টিকিটের ছবি পাঠিয়ে বলেছিলেন প্রস্তুত থাকতে, তিন ঘণ্টা পরই এলো মৃত্যুর খবর

দুই মাস ১৪ দিনের ছুটিতে দেশে ফেরার কথা ছিল সুনামগঞ্জের মো. আমিন উদ্দিনের। দীর্ঘদিন পর প্রিয়জন দেশে ফিরবেন—এমন আনন্দে তাকে বরণ করে নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। দেশে ফেরার আগেই সৌদি আরবের রিয়াদ–তায়েফ সড়কের রিদওয়ান ব্রিজ থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে আল-হাওয়িয়াহ এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
নিহত মো. আমিন উদ্দিন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বড়মা উত্তর গ্রামের মৃত মকবুল আহমেদের তৃতীয় ছেলে। তিনি দুই মেয়ে ও এক ছেলে সন্তানের জনক ছিলেন।
নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানান, গতকাল বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে আমিন উদ্দিন তার ছোট ভাই মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের মোবাইলে বিমানের টিকিটের ছবি পাঠান। একই সঙ্গে জানান, পরদিন সকাল সাড়ে ৯টায় সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে নিয়ে আসার জন্য যেন প্রস্তুত থাকেন। দীর্ঘদিন পর পরিবারের প্রিয় মানুষটি দেশে ফিরছেন—এ খবরে স্বজনদের মধ্যে আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়। তাকে বরণ করে নিতে পরিবারের সদস্যরা প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।
তবে সেই আনন্দের মাত্র তিন ঘণ্টা পরই আসে মর্মান্তিক খবর। সৌদি আরবে অবস্থানরত আরেক ভাই কলিম উদ্দিন ফোন করে জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় আমিন উদ্দিন মারা গেছেন। দেশে ফেরার প্রস্তুতির বদলে মুহূর্তেই পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া।
বিজ্ঞাপন
পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২৭ বছর ধরে সৌদি আরবে অবস্থান করছিলেন আমিন উদ্দিন। গত বছরের আগস্টের ৩ তারিখে সর্বশেষ দেশে এসেছিলেন। এবার দুই মাস ১৪ দিনের ছুটিতে তার আজ সকালে দেশে পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে দেশে ফেরার পরিবর্তে বর্তমানে তার মরদেহ সৌদি আরবের তায়েফ আল-মরুয়া এলাকার একটি হাসপাতালের মর্গে রয়েছে।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, তায়েফ থেকে জেদ্দা বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে আমিন উদ্দিনসহ আরও চারজন একটি গাড়িতে করে রওনা হন। ওই গাড়ির মূল চালকের ভাতিজাও দেশে আসার জন্য একই গাড়িতে উঠেছিলেন।
যাত্রা শুরুর আগে চালকের ভাতিজা তার চাচাকে গাড়ি চালাতে নিষেধ করে বলেন, ‘চাচা, আপনি মুরব্বি মানুষ, আমি গাড়ি চালাচ্ছি। আপনি তাদের সঙ্গে বসুন।’ এরপর তিনি গাড়িটির চালকের আসনে বসে জেদ্দা বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
বিজ্ঞাপন
পথিমধ্যে তায়েফের রিয়াদ–তায়েফ সড়কের আল-হাওয়িয়াহ এলাকায় গাড়িটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় আমিন উদ্দিন, গাড়ির মূল চালকসহ চারজন নিহত হন। দুর্ঘটনার পর গাড়ির চালকের ভাতিজা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান বলে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এ ঘটনায় নিহত আমিন উদ্দিনের ভাই সৌদি প্রবাসী মাওলানা আব্দুল আওয়াল ও মাওলানা কলিম উদ্দিন তায়েফের এরজোয়ান থানায় পলাতক চালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন।
নিহতের ছোট ভাই মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, গতকাল বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে তার ভাই তাকে ফোন করে জানান, পরদিন সকালে সিলেট বিমানবন্দর থেকে তাকে নিয়ে আসার জন্য যেন প্রস্তুত থাকেন। ভাই দেশে ফিরবেন—এ খবরে পরিবারের সবাই আনন্দিত ছিলেন এবং তাকে বাড়িতে নিয়ে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু প্রায় তিন ঘণ্টা পরই সৌদি প্রবাসী আরেক ভাই কলিম উদ্দিন ফোন করে জানান, তাদের ভাই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, আমার ভাইয়ের তিনটি সন্তান। তাদের আমি কী জবাব দেব? আমরা আমাদের ভাইকে হারিয়েছি। এখন আমাদের একটাই দাবি, তার মরদেহ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
মো. আমিন উদ্দিনের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুলসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছে নিহতের পরিবার।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন জানান, নিহতের ভাইয়ের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে। সৌদি আরবে পরিবারের কোনো সদস্য অবস্থান করলে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন








