সুনামগঞ্জের মো. মেহেদী হাসান, মো. মাসুম মিয়া, হবিগঞ্জের মো. শিহাব উদ্দিন এবং তুহিন মিয়াও সেখানে হেফাজতে রয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

দ্রুত দেশে ফেরানোর উদ্যোগ

বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) মো. জাকির হোসেন জানিয়েছেন, মিশরে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

যেসব বাংলাদেশির বৈধ পাসপোর্ট নেই, তাদের দেশে ফেরানোর জন্য দূতাবাসের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ট্রাভেল পারমিট (টিপি) ইস্যুর ব্যবস্থাও করা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর প্রত্যাবাসনের পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

মানবপাচারকারীদের ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার আহ্বান

এদিকে ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিয়মিত সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে বাংলাদেশি নাগরিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে দূতাবাস। একই সঙ্গে মানবপাচারকারী চক্রের প্রলোভনে পড়ে বিপুল অর্থ ব্যয় করে জীবনের ঝুঁকি না নেওয়ার জন্যও সতর্ক করা হয়েছে।

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অনিয়মিতভাবে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে এর আগেও বহু মানুষ বিপদে পড়েছেন। সাম্প্রতিক এই ঘটনাও অনিরাপদ সমুদ্রযাত্রার ঝুঁকি এবং মানবপাচারকারী চক্রের প্রতারণার ভয়াবহতা সামনে এনেছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD