‘বউ’ বানাতে চেয়ে নারীদের চীনে পাচার

মিয়ানমারে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতকে পুঁজি করে নারীদের চীনে পাচারের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। মানবপাচারকারীরা উচ্চ বেতনের চাকরি, মোটা অঙ্কের অর্থ কিংবা বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণীদের সীমান্ত পেরিয়ে চীনে নিয়ে যাচ্ছে। সেখানে অনেককে তথাকথিত ‘বউ’ হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে, আবার কেউ কেউ জোরপূর্বক শ্রম ও যৌন শোষণের শিকার হচ্ছেন। সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য ও তদন্তে এ অপরাধচক্রের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের নতুন চিত্র উঠে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
দ্য ইরাবতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের জান্তা প্রশাসনের নথিতে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই মানবপাচারের ৮০টি মামলা নিবন্ধিত হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে অন্তত ১৪টি ঘটনায় ভুয়া বিয়ের ফাঁদ ব্যবহার করে নারীদের বিদেশে পাচার করা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের গন্তব্য ছিল চীন, যেখানে স্থানীয় পুরুষদের সঙ্গে বিয়ের নামে অর্থের বিনিময়ে তাদের হস্তান্তর করা হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, পাচারকারীরা বিভিন্ন বয়সী নারীদের লক্ষ্য করে নানা ধরনের লোভনীয় প্রস্তাব দিচ্ছে। মান্দালয় অঞ্চলের ২০ বছর বয়সী এক তরুণীকে জানানো হয়েছিল, তিনি যদি একজন চীনা নাগরিকের সন্তানের জন্ম দেন, তাহলে তাকে ১ কোটি ৫০ লাখ কিয়াত দেওয়া হবে। অর্থনৈতিক সংকটে থাকা অনেক পরিবার ও তরুণী এমন প্রস্তাবে আকৃষ্ট হয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
আরেক ঘটনায় ইয়াঙ্গুনের একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত পাকোক্কুর ২৮ বছর বয়সী এক নারীকে মাত্র ছয় মাসের জন্য একজন চীনা নাগরিককে বিয়ে করতে রাজি হলে ৮০ লাখ কিয়াত দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তদন্তকারীরা বলছেন, এসব প্রস্তাবের আড়ালে মূল উদ্দেশ্য ছিল নারীকে পাচার করে বিদেশে বিক্রি করা।
বিজ্ঞাপন
নেপিডোর ২৪ বছর বয়সী এক নারীর অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ। চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে চীনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর একাধিক ব্যক্তির কাছে তাকে বারবার বিক্রি করা হয়। পরে অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের অভিযোগে চীনা পুলিশ তাকে আটক করে এবং প্রায় নয় মাস কারাগারে থাকতে হয়। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি পুরো ঘটনার বর্ণনা দিলে মানবপাচার চক্রের কার্যক্রম সম্পর্কে নতুন তথ্য সামনে আসে।
তদন্তে আরও জানা গেছে, স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে ইয়াঙ্গুনের এক নারীর সঙ্গে একজন চীনা নাগরিকের বিয়ের আয়োজন করা হয়েছিল। এ বিয়ের জন্য দেনমোহরের নামে প্রায় ২ কোটি কিয়াত লেনদেনের পরিকল্পনা ছিল। এছাড়া আরও দুটি ঘটনায় তিন নারীকে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে প্রত্যেককে ১ কোটি ৫০ লাখ কিয়াত দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক বছর আগেও এ ধরনের অপরাধ মূলত সীমান্তবর্তী এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে এটি আন্তর্জাতিক মানবপাচার নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন দেশের দালাল, ভুয়া চাকরি দাতা প্রতিষ্ঠান এবং সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র একযোগে কাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করা হচ্ছে এবং পরে বিভিন্ন কৌশলে বিদেশে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
গত মার্চে তাইওয়ানের নিউ তাইপেই শহরে পরিচালিত এক অভিযানে মানবপাচারকারী একটি চক্রের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সাফল্য পায় স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ওই অভিযানে ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং মিয়ানমারের নয়জন নারীকে উদ্ধার করা হয়। তদন্তে জানা যায়, ২০২৪ সাল থেকে চক্রটি মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উচ্চ বেতনের চাকরির ভুয়া বিজ্ঞাপন দিয়ে নারীদের টার্গেট করত।
চাকরির আশায় যোগাযোগ করা নারীদের প্রথমে বিভিন্ন খরচের নামে ঋণের ফাঁদে ফেলা হতো। পরে তাদের বিদেশে নিয়ে জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করা বা যৌন শোষণের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করা হতো। স্থানীয় গণমাধ্যম এই অপরাধচক্রকে ‘কেকে পার্কের তাইওয়ান সংস্করণ’ বলে উল্লেখ করেছে, যা সংঘবদ্ধ মানবপাচারের একটি নতুন রূপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, গত মাসে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককেও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযান চালানো হয়। থাই পুলিশ সেখানে চীনা মানবপাচার চক্রের এক মূলহোতাকে গ্রেপ্তার করে। তদন্তে জানা যায়, ২০২৪ সাল থেকে ওই চক্র অন্তত ২০ জন মিয়ানমারের নারীকে চীনে পাচার করেছে। একই সময়ে তারা প্রায় ২০ জন চীনা নাগরিককে ইয়াঙ্গুনে এনে অবৈধভাবে পাত্রী খুঁজে দেওয়ার ব্যবস্থাও করেছিল।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
চীন সরকারও দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মিয়ানমারে অবস্থিত চীনা দূতাবাস নিজ দেশের নাগরিকদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা জারি করে। এতে সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধভাবে পাত্রী খোঁজা বা এ ধরনের বিয়ের সঙ্গে জড়িত না হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। দূতাবাস জানায়, এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ক্রমেই বেশি সংখ্যক চীনা নাগরিক আইনগত জটিলতায় পড়ছেন।
বিজ্ঞাপন
মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটেছে। গৃহযুদ্ধ, কর্মসংস্থানের সংকট, মূল্যস্ফীতি, বাস্তুচ্যুতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে অসংখ্য নারী ও তরুণী ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছেন। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা সহজেই তাদের বিভিন্ন প্রলোভনে ফাঁদে ফেলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানবপাচারকারীদের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরি, সহজে বিয়ে, উন্নত জীবন কিংবা দ্রুত অর্থ আয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা ভুয়া বিজ্ঞাপন ছড়াচ্ছে। এসব প্রস্তাবের সত্যতা যাচাই না করেই অনেক নারী যোগাযোগ করছেন, যা শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ মানবপাচারের ঘটনায় রূপ নিচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, সীমান্ত নজরদারি জোরদার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, সামাজিক সচেতনতা তৈরি এবং নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। অন্যথায় সংঘাত ও অর্থনৈতিক সংকটের সুযোগ নিয়ে সক্রিয় এই আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র আরও বিস্তৃত হতে পারে এবং নতুন নতুন নারী একই ধরনের প্রতারণার শিকার হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।








