Logo

‘মা ও সন্তানদের দেখে রাখিস’, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নজরুলের শেষ বার্তা

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
২১ অক্টোবর, ২০২৬, ১৯:৫৯
‘মা ও সন্তানদের দেখে রাখিস’, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নজরুলের শেষ বার্তা
ছবি: সংগৃহীত

কাজের সন্ধানে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার নজরুল ইসলাম, পবিত্র চন্দ্র ও আমিনুর ইসলাম। পরিবারের আর্থিক দুরবস্থা কাটিয়ে স্বচ্ছল জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রলোভনে প্রতারিত হয়ে তিনজনকেই নামতে হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে। সেখানে ড্রোন হামলায় তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে পরিবারের সদস্যরা জানতে পেরেছেন। এখন স্বজনদের হারানোর শোকের পাশাপাশি ঋণের বোঝা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে পরিবারগুলোর।

বিজ্ঞাপন

নিহত নজরুল ইসলামের ভাতিজা মোহাম্মদ শিহাব জানান, গত ২৯ জুলাই চাচার সঙ্গে পরিবারের সর্বশেষ কথা হয়েছিল। তখন নজরুল আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘আমাদের যুদ্ধে পাঠায় দিচ্ছে। আমার মাকে দেখে রাখিস, সন্তানদের দেখে রাখিস।’ এরপর রাশিয়ায় তাঁর সঙ্গে যাওয়া অন্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে মৃত্যুর খবর পায় পরিবার।

জমি বন্ধক রেখে জোগাড় করেছিলেন ৯ লাখ টাকা

নজরুলের পরিবারে দুই ভাই ও তিন বোন। বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে। দুই ভাই একসঙ্গে যৌথ পরিবারে বসবাস করতেন। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি এখনো তাঁদের মধ্যে ভাগ হয়নি। সেই জমি স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছে বন্ধক রেখে ছোট ভাই নজরুলকে ৯ লাখ টাকা দিয়েছিলেন তাঁর বড় ভাই। ওই অর্থ দিয়েই রাশিয়ায় পাড়ি জমান নজরুল। এর আগে তিনি সৌদি আরবেও কাজ করতে গিয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপন

নজরুলের মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর জমি বন্ধক রাখা ব্যক্তি টাকা ফেরত দিতে না পারলে সমপরিমাণ জমি দিয়ে দেওয়ার কথা বলছেন বলে জানান শিহাব। এতে পরিবারটির সংকট আরও বেড়েছে।

৪০ বছর বয়সী নজরুল দুবার বিয়ে করেছিলেন। প্রথম সংসারে তাঁর দুই ছেলে রয়েছে, যাদের বয়স ১৫ ও ১০ বছর। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হলেও সন্তানদের খোঁজখবর রাখতেন তিনি। দ্বিতীয় সংসারে রয়েছে সোয়া এক বছরের একটি মেয়ে ও ছয় মাস বয়সী একটি ছেলে। স্বামীর মৃত্যুর পর দুই সন্তানকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী।

পরিবারের সদস্যরা এখনো যৌথ পরিবারেই থাকছেন। কিন্তু নজরুলের বড় ভাইয়ের আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। একসময় ঢাকায় সবজির ব্যবসা করেছেন, পরে রিকশাও চালিয়েছেন। বর্তমানে বাড়িতে থাকলেও পরিবারের জমি বন্ধক থাকায় সংকট কাটিয়ে ওঠার কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। বন্ধক রাখা টাকা ফেরত দিয়ে জমি উদ্ধার করার সামর্থ্যও তাঁর নেই।

বিজ্ঞাপন

ঋণ করে রাশিয়ায়, পবিত্রর পরিবারে পাওনাদারদের চাপ

একই উপজেলার পবিত্র চন্দ্রের পরিবারও পড়েছে চরম দুর্দশায়। দরিদ্র পরিবারের সন্তান পবিত্র পেশায় ছিলেন কাঠমিস্ত্রি। ভালো আয়ের আশায় রাশিয়ায় যাওয়ার জন্য স্ত্রীর স্বর্ণালংকার বিক্রি করেছিলেন। পাশাপাশি একটি বেসরকারি সংস্থা ও স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছে নির্মাণকাজে যোগ দেওয়ার বদলে তাঁকেও পাঠানো হয় যুদ্ধক্ষেত্রে। বেঁচে ফেরা সঙ্গীদের কাছ থেকে পবিত্রর মৃত্যুর খবর পেয়েছে পরিবার। প্রিয়জনকে হারানোর শোক সামলানোর আগেই এখন ঋণ পরিশোধের চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে স্বজনদের।

বিজ্ঞাপন

পবিত্রর ভগ্নিপতি তপন চন্দ্র সূত্রধর বলেন, পরিবারের পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে খেতে বসলে ঋণদাতারা টাকা চাইতে পেছনে এসে দাঁড়ান। ঋণ শোধ করতে অবশিষ্ট তিন শতাংশ জমি বিক্রির কথা ভাবছেন তাঁরা। তবে সেই জমি বিক্রি করেও পুরো ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

এরপরও পরিবারটির মনে ক্ষীণ আশা রয়ে গেছে—পবিত্র হয়তো বেঁচে আছেন।

ঋণ করে যাওয়া আমিনুরেরও ফিরল না প্রাণ

বিজ্ঞাপন

গোপালপুরের আরেক বাসিন্দা আমিনুর ইসলামও রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে অন্য ভুক্তভোগীদের স্বজনদের ভাষ্য, আমিনুরও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় ঋণ করে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু পরিবারের জন্য স্বচ্ছলতা আনার স্বপ্ন পূরণ হওয়ার বদলে তাঁকেও জীবন দিতে হয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে। নজরুল ও পবিত্রর পরিবারের মতো আমিনুরের স্বজনদেরও এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

চাকরির প্রলোভনে নিয়ে গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ

বিজ্ঞাপন

গত ১৪ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) জানায়, গত ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩০ বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। তাঁদের মধ্যে নজরুল, পবিত্র ও আমিনুরও ছিলেন। নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে ১০ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়েছিল বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁদের প্রতিশ্রুত চাকরি দেওয়া হয়নি। বরং পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।

এসআরবির প্রাথমিক অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার জন্য বাংলাদেশিদের একধরনের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তাঁদের ওপর ড্রোন হামলা হলে হামলাকারীদের অবস্থান ও দূরত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেত বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

কাজের আশায় বিদেশে যাওয়া এই তরুণ-যুবকদের মধ্যে ৩০ জন প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে এসআরবি জানিয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২০ জনের যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুর তথ্যও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়।

নজরুলের শেষ কথাগুলো এখন তাঁর পরিবারের কাছে বেদনার স্মৃতি। জমি বন্ধক রেখে জোগাড় করা টাকা, ঋণের বোঝা আর ছোট ছোট সন্তানদের ভবিষ্যৎ—সবকিছুই যেন একসঙ্গে এসে চেপেছে স্বজনদের ওপর। জীবিকার সন্ধানে বিদেশে যাওয়া মানুষগুলোর পরিণতি তাঁদের পরিবারকে ঠেলে দিয়েছে আরও গভীর অনিশ্চয়তায়।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD